মো. জাহিদুল ইসলাম
বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬ : আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে
শক্তির ভারসাম্য নাকি রূপকথার লড়াই

ফুটবল বিশ্বে যখনই কোনো বড় দল কোনো উদীয়মান বা ছোট দলের মুখোমুখি হয়, তখন কাগজ-কলমের হিসাব একপাশে ঠেলে রেখে ফুটবলপ্রেমীরা অলৌকিক কিছু দেখার অপেক্ষা করেন। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হচ্ছে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে। আগামীকাল শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল দল, তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যখন আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন ম্যাচটি কেবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের লড়াই থাকে না এটি হয়ে ওঠে ফুটবলের রোমাঞ্চ, কৌশল এবং আবেগের এক অনন্য প্রদর্শনী।
গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে শতভাগ জয় নিয়ে নকআউটে উঠেছে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকা তিন দলের একটি লিওনেল স্কালোনির দল। অন্যদিকে, বিশ্বকাপে অভিষেকেই ইতিহাস গড়েছে কেপ ভার্দে। শক্তিশালী রক্ষণভাগের ওপর ভর করে তারা তিন ম্যাচে দুটি ক্লিনশিট রেখে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে।
আর্জেন্টিনার সর্বশেষ নকআউটে পরাজয় এসেছিল ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে। এরপর স্কালোনির অধীনে দলটি জিতেছে ২০২১ ও ২০২৩ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ শিরোপা। বর্তমানে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ১০টি নকআউট ম্যাচে জয়ের ধারায় রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
৩৯ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এবারের বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে এরই মধ্যে ছয় গোল করেছেন তিনি। সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পের সমান গোল করলেও এমবাপ্পে একটি ম্যাচ বেশি খেলেছেন। আর্জেন্টিনার টুর্নামেন্টে করা আট গোলের মধ্যে ছয়টিই এসেছে মেসির পা থেকে।
তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে হলে লাউতারো মার্টিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ এবং এনজো ফার্নান্দেজদেরও বড় ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে সবাইকে চমকে দেয়। পরে উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে আরেকটি গোলশূন্য ড্র করে তারা শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয়। যদিও নকআউটে ওঠা ৩২ দলের মধ্যে সবচেয়ে কম গোল করা দল তারা, তবুও তাদের শক্তিশালী রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আর্জেন্টিনার দলীয় সূত্র বলছে, বিশ্রাম পাওয়ার পর একাদশে ফিরতে পারেন লিওনেল মেসি, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো ডি পল। হাঁটুর চোটের শঙ্কা কাটিয়ে দলে ফিরছেন ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরোও।
আর্জেন্টিনা চেষ্টা করবে ম্যাচের শুরুতেই গোল করে কেপ ভার্দের রক্ষণাত্মক দেওয়াল ভেঙে দিতে।
অন্যদিকে, কেপ ভার্দের মূল লক্ষ্য থাকবে প্রথমার্ধে কোনো গোল না খাওয়া। ম্যাচ যত গোলশূন্য থাকবে, আর্জেন্টিনার ওপর মানসিক চাপ তত বাড়বে এবং কেপ ভার্দে কাউন্টারে গোল দেওয়ার সুযোগ খুঁজবে। কেপ ভার্দের তেলমো আরকানজো এখনো ইনজুরির কারণে অনিশ্চিত। তবে জামিরো মন্টেইরো ও কেভিন লেনিনি সুস্থ হয়ে দলে ফিরেছেন।
বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী আর্জেন্টিনা এই ম্যাচে স্পষ্ট ফেভারিট। কেপ ভার্দে এরই মধ্যে তাদের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে, তবে লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা ও ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তাই কঠিন লড়াই হলেও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাই জয়ের পথে এগিয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং টুর্নামেন্টের চমক ‘ডেব্যুট্যান্ট’ কেপ ভার্দে। একপক্ষে লিওনেল মেসির রেকর্ডগড়া ফর্ম, অন্যদিকে কেপ ভার্দের জমাট রক্ষণ- সব মিলিয়ে একটি রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।
আর্জেন্টিনা বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি। লিওনেল মেসির হাত ধরে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে আলবিসেলেস্তেরা তাদের জয়ের ধারা এবং আধিপত্য বজায় রেখেছে। তরুণ এবং অভিজ্ঞদের এক দারুণ মিশ্রণে গড়া কোচ লিওনেল স্কালোনির এই দলটির প্রধান শক্তি তাদের দলীয় সংহতি এবং ট্যাকটিক্যাল নমনীয়তা।
মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজের মতো তারকাদের নিয়ন্ত্রণ। আক্রমণে লাউতারো মার্টিনেজ বা হুলিয়ান আলভারেজের মতো বিশ্বমানের স্ট্রাইকার, যারা যেকোনো রক্ষণভাগ চূর্ণ করতে সক্ষম।
আর্জেন্টিনা সাধারণত বল পজেশন ধরে রেখে, ছোট ছোট পাসে আক্রমণ শানাতে পছন্দ করে। হাইপ্রেসিং ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে নিজেদের হাফেই চেপে ধরা তাদের অন্যতম প্রধান কৌশল।
আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে, তবে ফুটবলে তাদের পরিচিতি ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙর হিসেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস এ দুর্দান্ত পারফর্ম করে তারা প্রমাণ করেছে যে, নামের শক্তিতে নয়, মাঠের লড়াইয়ে তারা বিশ্বাসী। যেকোনো বড় দলকে চমকে দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে তাদের। শারীরিক শক্তি, গতি এবং কাউন্টার অ্যাটাক (পাল্টা আক্রমণ)। রায়ান মেন্ডেস বা গ্যারি রদ্রিগেসের মতো অভিজ্ঞ উইঙ্গাররা যেকোনো দলের ডিফেন্সের জন্য বিপজ্জনক হতে পারেন।
কাগজে-কলমে, ফিফা র?্যাংকিংয়ে এবং স্কোয়াডের শক্তিতে আর্জেন্টিনা কেপ ভার্দের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে। আলবিসেলেস্তেদের ডাগআউটে যে বেঞ্চের গভীরতা রয়েছে, তা বিশ্বের যেকোনো দলের জন্যই ঈর্ষণীয়।
তবে ফুটবলে ‘অঘটন’ শব্দটির অস্তিত্ব সবসময়ই থাকে। কেপ ভার্দে যদি তাদের শারীরিক ফুটবল এবং নিখুঁত রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে, তবে তারা আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।
"








































