বিবিসি

  ০১ আগস্ট, ২০২১

প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ ‘প্লাস্টিকখেকো’ ফাঙ্গাস

প্লাস্টিকের বর্জ্য সহজে পচে গলে মাটিতে মিশে যায় না এজন্য বহু সময় লাগে। এ কারণেই প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। এই প্লাস্টিককে আক্ষরিক অর্থেই ‘খেয়ে ফেলতে’ পারে এবং মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে এমন ফাঙ্গাস যদি আবিষ্কার করা যায় তা হলে এত বড় হুমকির সহজ সমাধান হয়ে যাবে। আকস্মিকভাবেই ঠিক এটাই আবিষ্কার করে ফেলেছেন এক বিজ্ঞানী। সামান্থা জেংকিনস নামে এ গবেষক আবিষ্কার করেছেন এমন একটি ফাঙ্গাস বা ছত্রাক যা প্লাস্টিকখেকো।

পৃথিবীর দেশে দেশে পরিবেশ দূষণের এক অন্যতম কারণ হলো প্লাস্টিক। যেকোনো বড় শহরের আবর্জনার স্তূপে দেখা যাবে একটা জিনিস, প্লাস্টিক। হাজার হাজার লাখ লাখ প্লাস্টিক। প্লাস্টিক মহাসাগরের গভীর তলদেশেও ছড়িয়ে গেছে, ঢুকে পড়েছে তিমির মতো নানা প্রাণীর পেটে, মানুষের খাবারে এমনকি মানব ভ্রুণের প্ল্যাসেন্টাতেও ঢুকে পড়েছে প্লাস্টিকের কণা। এক হিসেবে বলা হয়, একটি মাত্র প্লাস্টিক ব্যাগ মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে প্রায় ১ হাজার বছর। সেজন্যই প্লাস্টিক বর্জ্য কীভাবে সহজে রিসাইকেল করা যায় তা বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবেশ সংগঠন গ্রিনপিস বলছে, ২০১৫ সাল নাগাদ পৃথিবীতে ৬৩০ কোটি টন প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে, আর এর মাত্র ৯ শতাংশ রিসাইকেল বা পুনর্নবায়ন হয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু উন্নত দেশ বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছে এশিয়ার কিছু দেশে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ৪০ শতাংশেরও বেশি প্লাস্টিক প্যাকেজিং রিসাইকেল হচ্ছে। কিছু প্লাস্টিক রিসাইকেল করা খুব কঠিন।

এক ধরনের প্লাস্টিক আছে যাকে বলে পিইটি (পলিইথাইলিন টেরেপথালেট) যা ব্যবহার করা হয় নানা রকমের পানীয়ের বোতল তৈরির জন্য। এগুলো সহজে নষ্ট হয় না। চিরাচরিত পদ্ধতিতে এগুলো পুনর্নবায়ন করাও কঠিন।

সামান্থা জেংকিনস ঠিক করলেন, এই পিইটি’কে ফাঙ্গাস দিয়ে ধ্বংস করা যায় কি না সেটাই পরীক্ষা করে দেখবেন।

প্লাস্টিককে খেয়ে ফেলছে ফাঙ্গাস : জেংকিনস আবিষ্কৃত ফাঙ্গাসটি পিইটিআর পলিইউরিথেনের ওপর পরীক্ষা করে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি প্লাস্টিক দিচ্ছেন, ফাঙ্গাসটা সেই প্লাস্টিক খেয়ে ফেলছে। তার পর ফাঙ্গাস জন্ম দিচ্ছে আরো ফাঙ্গাসের আর সেটা থেকে আপনি নানা রকম বায়োমেটিরিয়াল বা জৈবপদার্থ তৈরি করতে পারছেন। সেটা নানা কাজে লাগানো যেতে পারে, খাবার তৈরির জন্য, পশুর জন ফিডস্টক তৈরিতে, এমনকি অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির কাজে।’

