মেহেদী হাসান
বছরে নিঃসরণ ৫ কোটি টন গ্রিনহাউস গ্যাস

ফসল ফলাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সার ব্যবহার করে থাকেন বাংলাদেশের কৃষক। তথ্যমতে, ফলমূল, শাকসবজি ও মসলা জাতীয় ফসলের ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি সারের ব্যবহার ৬০০ কেজি ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রতি বছর কৃষি খাতে ৯ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। দেশের কৃষি খাতে সারের এমন অপব্যবহার এবং ধানকেন্দ্রিক ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
প্রতি বছর কৃষি খাত থেকে ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি টনেরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি দায়ী শুধু বার্ষিক দুবার ধান চাষ। প্যারিস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ১৫ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবু সার ও ফসল-সহায়তাবিষয়ক সরকারের বর্তমান নীতিমালা এ লক্ষ্যের পরিপন্থি। গত ১৫ জুন প্রকাশিত ‘রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশস এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি সার ব্যবহার করা হয় মিশ্র ফসল চাষে। বছরে মিশ্র ফসল চাষে ৯২৫ কেজি সার ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ফল চাষে ৭৭১ কেজি, শাকসবজি ৬৩ কেজি, মসলা জাতীয় ফসলে ৬৯৩ কেজি এবং অন্যান্য দানাদার ফসল চাষে ৪৫৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া ধান চাষে হেক্টরে ৪০০ কেজির ওপরে সার ব্যবহার করা হয়। এসব ব্যবহারকৃত সারের মধ্যে অন্যান্য অনুখাদ্য যেমন (জিংক, সালফার, বোরন ইত্যাদি) রয়েছে। বছরে মিথেন গ্যাস উৎপাদনকারী একক সার হিসেবে ৯ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকেন দেশের কৃষক। শুধু ইউরিয়া ডিএপি, টিএসপি কিংবা এমওপি নয়, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের সমন্বয় অসম মাত্রায় ব্যবহার করেন। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুষম অনুপাতে সার প্রয়োগ করেন। যার ফলে মাটির স্বাস্থ্য, ফসলের উৎপাদনশীলতা ও কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।
জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক সংস্থা এফএওর ‘এক্স-অ্যান্টি কার্বন ব্যালেন্স টুল’ ব্যবহার করে করা প্রাক্কলন অনুযায়ী, ১১.৬ মিলিয়ন টনেরও বেশি কার্বন নির্গমন হয় শুধু সার ব্যবহারের কারণে। কৃষিতে দেশে মোট কার্বন নিঃসরণের ৬০ শতাংশেরও বেশি দায়ী। যেহেতু ধান চাষ, সেহেতু ধান চাষে কীভাবে কার্বন কমানো যায়, সেটিই বড় লক্ষ্য সরকারের। কারণ দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭২ শতাংশ জুড়ে ধান চাষ হয়। সুষম মাত্রার সার ব্যবহারের জন্য কৃষককে নির্দেশনা দিয়ে থাকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। তবে এ নির্দেশনা কৃষক মানেন না। বিএআরসির ২০২৪ সালের সার ব্যবহার নির্দেশনা অনুযায়ী, হেক্টরে ৩৭৫ কেজির বেশি সার ব্যবহার করলে ফসলের জন্য তা মারাত্মক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ক্রিটিক্যাল লিমিট হিসেবে ধরা হয়। তবে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে সারের ব্যবহার নির্ভর করে মাটির ধরন এবং ফসলের ওপর। এক্ষেত্রে ধান উৎপাদনে কৃষক সাধারণত হেক্টরে ইউরিয়া ১৭০-২২০ কেজি, ডিএপি, ১০০-১৫০ কেজি, এমওপি ১০০-১৩৫ কেজি এবং জিপসাম ৯০-১৩০ কেজি ব্যবহার করেন।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য বলছে, সাধারণভাবে ১৫০ দিনের নিচে স্বল্প মেয়াদি জাত; যেমন- ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান ৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮ ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ব্রি হাইব্রিড ধান৫ বা বিনা ধান-১০ এবং বিনা ধান-১৮-এর ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি অর্থাৎ প্রতি ৩৩ শতকে সারের মাত্রা ইউরিয়া ৩৫ কেজি, টিএসপি বা ডিএপি ১২ কেজি, এমওপি ২০ কেজি, জিপসাম বা গন্ধক ১৫ কেজি, দস্তা (মনোহাইড্রেট) ১.৫ কেজি। ১৫০ দিনের বেশি দীর্ঘমেয়াদি জাত; যেমন- ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ বা ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৮৯-এর ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি অর্থাৎ প্রতি ৩৩ শতকে সারের মাত্রা ইউরিয়া ৪০ কেজি, টিএসপি বা ডিএপি ১৩ কেজি, এমওপি ২২ কেজি, জিপসাম ১৫ কেজি, দস্তা ১.