আশরাফুল ইসলাম, শ্রীপুর (গাজীপুর)
গাজীপুরের শ্রীপুর
জমে উঠেছে কাঁঠালের বাজার হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে আসতে শুরু করেছে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত জৈনা বাজারসহ উপজেলার মাওনা, কেওয়া, কাওরাইদ, বরমী, রাজেন্দ্রপুর, প্রহলাদপুর, গোসিঙ্গা, রাজাবাড়ি, মাষ্টারবাড়ি ও শ্রীপুর বাজারে এখন কাঁঠাল বেচাকেনা চলছে। বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে পাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুবাস, আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফল। এর রসালো কোষ, মিষ্টি স্বাদ, সুগন্ধ ও পুষ্টিগুণের কারণে ছোট-বড় সবার কাছেই এর কদর রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁঠালের উৎপাদন হলেও গাজীপুরের ভাওয়াল অঞ্চলের কাঁঠাল স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। প্রতি বছর কাঁঠালের মৌসুম শুরু হলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা শ্রীপুরে এসে ভিড় জমান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জৈনা বাজারে সকাল থেকেই কৃষকরা নিজ নিজ বাগান থেকে কাঁঠাল এনে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখেন। বাজারজুড়ে ছোট-বড় কাঁঠালের স্তূপ, ভ্যানগাড়ি, পিকআপ ও ট্রাকভর্তি কাঁঠাল নিয়ে চলছে ব্যাপক বেচাকেনা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা কাঁঠাল কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন।
মাওনা এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল জানান, এবার আবহাওয়ার কারণে অনেক বাগানে কাঁঠালের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বাজারে দাম ভালো পাওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই কাঁঠাল কিনে নিচ্ছেন। এতে পরিবহন খরচও কমছে।
তেলিহাটি এলাকার কৃষক হান্নান বলেন, কাঁঠাল আমাদের এলাকার প্রধান অর্থকরী ফলের মধ্যে একটি। অনেক পরিবার বছরের এই সময়টায় কাঁঠাল বিক্রি করে সংসারের অতিরিক্ত আয় করে থাকে। এবার ফলন কিছুটা ভালো এবং দামও ভালো থাকায় লোকসানের আশঙ্কা নেই।
জৈনা বাজারের আড়তদার ও তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ইসলাম উদ্দিন পাইকার বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে কাঁঠালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ফলন কিছুটা ভালো এবং চাহিদা অনেক বেশি, ফলে বাজারে কাঁঠালের দামও ভালো। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা আসতে শুরু করেছেন। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, এটিই সবচেয়ে বড় বিষয়।
তিনি আরো বলেন, জৈনা বাজারকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। মৌসুমজুড়ে শ্রমিক, পরিবহন কর্মী, আড়তদার, ব্যবসায়ীসহ অনেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। কাঁঠালের মৌসুম স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সিলেট থেকে আসা পাইকার খসরু মিয়া বলেন, প্রতিবছরই আমি শ্রীপুর থেকে কাঁঠাল কিনে সিলেটে নিয়ে যাই। এখানকার কাঁঠালের স্বাদ ও গুণগত মান খুব ভালো। এ কারণে বাজারে এর আলাদা চাহিদা রয়েছে। এবার ফলন এবং দাম দুটোই ভালো। তবে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের কিছুটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
শরীয়তপুর থেকে আসা পোশাক শ্রমিক ইব্রাহিম বলেন, বোনের বাড়িতে বেড়াতে যাব। তাই ৪০০ টাকা দিয়ে বড় একটি কাঁঠাল কিনেছি। শুনেছি শ্রীপুরের কাঁঠাল খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। তাই উপহার হিসেবে নিয়ে যাচ্ছি।
জৈনা বাজারের ইজারাদার রাসেল আহাম্মেদ জানান, মৌসুমের শুরুতেই বাজারে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রচুর কাঁঠাল আসছে। বাজারে খাজনা কম রাখার কারণে ব্যবসায়ীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারছেন। পাইকারদের উপস্থিতিতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু কাঁঠাল বিক্রি নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবহন, শ্রমিক, প্যাকেজিং ও খুচরা ব্যবসা। মৌসুমে হাজারো মানুষের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে কাঁঠালকে ঘিরে পুরো এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয়দের মতে, গাজীপুরের ভাওয়াল অঞ্চলের কাঁঠাল দেশের অন্যতম সুস্বাদু কাঁঠাল হিসেবে পরিচিত।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বলেন, কাঁঠাল অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি ফল। এতে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। কাঁঠাল শুধু ফল হিসেবেই নয়, কাঁচা অবস্থায় সবজি হিসেবেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
তিনি আরো বলেন, কাঁঠাল চাষের মাধ্যমে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকরা অতিরিক্ত আয় করতে পারেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও কাঁঠাল রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কৃষি বিভাগ কৃষকদের উন্নত জাতের কাঁঠাল চাষে উৎসাহিত করতে নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
"





































