নিজস্ব প্রতিবেদক
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
এখনো স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন সহপাঠী-সহকর্মীরা

স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজে, মাঠে আবারও ছুটে বেড়ায় শিশুরা। এখনো আকাশে বিকট শব্দে উড়ে যায় বিমান। তবে সেই শব্দ আজও অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে এক বছর আগের বিভীষিকাময় বিকেলকে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এখনো হারানো বন্ধুর স্মৃতি আঁকড়ে আছে, কেউ শরীরে বহন করছে সেই দিনের ক্ষতচিহ্ন। আর সহকর্মীদের শেষ মুহূর্তের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে শিক্ষকদের। সময় এগিয়ে গেলেও ২১ জুলাইয়ের সেই ট্র্যাজেডি তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।
সরেজমিনে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়Í শিক্ষার্থীরা যে যার মতো ক্লাস করে বের হচ্ছে। কেউবা মাঠে খেলছে। মাথার ওপর দিয়ে এখনো একটু পর পর বিকট শব্দে উড়ে যায় বিমান- যা প্রতিবারই মনে করিয়ে দেয়, সেদিনের সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা। এমনটাই জানান কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। দুর্ঘটনার সময় নিজের ছোট বোনকে খুঁজে পাচ্ছিল না নিলয় আল নাফি। তার বোন ছিল ওই ভবনেই, যেখানে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়েছিল। মাকে সঙ্গে নিয়ে ছোট বোনকে হন্য হয়ে খুঁজছিল নাফি। সেদিনের ঘটনা বলতে গিয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফি জানায়, আমার বোন তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো। ওর বৃত্তি পরীক্ষা ছিল, তাই ক্লাস শেষে অতিরিক্ত ক্লাস করছিল। সে কারণে সে ওই ভবনে ছিল। আমার অতিরিক্ত ক্লাস ছিল না। তাই আমি বাইরে ছিলাম। মা আমাকে নিতে এসেছিলেন। ঘটনার একটু আগে আমরা তখন ঝালমুড়ি কিনছিলাম। তখন হঠাৎ করে যুদ্ধবিমানের মতো জোরে শব্দ শুনি। এরপরই বিস্ফোরণের মতো একটা শব্দ হয়। তখনই বুঝতে পারি কিছু একটা ঘটেছে। ঘুরে দেখি, ভবনের ওপর অনেক আগুন জ্বলছে। আমার মা ভয় পেয়ে যান, কারণ আমার বোন তখন ভবনের ভেতরে ছিল। আমরা দুজন দৌড়ে স্কুলের দিকে যাই। প্রথমেতো অনেক আগুন... একটু পরে সেখানে গিয়ে দেখি- ভবনের এক পাশের জানালা কেটে শিশুদের বের করা হচ্ছে। আবার ওপর থেকে স্লাইডের মতো করে শিশুদের নিচে নামানো হচ্ছিল। কিন্তু আমরাতো আমার বোনকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারি, আমার বোনকে এরই মধ্যে ভবন থেকে বের করা হয়েছে। কিন্তু তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, কেউ বলতে পারছিল না। আমরা পুরো স্কুল এলাকায় খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। পরে প্রায় এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পর এখানে (গেটের কাছে) এসে বোনকে খুঁজে পাই।’ নাফর ভাষ্য, ঘটনার পর আমার বোন অনেকদিন ট্রমায় ছিল। প্রায় এক মাস ধরে সে খুব ভয় পেতো। মাকে ছাড়া ঘুমাতে পারতো না। তবে এখন সে সুস্থ আছে। যে ভবনে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধ বিমান আছড়ে পড়েছিল, সেই ভবনেই অবস্থান করছিল বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা। সে সময় শিশু আলভীরা পড়তো চতুর্থ শ্রেণিতে। ওই দুর্ঘটনায় আহত হয় সে। ভর্তি ছিল হাসপাতালেও। এখনো তার মুখ ও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে ওই দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন। কেবল শরীর নয়, শিশু আলভীরার মনের ভেতরেও বাসা বেঁধেছিল ভয়। এখন কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে আসলেও তার মনে পড়ে সহপাঠীদের মুখগুলো।
