মোতাহার হোসেন

  ১২ অক্টোবর, ২০২১

মতামত

নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন

সাংবিধানিকভাবে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা, নারীশিক্ষা ও তাদের ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরন্তর প্রচেষ্টা, সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই সর্বক্ষেত্রে আজ নারীর জয়জয়কার। স্বাধীনতার ৫১ বছরে অর্থনীতির সব সূচকে, মানবিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীদের ভূমিকা ও অবদান অবিস্মরণীয়। দেশের কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, পোশাকশিল্প, উন্নয়ন, অগ্রগতিসহ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানের ঈর্ষণীয় সাফল্যের ক্ষেত্রেও নারীরা রেখেছেন অনন্য অবদান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নারীদের সর্বত্র সাহসী বিচরণ সত্ত্বেও নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন, সহিংসতার ঘটনায় নারীর অগ্রযাত্রা যেন কুসুমাস্তীর্ণ না হয়ে পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে-বাইরে মর্যাদার জায়গায় নারীর অবস্থান আশাজনকভাবে পাল্টায়নি; পাল্টায়নি নারীর প্রতি একশ্রেণির মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। এ কারণেই দুই বছরের শিশু থেকে বৃদ্ধা নারী; সবাই শিকার হচ্ছে সহিংসতার। কিছু মানুষরূপী দানবের মানসিকতার বিকৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মর্গে থাকা মৃত নারীর লাশও রেহাই পাচ্ছে না তাদের কবল থেকে। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং নারী শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও আইনের ফাঁক গলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার আগেই শিক্ষাঙ্গন থেকে ঝরে পড়ছে তারা। নির্যাতনের শিকার হলেও আইন না জানায় প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে পারছেন না বেশির ভাগ নারী। এমনকি পৈতৃক সম্পত্তিতেও পাচ্ছেন না তাদের ন্যায্য অধিকার। এজন্য সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অথচ নারী শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রয়েছে আইন। অনেক সময় জনসচেতনতার অভাবে, আবার কখনো কখনো লোকলজ্জার ভয়ে, কখনো অর্থাভাবে, কখনো প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দেখা দেয়। আবার কখনো আইন প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা না থাকায় বিচারপ্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আইন করার পর ‘রিভিউ’ বা ‘প্রিভিউ’ করার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা, আইন সম্পর্কে ধারণার অভাবে নারীর অধিকারপ্রাপ্তি হচ্ছে না। বিশেষ করে রাস্তা-ঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থলে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে বিধিমালা থাকলেও অনেকে এসব আইনের সুফল পাচ্ছেন না। প্রয়োজনের তাগিদে এসব আইন তৈরি করা হলেও ব্যবহারের অভাবে সেসব কার্যত ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’-এর মতো অবস্থা।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২১ ইনডেক্স’ বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। চলাচলের স্বাধীনতা, কর্মক্ষেত্রে সমতা, মজুরি, বিয়ে, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব, উদ্যোগ, সম্পদ ও পেনশন- এই আটটি সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সূচকগুলোতে গড়ে বাংলাদেশ যে মান অর্জন করেছে (৪৯.৪), তা পাকিস্তানের থেকেও কম (৫৫.৬)। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশ স্বামীর কাছে কোনো না কোনো সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

অথচ শেখ হাসিনার সরকার নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছেন। যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩); যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০; অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২; ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, ২০০৯; পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২; মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২; পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০; মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন-২০১১ ; বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব (সংশোধনী) আইন রয়েছে। মূলত আইন বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে অনেক নারী প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর কাছে যাচ্ছে না। আবার এ আইনের কয়েকটি ধারায় অভিযোগ প্রমাণ করতে গেলে সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীকেই ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই অনেকে জানলেও মামলা করেন না। এ আইন সম্পর্কে আদালতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। অথচ আইনটি নারীর একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হতে পারত। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধন ২০০৩)-এর অধীনে মামলাগুলোর তদন্ত অনেক সময়ে সঠিক সময়ে হচ্ছে না। বিচারকার্য ১৮০ দিনের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও এতে সময় লাগছে তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত। দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসামির শাস্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ২০২০ সালের অক্টোবরে সরকার প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করেছে। সংশোধিত আইনে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তবু ধর্ষণ থামছে না। ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যার মতো অপরাধ কমাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কার্যকর প্রয়োগের লক্ষ্যে উচ্চ আদালত ঘোষিত ছয় দফা নির্দেশনাও উপেক্ষিত।

এক আইনজীবী বলেন, শুধু আইন পরিবর্তন করে অপরাধ দমন করা যায় না। যে আইন আছে তার কার্যকর প্রয়োগ দরকার। ধর্ষণ মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। কিন্তু হারটা যদি ৯৭ শতাংশ হতো, তাহলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটত না। একইভাবে ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে ট্রাইব্যুনালের কাছে তার কারণ লিপিবদ্ধ করে আজ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিচারককে কোনো প্রতিবেদন দিতে দেখা যায়নি। পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ পড়েনি। এ বিষয়গুলো মনিটরিংও করা হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় সহজেই। আবার ২০১৮ সালের যৌতুক নিরোধ আইনে যৌতুক নিলে পাঁচ বছরের কারাদ-ের কথা বলা হয়েছে। তবে এখন যৌতুকের ধরন বদলে গেছে। যৌতুক টিকে আছে ‘উপহার’ হিসেবে। একইভাবে উত্তরাধিকার আইনের অন্যতম বাধা হয়ে আছে ‘এসভিটি অ্যাক্ট ১৯৫০’-এর সেকশন ১৪৩-বি।

‘আমরাই পারি’-এর আইনজীবী ও একজন উন্নয়ন কর্মী বলেন, ‘নারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু আইন, নীতিমালা ও হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও প্রয়োগের অভাবে নারীরা নির্যাতনমুক্ত স্বাধীন জীবন উপভোগ করতে পারছেন না। নারীদের সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য কিছু আইন থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, পদ্ধতিগত ও প্রায়োগিক নানা সমস্যায় অধিকাংশ নারী সেসব আইনের সুফল ভোগ করতে পারছেন না। কারণ দেশের সর্বস্তরেই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল। যত দিন সম্পত্তিতে নারীদের সমান অধিকার অর্জিত না হবে; যত দিন নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হবে, তত দিন পর্যন্ত শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের পক্ষে দুরূহ।’

আবার অনেক সময়ে বিচারের ধীরগতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাজট কেবলই বাড়ছে। নারীপক্ষের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলায় ৯৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে পাচ্ছে। সাজা হয় মাত্র ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ আসামির। সারা দেশে সব ধরনের ফৌজদারি অপরাধের বিচারের দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি নারী নির্যাতন সংশ্লিষ্ট মামলার বিচার হতেই বেশি সময় লাগছে। ফৌজদারি মামলায় গড়ে একটি করে মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলে। অন্য দিকে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় প্রতি চারটি মামলার মধ্যে একটি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলে। আইনে যেসব বিধান রয়েছে, সেসব নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বলিষ্ঠ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এসব আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট মহলের রহস্যজনক নির্লিপ্ততা। তা ছাড়া বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায়ও নারীরা হয়রানির শিকার হন। মামলা পরিচালনার খরচ বেশি হওয়ায় অনেকের পক্ষে মামলা করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বাস্তবে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইন থাকলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এসব কারণে নারীরা পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ে মামলা করতে আগ্রহী হন না। আইন সম্পর্কে প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ভূমিকার পাশাপাশি সরকার, বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, এনজিও, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্টদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকাই পারে ঘরে-বাইরে নারী, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। (পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম বিষয়ক ফিচার)।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close