নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
আবু সাঈদ হত্যার রায় দ্রুত কার্যকর চায় পরিবার

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন ও অন্যায়ের প্রতিবাদে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সামনে আবু সাঈদের বুকে পুলিশের গুলি চালানোর সেই দৃশ্য দেখেছে বিশ্ববাসী।
চব্বিশের এই বীরের আত্মত্যাগে জ্বলে ওঠা আন্দোলনের দাবানল শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনার দমননীতি উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার ক্রোধ ও ক্ষোভের দীর্ঘ নিশ্বাস পরিণত হয় অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে। ত্বরান্বিত হয় দীর্ঘ ১৫ বছরের দুঃশাসনের অবসান। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তোপের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
ঐতিহাসিক সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ শহীদ আবু সাঈদ। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর আগে দুই হাত প্রসারিত করে এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন দেশজুড়ে। আবু সাঈদের আত্মত্যাগের আজ ৭৩০ দিন, অর্থাৎ দুই বছর।
জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। তার মৃত্যুই ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’। যা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করে। এরই মধ্যে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় এখনো রায় কার্যকর হয়নি।
জুলাইয়ের মহাবিপ্লবী শহীদ আবু সাঈদের মা-বাবার চাওয়া- জীবদ্দশায় দায়ী পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যাওয়া। একই চাওয়া তার সহপাঠী ও জুলাইযোদ্ধাদের। যদিও রায় কার্যকর হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের বড় ভাই।
শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিল আবু সাঈদ। আমরা সব ভাইবোন বেঁচে আছি, অথচ আমার ছোট ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবে যারা জীবন দিয়েছেন, হত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের এই আত্মত্যাগ যেন রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণ ভুলে না যায়। আমরা চাই আবু সাঈদসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্রুত বিচার হোক, মামলার রায় কার্যকর করা হোক।
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ১৬ জুলাই আমার ছেলে সকালে ভাতও খায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে মিছিলে যায়। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেয়। কিছু নির্দিষ্ট পুলিশ সদস্য আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। আমরা সেই ভিডিও পরে টেলিভিশনে দেখেছি। এর আগে মানুষের মুখে মুখে শুনেছি আবু সাঈদ মারা গেছে। হাসপাতালের মর্গে আমার ছেলেকে একবারের জন্যও দেখতে দেয়নি। আমি বিচার দেখতে চাই। হত্যা মামলায় যে রায় হয়েছে, তা আমি বেঁচে থাকতে দেখে যেতে চাই। সরকার যেন সেই ব্যবস্থা করে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের সাজা : শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এ বছরের ৯ এপ্রিল প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলায় সাবেক দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন- পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এ ছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায় মাধবকরকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার আসামি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাকি আসামিদের দোষী সাব্যস্তক্রমে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
"









