ক্ষুধার্ত ফাঙ্গাস : সামান্থা জেংকিন্স হচ্ছেন বায়োহম নামে একটি বায়ো-ম্যানুফ্যাকচারিং ফার্মের প্রধান বায়োটেক প্রকৌশলী। তার কোম্পানির একটি গবেষণা প্রকল্পের কাজের জন্য তিনি কয়েক রকম ফাঙ্গাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। এর মধ্যে একটি ফাঙ্গাস এমন একটা কা- করে বসল যে তার গবেষণার গতিপথ ঘুরে গেল অন্য দিকে।

‘ধরুন, একটা জার ভর্তি আছে শস্যকণা আর তার ওপরে এক দলা ফাঙ্গাস গজিয়েছে। ব্যাপারটা দেখতে মোটেও উত্তেজনাকর বা আকর্ষণীয় কিছু ছিল না। কিন্তু যেই জারটা খোলা হলো, দেখা গেল দারুণ এক ব্যাপার ঘটে গেছে।’

জেংকিন্স দেখলেন, জারটা বায়ুরোধী করার জন্য যে প্লাস্টিকের স্পঞ্জ দেওয়া ছিল ফাঙ্গাসগুলো সেটাতে ক্ষয় ধরিয়েছে, অন্য যেকোনো খাবারের মতোই সেটাকে হজম করে ফেলেছে। জেংকিন্সের প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল জৈবভিত্তিক পদার্থকে ইনসুলেশন প্যানেল তৈরিতে কীভাবে ব্যবহার করা যায় সেটা পরীক্ষা করা।

কিন্তু এই প্লাস্টিকখেকো ‘ক্ষুধার্ত ফাঙ্গাস’ তাদের গবেষণাকে নিয়ে গেল অন্য আরেক দিকে।

বায়োহম এখন কাজ করছে কীভাবে এই ফাঙ্গাসের আরো শক্তিশালী একটা জাত তৈরি করা যায় যা হয়তো একসময় প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে পরিবেশকে মুক্ত করতে পারবে।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ই-কোলাই নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার ল্যাবরেটরিতে তৈরি সংস্করণ ব্যবহার করেছেন। যা টেরেপথ্যালিক অ্যাসিডকে ভেঙে ভ্যানিলিন তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয় এটা খাবারের সুগন্ধি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এই টেরেপথ্যালিক অ্যাসিড হচ্ছে পিইটি থেকে পাওয়া একটি অণু।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস-এর ড. জোয়ানা স্যাডলার বলছেন, ‘আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনো প্রাথমিক স্তরে রয়েছে, এই প্রক্রিয়াটিকে আরো কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করার জন্য আরো কাজ করতে হবে। কিন্তু এটি অত্যন্ত উত্তেজনাকর সূচনা এবং এ প্রক্রিয়াটাকে উন্নত করার পরে ভবিষ্যতে এর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।’

অন্যদিকে জার্মানির লাইপজিগে হেলমহোল্টৎস সেন্টারের এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের একটি দল আরেকটি গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটিয়েছে। এই দলটি ‘সিউডোমোনাম এসপি টিডিএ-ওয়ান’ নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে পলিইউরিথেন ভাঙার জন্য ব্যবহার করছে।

স্থানীয় একটি আবর্জনা ফেলার জায়গায় এই ব্যাকটেরিয়াটি পাওয়া গিয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, এই ব্যাকটেরিয়া প্লাস্টিকের কিছু অংশ খেয়ে ফেলে আর বাকি অংশ কার্বনডাইঅক্সাইড হিসেবে বাতাসে মিশে যায়। সিউডোমোনাস তার এনজাইম ব্যবহার করে পলিইউরিথেনকে ভেঙে ফেলে। এছাড়া অন্য আরো কিছু ক্ষুদ্র অণুজীব আছে যারা প্লাস্টিক খায়।

লাইপজিগের গবেষক দলটি এই ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করেছে যাতে এসব এনজাইমের জেনেটিক গঠন বের করা যায়।

মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রামানি নারায়ণ বলছেন, এগুলো খুবই আগ্রহ-উদ্দীপক গবেষণা তবে এসব প্রযুক্তিকে বর্তমানে প্রমাণিত বাণিজ্যিক পদ্ধতিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close