৫ কেজি। হাওর অঞ্চলের জাতের ক্ষেত্রে প্রতি ৩৩ শতকে সারের মাত্রা ইউরিয়া ২৭ কেজি, টিএসপি বা ডিএপি ১২ কেজি, এমওপি ২২ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি, দস্তা ১.৫ কেজি। তবে টিএসপির বদলে ডিএপি সার ব্যবহার করলে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া সার কম প্রয়োগ করতে হবে। অথচ কৃষক তার ফসল ফলানোর জন্য অতিরিক্ত সার ব্যবহার করে থাকেন। এ সার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয় উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক জালাল উদ্দিন এবার মসলাজাতীয় ফসল (পেঁয়াজ) চাষ করেন ৩ হেক্টর জমিতে। হেক্টরপ্রতি জমিতে সার ব্যবহার করেছেন ৫০০ কেজির বেশি। পেঁয়াজের পর বোরো ধান চাষ করেন এ চাষি। জালাল উদ্দিনের ভাষ্যমতে, সরকারের দেওয়া তালিকা অনুসারে সার প্রয়োগে কাঙ্ক্ষিত ফসল পাওয়া যায় না। তার মতে, জমির ধরন অনুযায়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সুষম মাত্রায় সার ব্যবহারের বিষয়ে সঠিক তথ্য দেন না। ফলে কৃষক সচেতন হতে পারছে না। এছাড়া বিগত দুই দশকে সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে জমির প্রকৃতি ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে শুধু নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সার ব্যবহার হয় ৯ লাখ টনের ওপর। যদি এ সারের ব্যবহার ১০ শতাংশ কমানো যায়, তাহলে বছরে ১ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। ২০ বছর মেয়াদি এক তথ্যে বলা হয়েছে ২০ বছরে ২০ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে বোরো ধানের জমির ১৫ শতাংশ একবর্ষজীবী ও বহুবর্ষজীবী ফসলে রূপান্তর করতে পারলে এবং এর সঙ্গে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে প্রতি বছর ৬.৩ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে। একইসঙ্গে ধানের জমিতে সেচ পদ্ধতির পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ৮.২ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের রিসার্চ অ্যানালিস্ট জোনায়েদ সহল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সুষম সার ব্যবহারের চর্চা কম হওয়ার প্রধান কারণ হলো, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রণীত সুপারিশ সম্পর্কে কৃষকের সীমিত সচেতনতা। কৃষিকাজের ক্ষেত্রে মূল সমস্যাটি সার প্রাপ্তি নয়, বরং এর সঠিক প্রয়োগ : মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা ও পরামর্শমূলক সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে জমিতে পুষ্টি উপাদানের প্রয়োগ সুষম হয় না অর্থাৎ কোনোটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আবার কোনোটি কম পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। সারের প্রয়োগ অপর্যাপ্ত মাত্রা থেকে সুপারিশকৃত মাত্রায় উন্নীত করলে ফসলের ফলন সবচেয়ে ভালো হয়; কিন্তু এর চেয়ে বেশি মাত্রায় সার প্রয়োগ করলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুর রহিম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে ডিনাইট্রিফিকেশন প্রক্রিয়ায় নাইট্রাস অক্সাইড উৎপন্ন হয়। গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর জন্য আমরা কৃষককে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকি। এর মধ্যে ধান চাষে সেচ পদ্ধতির পরিবর্তনে জোর দেওয়া হচ্ছে। আমরা ধানের জমিতে এক মাস এক ইঞ্চি পানি রাখার পরামর্শের পাশাপাশি জমি শুকিয়ে-ভিজিয়ে সেচ দিতে বলি। এছাড়া ধানের জমিতে একাধারে ধান চাষের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষ করা, সবজি চাষ করা, একবর্ষজীবী ও বহুবর্ষজীবী ফসল চাষ করার মাধ্যমে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো যেতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমরা ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর একটা পরিসংখ্যান করে আসছি যে, কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। কৃষি খাতের মধ্যে ফসল ও প্রাণিসম্পদ খাত থেকে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমানোর জন্য আমরা কৃষি, প্রাণিসম্পদ দপ্তর সবার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে থাকি। ধানের জমি শুকিয়ে-ভিজিয়ে সেচ দেওয়া, ফসলে ইউরিয়া প্রয়োগ কমানো, গরুর গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনসহ বিভিন্নভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি, কাজ হচ্ছে।
"








































