ড. মুকিদ চৌধুরী
নাট্যোপন্যাস (৩৭)
আটই ফাল্গুন

কানিজ তপ্তস্বরে বলল, আপনার বড় ছেলে ও আমি বুঝি আপনাকে আদর করে আম্মা ডাকি না? বলুন তো আপনার কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রেখেছি আমরা?
হ্যাঁ, ডাকো। এই বাক্য সাগরাভিমুখী, সাগররূপ কান্তর মিলন অভিলাষিণী স্রোতকান্তার একনিষ্ঠতা কল্পনা করেই হয়তো আম্মা এমনটি বলেছিলেন।
তারপর কানিজের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, তাহলে আপনি ভাগ্যবান নন!
তুমিও ভাগ্যবান। আম্মা বিস্ময়ে এই বাক্য উচ্চারণ করলেন, এই বাক্যের সঙ্গে কারবালার চিত্রটি এই প্রথম একত্রিত হয়, তাই তার বিস্ফারিত নেত্র পরিক্রমণশীল, তিনি অনড়। ক্ষোভ, মর্মবেদনা, অপ্রসন্নতা প্রশমিত হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে বললেন, তুমিও ভাগ্যবান।
ক্ষুদ্র একটি নিস্তব্ধতা দেখা দিল। এই নিস্তব্ধতা কানিজের বাক্যেও প্রকাশ পেল এবং করুণ আর্তনাদে বলল, আপনি কি তা মনে করেন?
কানিজের ইঙ্গিতে বিরক্ত আম্মা নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করে সশ্লেষে বললেন, অবশ্যই করি।
আর আপনার বড় ছেলে? এই বাক্য মেঘরহিত আকাশকে বিদীর্ণ করল। এই বাক্যে আম্মা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। কানিজের গতিবিধি অনুসরণের প্রয়োজনে তিনি তার দিকে তাকালেন; তীব্র কুঞ্চিত দৃষ্টি হেনে ওকে দেখছেন, যার গাত্রবস্ত্র কম্পতি, মন্থর বায়ুতাড়িত। কানিজ নিশ্চুপ, কিন্তু অস্থির বলে আম্মার মনে হলো। তিনি গম্ভীর স্বরভঙ্গে বললেন, ওর কী হয়েছে?
এ কথায় কানিজের দেহটি যেন অগ্নিশিখার মতো, তড়িৎপ্রবাহের মতো অতীব চঞ্চল হয়ে উঠল; তাই সে স্বীয় মস্তক সঞ্চালন করে অন্তর্মুখী হতেই তার হস্তধৃত তসবিটি মেঝেয় খসে পড়ল। ব্যথিত কণ্ঠে বলল, সে খুবই ক্লান্ত।
সঙ্গে সঙ্গেই আম্মার দেহেও ক্লান্তি নেমে এলো; দুই পদ ধীর পদক্ষেপে সরে এসে চেয়ারে বসে পড়লেন। ছোটো একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ল। তিনি কানিজের মর্মকথা অনুধাবন করতে চাইলেন। তিনি উদ্দীপ্ত। তিনি কথা সাজাতে ব্যস্ত। তারপর শান্তকণ্ঠে বললেন, তোমরা দুজন না হয় কোথাও থেকে একটু ঘুরে এসো। এ কথা বলেই অতিসূক্ষ্মভাবে কানিজের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন।
আম্মার ধ্বনিপ্রবাহ যেন তার কর্ণে প্রবেশ করল না; যদি করত, তাহলে তার কোনো বিচ্যুতি ঘটত না; তথাপি তার একথা মনে হলেও হতে পারে যে, আম্মা তার অন্তরে মরুভূমি সৃষ্টিকারী, যেখানে বীজ বপন করলেও অঙ্কুর দেখা দেয় না! কানিজ হরিণগতি সংবরণ করে চকিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে অব্যর্থ কণ্ঠে বলল, মাঝেমধ্যে ভাবি, আপনি সত্যিই কি আমাদের...।
কী?
কানিজের দেহ হরিণের নিরীহগতি প্রযুক্ত, সে কিছুটা এগিয়ে বলল, কিছু না। কানিজ হেঁয়ালির ভঙ্গিতে এই বাক্যটি প্রকাশ করল, তবে এও তার বিশ্বাস যে, আম্মা আসলে এসবের পেছনে কাঠি চালান, তার অনেক ঔদ্ধত্য আছে, তিনি দুর্ধর্ষ। এই সকল তিনি সচেতনভাবে করে করেন এবং এই সূত্রেই কানিজের মনে হলো, আম্মা কি আসলে তার সংসারনির্ণয় করতে সক্ষম, তিনি কি সংসার ভাঙায় পারদর্শী কিংবা সংসার ধ্বংসে সক্ষম! একইসময় আম্মা প্রত্যক্ষ করলেন যে, কানিজ বেঁকে তার হস্তদ্বয় টেবিলের ওপর ন্যস্ত করেছে, পদদ্বয় কিছুটা বিস্তৃত। অবাক নয়নে তাকে লক্ষ করে চললেন আম্মা। তিনি কানিজের দৃষ্টি অনুসরণ করেই বললেন, কিছু না, মানে?
