ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬ : আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড
ফাইনালে ওঠার মহাকাব্যিক লড়াই

ফুটবল দুনিয়ার অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং বৈরী ইতিহাস-সমৃদ্ধ দুটি দল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। দীর্ঘ ২১ বছর পর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে এবং ২০০২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এ দুই পরাশক্তি। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে নামবে তারা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের মুকুট ধরে রাখার মিশনে মরিয়া; অন্যদিকে হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহামের ইংল্যান্ড অধরা সোনালি ট্রফিটি ঘরে তুলতে বদ্ধপরিকর। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের ফুটবল লড়াই শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে অ্যান্টোনিও র্যাটিনের বিতর্কিত লাল কার্ড থেকে শুরু করে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা একক গোল প্রতিটি ম্যাচই ফুটবল ইতিহাসের একেকটি রূপকথা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয় কিংবা ২০০২ বিশ্বকাপে বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলের মাধ্যমে মধুর প্রতিশোধ- দুদলের ফুটবলীয় দ্বৈরথকে সবসময়ই অন্য মাত্রা দিয়েছে। ২০০৫ সালের একটি প্রীতি ম্যাচের পর দীর্ঘ ২১ বছর এ দুদল কোনো ম্যাচ খেলেনি, যার ফলে এ সেমিফাইনালকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের আধিপত্য লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা দল এ বিশ্বকাপেও তাদের চ্যাম্পিয়ন সুলভ পারফরম্যান্স বজায় রেখেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলের এক স্নায়ুক্ষয়ী জয়ের পর সেমিফাইনালে পা রাখে আলবিসেলেস্তেরা। লিওনেল মেসির জাদুকরী নেতৃত্ব এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ। এনজো ফার্নান্দেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের তৈরি করা আক্রমণগুলো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দিতে সক্ষম। তবে নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোয় শেষ দিকের রক্ষণাত্মক অসতর্কতা এবং অতিরিক্ত সময়ের ধকল দলের খেলোয়াড়দের ক্লান্তিতে ফেলতে পারে।
থমাস টুখেলের থ্রি লায়ন্সরা এবার দারুণ ছন্দে রয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে। হ্যারি কেন এবং জুড বেলিংহামের জুটি টুর্নামেন্টে গোলের নতুন নতুন রেকর্ড গড়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। তরুণ ও অভিজ্ঞদের দুর্দান্ত সংমিশ্রণ। বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা এবং ফিল ফোডেনের গতি এবং ক্রিয়েটিভিটি যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য বড় হুমকি। আর্জেন্টিনার মতো বড় এবং হাইপ্রেসার দলের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা দিতে হবে ইংলিশ ডিফেন্সকে। সার্বিকভাবে দুদলের হেড-টু-হেড রেকর্ডে ইংল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। মোট ম্যাচ ১৪টি ইংল্যান্ডের জয় ৬টি আর্জেন্টিনার জয় ৩টি (টাইব্রেকারসহ ৪টি) ড্র ৫টি বিশ্বকাপে মুখোমুখি ৫ বার (ইংল্যান্ড জয়ী ৩, আর্জেন্টিনা ২)।
আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল চাবিকাঠি যথারীতি ৩৯ বছর বয়সি লিওনেল মেসি। মাঝমাঠ থেকে মেসির ফাইনাল পাস বা ড্রিবলিংগুলো রুখে দেওয়ার মূল দায়িত্ব থাকবে ইংল্যান্ডের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ডেক্লান রাইসের ওপর। এ দ্বৈরথটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। ইংল্যান্ডের গোলমেশিন হ্যারি কেনকে ডি-বক্সে আটকে রাখার কঠিন কাজটি করতে হবে আর্জেন্টিনার রোমেরোকে। টটেনহামের সাবেক সতীর্থদের এ লড়াই হবে অত্যন্ত শারীরিক এবং ট্যাকটিক্যাল। কাগজে-কলমে এবং অভিজ্ঞতার দিক থেকে দুদলই সমানে সমান। আর্জেন্টিনা যেখানে তাদের ট্রফি ধরে রাখার মানসিকতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইবে, সেখানে ইংল্যান্ড চাইবে তাদের গতি ও কাউন্টার অ্যাটাক দিয়ে আর্জেন্টাইন ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দিতে। ম্যাচটি নির্ধারিত ৯০ মিনিটে শেষ না হয়ে অতিরিক্ত সময় কিংবা পেনাল্টি শুটআউট পর্যন্ত গড়ালেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে সামান্য ব্যবধানে হলেও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক সুবিধায় থাকবে।
"









































