আবদুর রহমান রাসেল, রংপুর
জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকী আজ

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকী আজ ১৬ জুলাই। রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচিতে তাকে স্মরণ করা হলেও পরিবারের একটাই আকুতি সন্তান হত্যার মামলার রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আবু সাঈদকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি মা মনোয়ারা বেগম। প্রতিদিনই ছেলের ছবির ধুলা মুছেন, যত্নে আগলে রাখেন তার স্মৃতিগুলো। তার কাছে সময় যেন থেমে আছে ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ে। এখনো বিশ্বাস করতে চান একদিন দরজায় কড়া নেড়ে আবু সাঈদ ডাকবে, ‘মা’ বলে। একই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে দিন কাটছে বয়সের ভারে নুয়ে পরা বাবা মকবুল হোসেনেরও, মৃত্যুর আগে সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার কার্যকর দেখতে চান। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্মরণে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আজ ইতিহাসের অংশ। তবে পরিবারের প্রশ্ন- রায় ঘোষণার পরও বিচার কার্যকর হবে কবে?
অন্যদিকে আবু সাঈদের সহপাঠীদের ভাষ্য, যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি জীবন দিয়েছিলেন, সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। ১৬ জুলাই আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে তার আত্মত্যাগের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ভিসি ড. শওকত আলী। ১৬ জুলাই আন্দোলনে দুই হাত প্রসারিত করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে বুক পেতে দিয়েছিলেন বেরোবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ। তিনি এ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই।
আজ জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদতবার্ষিকী পালনে সরকারি বেসরকারি রাজনৈতিক সংগঠন থেকে নেওয়া হয়েছে দিনব্যাপী কর্মসূচি। কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মাঝে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বলায় সারা দেশে নতুন করে ফুঁসে উঠে ছাত্রসমাজ। সারা দেশের মতো রংপুরেও ১৬ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে দুপুরে বেরোবির কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শহরের লালবাগ এলাকায় থেকে ক্যাম্পাসের দিকে যান। বেরোবির ১ নম্বর গেটের সামনে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। সেই সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে বেরোবি শিক্ষার্থীসহ আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়।
একপর্যায়ে বেরোবির ১ নম্বর গেটের সামনে চলমান আন্দোলনে পুলিশের অ্যাকশন শুরু হয়। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ লাঠি হাতে নিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুই হাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশের কয়েক দফা বুলেট গিয়ে আবু সাঈদের বুকে লাগে। একপর্যায়ে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। পরে সহপাঠীরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃতু ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। তৎকালীন চলমান আন্দোলনে কয়েকশ শিক্ষার্থী আহত হলেও প্রথম নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে রংপুরে। এদিকে আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরলে রংপুরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন এবং রাজপথে নেমে পড়েন। সবাই ছুটতে থাকেন বেরোবির দিকে।
অন্যদিকে আবু সাঈদের লাশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ নিয়ে নগরীর প্রধান সড়ক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে ধরলে পুলিশ বাধা প্রদান করেন। এ বিষয়ে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন জানান, আমার ছেলে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ। অথচ দুই বছরে হয়ে গেল, সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সরকারের কাছে বলব, যতদ্রুত সম্ভব আমার ছেলেকে যারা মেরেছে, প্রকৃত আসামিদের বিচার নিশ্চিত করা। সেইসঙ্গে দেশের জন্য যারা শহীদ হয়েছে, তাদের হত্যাকারীদেরও বিচার করতে হবে। আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক পুলিশ সদস্য আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সেই রায় কার্যকর হয়নি। পরিবারের প্রত্যাশা সন্তান হত্যার বিচারের রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয়।
"









