মেঝে থেকে তসবিটি তুলে এনে টেবিলের ওপর শব্দ করে রাখল কানিজ। আর এই শব্দপ্রবাহ থামতেই সে ব্যক্ত করল, আমরা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম।
তাই!
হ্যাঁ, তা-ই। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করতে হলো।
কেন?
আপনি জানেন না বুঝি?
না।
এ সময় কানিজের চিন্তা কুয়াশাবিজড়িত, আর্দ্র; তাই আর্দ্রকণ্ঠে বলল, কারণ, কোনো নার্সকেই আপনার পছন্দ হয় না। নার্স ছাড়া আপনাকে একা রেখে যাওয়াও সম্ভব না।
কানিজ ক্ষণিকের জন্য থেমে গেল এবং আম্মা দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করে বললেন, কী বলছ, আমাকে দায়ী করছ কেন? তোমার মনে এত বিষ, ভেবেছিলাম তুমি শে^তপদ্মের মতো সাদা! তিনি অত্যধিক ঘৃণ্য সামগ্রীর মতোই কথাগুলো ছুড়ে দিলেন। কানিজ নিশ্চয়ই আঘাত প্রাপ্ত হলো, কিছুকাল অদ্ভুতভাবে নিশ্চুপ রইল, কেবল ক্ষোভের কারণে তার শরীর উঠছে আর নামছে। এখন অপমান এবং ক্ষুব্ধধর্ম তার মনোযন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অগণন কেশরাশিসহ ঝটিতি মস্তক আন্দোলন করল, তারপর চেয়ার টেনে বসে টেবিলের ওপর তার হস্তদ্বয় স্থাপন করল; অতঃপর ডান হাতের কনুইয়ের ওপর সমস্ত উত্তমাঙ্গের ভার ন্যস্ত করে তর্জনি দ্বারা ইঙ্গিত করে দৃঢ়স্বরে বলল, তাই। বোঝা গেল, তার স্বরভঙ্গ হয়েছে। আম্মা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালানে, আর বলতে লাগলেন, ছি, ছি। পরক্ষণেই তিনি লাঠি ঠুকে দ্রুত পদবিক্ষেপে দূরে সরে গেলেন। কানিজ তা দেখল। আম্মার উচ্চৈঃস্বরে বলা ছি ছি শব্দগুলো কানিজকে অপ্রকৃতিস্থ করল, তবুও সে কিয়দংশ শান্ত থাকল, আর সে সম্যক হয়তো বুঝতে পারল যে, আম্মার ছি ছি শব্দদ্বয় কোনোক্রমেই আদর্শতুল্য নয়, বরং উগ্র-তীব্র-ক্ষিপ্ত আর বেগবান ছিল! তাই বলল. এখন ছোটমা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
করো।
আমি কিন্তু ঠিক ঠিক উত্তর চাই।
অবশ্যই।
পারবেন তো আমাকে সঠিক উত্তর দিতে?
অপহৃত অনুভূতি পরিশুদ্ধ করার জন্য কয়েক পা অগ্রসর হলেন আম্মা। তিনি দণ্ডায়মান। দূরে সিংক। সহসা তার ধারণা হলো যে, সিংকের নলের মুখে তার করপুট মেলে ধরলেই তার চেতনা পরিশুদ্ধ হবে। যদিও তার করপুটে কোনো ধুলোবালি নেই, কোনও কুয়াশাও নেই, তবু আম্মা সজল স্নেহময়ী চক্ষে তার করপুট দেখলেন, চকিতে আরো কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। নলের মুখ খুলে দিয়ে করপট জলের নিচে রেখে বললেন, আমি সাধারণত তা-ই করে থাকি।
কানিজ আর-একমুহূর্তকাল বিলম্ব না করে কোমড়ে আঁচল জড়িয়ে কোন সময় যে সে আম্মার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা সে নিজেও জানে না। কালসর্পের মতো দেহ দুলিয়ে বলতে শুরু করল, তাহলে জিজ্ঞেস করা যাক। আর কতদিন ছোটোমা আমাদের ওপর চড়ে বেড়াবেন? আর কতদিন ছোটোমা আপনার বড়ো ছেলেটার মাথা নষ্ট করে চলবেন। এই বাড়িকে আর কতদিন জাহান্নামের আগুনে পুড়ে পুড়ে ছাই করে দেবেন, ছোটোমা?
আম্মার মাথায় বজ্রপাত হলো। সঙ্গে সঙ্গেই আম্মা আইল্যান্ডের একটি চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর বললেন, আমাকে বলতে হবে?
কানিজ দৃঢ়কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ, আপনাকে বলতে হবে। আমি জানতে চাই, আপনার অভিমত। আমি জানতে চাই, আপনি কি এখান থেকে যেতে চান না।
আম্মা বললেন, তুমি কার সম্বন্ধে কথা বলছো?