আলভীরা জানায়, আমি ট্রমা থেকে বের হতে পেরেছি। তবে ওই ঘটনাটা তো ভুলে যাওয়া যাবে না। দিনটি আমার এখনো মনে আছে। প্রথম দিকে... বিশেষ করে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর ঘটনাগুলো বেশি মনে পড়তো। এখন আর সেভাবে মনে পড়ে না। ওই ঘটনার পর আমাকে দুই মাস সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। পরে আমাদের স্কুল খুলেছে। এখন আবার নিয়মিত স্কুলে এসে ক্লাস করি।
এখন স্কুলে ভয় লাগে কিনা জানতে চাইলে আলভীরা বলে, ‘এখন আর স্কুলে এসে ভয় লাগে না। আগে ভয় ছিল। কিন্তু ভয়কে আঁকড়ে ধরে থাকলে তো সামনে এগোনো যাবে না। নিহত বন্ধুদের স্মরণ করে আলভীরা জানায়, আমাদের অনেক বন্ধু ছিল, যারা এখন আর পৃথিবীতে নেই। তাদের কথা এখনো অনেক মনে পড়ে। আমার একজন বন্ধু ছিল আয়মান। ওর সঙ্গে আমি অনেক কথা বলতাম। এখন ও আল্লাহর কাছে চলে গেছে। ওর কথা খুব মনে পড়ে। মাইলস্টোনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা আরেক শিক্ষার্থী আশরিফা জান্নাত রাইসা। এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে সে। ঘটনার সময় ওই ভবনের নিচতলায় বান্ধবীর হাত ধরে হাঁটছিলেন। তখনই বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে বিমানটি, কেঁপে ওঠে পুরো ভবন। যে বান্ধবীর হাত ধরে হাঁটছিলেন শিশু রাইসা তাকে আর খুঁজে পায়নি তখন। বাইরে এসে দেখতে পায় অন্য সহপাঠীদের মৃতদেহ। এই দৃশ্য ভয় ঢুকিয়েছে দিয়েছে শিশু রাইসার মনে।
রাইসা জানায়, যখন ঘটনাটি ঘটে, তখন আমি ভবনের ভেতরেই ছিলাম। আমাদের ক্লাস দ্বিতীয় তলায় ছিল। আমি নিচে ছিলাম। ঠিক তখনই বিমানটি পড়ে। আমি আর আমার এক বন্ধু হাত ধরে পেছনের সিঁড়ির সামনে ছিলাম। প্রথমে একটি শব্দ শুনে মনে হয়েছিল বড় কোনো বিমান যাচ্ছে। এরপর হঠাৎ পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। আমি পড়ে যাই। আমার সঙ্গে যে বন্ধু ছিল, তাকে তখন আর খুঁজে পাইনি। পরে উঠে দেখি চারদিকে শুধু আগুন। সামনে একটি গেট ছিল, সেখান দিয়ে আমি বের হয়ে যাই। পরে জানতে পারি, আমার সঙ্গে থাকা বন্ধু আলভীরা আহত হয়েছে। তার দুই হাত ও মুখ পুড়ে গেছে। মুখে বেশি আঘাত লেগেছিল। ভেতরে থাকতেই অনেক আগুন দেখেছিলাম। পরে বাইরে বের হওয়ার পর দেখি সামনে দুইজনের মৃতদেহ পড়ে আছে। আমি তাদের চিনতাম না। একজনের হাত-পা বিচ্ছিন্ন ছিল, চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে ছিল। দৃশ্যটা দেখে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। রাইসা বলে, এরপর জানুয়ারিতে যখন স্কুল আবার খুললো এবং আমি পঞ্চম শ্রেণিতে উঠলাম, তখন থেকে আবার স্কুলে আসা শুরু করি। স্কুলে ফিরে আর ভয় লাগেনি। তবে প্রথম কয়েকদিন বিমানের শব্দ শুনলে ভয় পেতাম। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, আর ভয় লাগে না। রাইসা জানায়, আমার দুই হাতই পুড়ে গিয়েছিল। এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। ডাক্তারের কথা মতো হাতে গ্লাভস পরে থাকতে হয়। মাঝে মাঝে খুলি, তবে বেশিরভাগ সময়ই পরে থাকতে হয়। দুর্ঘটনার পরে স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীরা যখন ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল- তখন তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব পালনকারীদের একজন শিক্ষিকা আজমেরি বেগম। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের কো-অর্ডিনেটর তিনি।তিনি বলেন, ‘২১ জুলাইয়ের ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ছোট শিশুরা সেসব দেখেছে এবং ঘটনার কারণে তাদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও ট্রমা কাজ করছিল। তখন আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিই। আমাদের লক্ষ্য ছিল সব শিশুকে আবার স্কুলমুখী করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। অভিভাবকরাও সেটাই চেয়েছিলেন, আমরাও চেয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘সেকশনভিত্তিক আমরা ইন্ডিভিজুয়াল কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেছি।
"








