আপনার সম্পর্কে ছোটোমা, আপনার সম্পর্কে। কানিজ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে আম্মার গালে একটা চড় কষে দিল।
দক্ষিণহস্ত মুষ্টিবদ্ধ করে আম্মা বললেন, এ কী করলে তুমি? এই বাক্যে আম্মার কণ্ঠ ক্ষিপ্তভাবে লাফিয়ে ওঠেছিল। এবং আইল্যান্ডের ওপর রাখা একটি পাত্র ঝটিতি- উন্মত্তের ন্যায়- ছুড়ে মারলেন; তারপর বললেন, ভীষণ অন্যায়। আম্মার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হলো। কয়েক পদ পেছন ফিরে মনুষ্যদেহী কানিজ ঈদৃশ দুঃসহ সঘন কূটোত্তিতে ঘরটি একাকার করল, অন্যায় হলে হয়েছে।
ঘরটি ত্রাসযুক্ত হলো- আইল্যান্ডের শুষ্কপুষ্পপত্রাদি থরহরি কম্পমান এবং কানিজের সুখনীড়টি এক মহাভয়ংকর ধ্বনিতে পরিপূর্ণ হলো, সংসার বুঝি যায় যায়! তারপর তার কণ্ঠনাদে এই বাক্যই ঘোষিত হলো, এখন বুঝতে পারছেন, আপনি যখন আমার গায়ে হাত তুলেন তখন আমার কেমন লাগে। আম্মা যেন এক প্রলয়ের অপেক্ষায়- এক বিসদৃশ ঘটনার অপেক্ষায় ছিলেন, যে ঘটনাটি অন্যায়, যুক্তিহীন। কানিজ নিজেকে স্বকীয় কথায় সম্মোহিত করে এক লাফে দূরে সরে গিয়ে এবং অসূর্যস্পশ্যা ব্যাকরণশুদ্ধ অন্ধকারকে নিজের আপন বলে সম্বোধন করে নিজের দাম্ভিকতা প্রকাশ করল, আমি আপনার ওপর আরও অত্যাচর করব। আরো নির্যাতন চালিয়ে যাব। তবু আপনাকে এই বাড়ি ছাড়া করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। একথা বলে সহুঙ্কারে ছুটতে লাগল এবং তার দক্ষিণ হস্ত ঊর্ধ্বে ঘুরতে লাগল।
আম্মা কানিজের ব্যবহারে বিস্মিত হয়ে ভয়ংকর শব্দে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমার ওপর? একথা বলে তিনি চেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরলেন। আর কানিজ নিজের হস্তদ্বয় নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে স্বীয় পদদ্বয়ে মেঝে ঠুকতে লাগল। আম্মা বলতে থাকলেন, আমার ওপর? এ কথা বলে চক্রাকারে শূন্যে তার একটি পা পরিভ্রমণ করতে লাগলেন। তার পদাঘাতে চেয়ারের অদৃশ্য ধুলোগুলো উড়িয়ে- বাতাসে ধুলোর কোনও ছায়া নেই, যা জৈবিক, যা মনহীন, যা হয় অহিতৈষী- কেঁদে চললেন।
কানিজ আর সহ্য করতে পারল না। নিজের দুর্জয় সাহস নিজেকেই আতঙ্কিত করল, সে শুধু নানা একত্রমিশ্রিত ব্যাঘ্র- কখনো কর্কশ, চক্রবাকের মতো কখনো তীক্ষè, ঋষভের মতো কখনো উদ্ধত- নিনাদে উচ্চারণ করল, হ্যাঁ, আপনার ওপর।
আম্মার নয়ন সম্মুখে এ কোন তাণ্ডবের তীব্রতা!
আম্মা চেয়ারের হাতল আলিঙ্গন করে আছেন, যে আলিঙ্গনের প্রতিটি বিন্দু বিশাল সুদীর্ঘ হীনতায় নির্ঝিম। আম্মা একজন ভাষাসৈনিক হওয়ায় কানিজের তাণ্ডবতীব্রতা বুঝতে সক্ষম হলেন এবং কানিজের এই অপ্রাকৃতিক ব্যবহার যার জ্যামিতির পদ্ধতি উৎপ্রেক্ষা করা অসম্ভব, অবর্ণনীয়, তাকেই তিনি নিজের সহস্র রোমকূপ দ্বারা গ্রহণে চঞ্চল; এই হেতু যে ইতঃপূর্বের কানিজের চক্রান্ত যা হরণকারী, তা বীভৎস আকার ধারণ করে। তার হৃদয়ে লুক্কায়িত ক্ষোভ প্রকাশ করতে উৎসাহদান করে। কানিজ জয়গর্বিত, ফলে সে ভাবনাবিরহিত মনে তখন সেই তসবি যা আত্মরক্ষাকল্পে ব্যবহার করছিল, তা পুনরায় হাতে তুলে নিয়ে জপতে ব্যাপৃত হল। অদূরে আম্মা যেন নিজের ছায়াকেই ভয় পেতে লাগলেন। তসবিটি শূন্যে কানিজের শাড়ির কাননে আচ্ছাদিত। তসবি ও শাড়ির অচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে আম্মা যেন কানিজের মতিগতি অন্বেষণ করে চলেছেন। কানিজ যে কতটা আত্মসচেতন এটি কিছুতেই আম্মার মাথায় ঢুকছে না।
"









































