রেজাউল করিম খোকন

  ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

দৃষ্টিপাত

অর্থনীতির গতি সঞ্চারে ক্ষুদ্রবিমা

যেকোনো ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং ব্যবসায় কমবেশি ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য গৃহীত উদ্যোগ ও পদক্ষেপগুলোতে ঝুঁকির মাত্রাটা থাকে বেশি। ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, পাহাড়ধস, অগ্নিকাণ্ড, মহামারি নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ প্রভৃতির কারণে তাদের গৃহীত নানা উদ্যোগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। ফলে দারিদ্র্যবিমোচন কর্মকাণ্ড গুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আবার অতিমাত্রায় ঝুঁকির কারণে অনেকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোনো রকম উদ্যোগ গ্রহণে সাহসী হয় না। বরং তা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখতে চায়। এভাবে তারা সময়ের সঙ্গে সামনে এগিয়ে থাকার বদলে ক্রমেই পিছিয়ে থাকছে। যদি তাদের গৃহীত উদ্যোগগুলোর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য নিরাপত্তামূলক কোনো ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনায়াসেই সমৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে। এ জন্য বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসতে পারে সহায়ক ক্ষুদ্র বিমা পণ্য নিয়ে।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, গ্রামের সাধারণ দরিদ্র গৃহবধূর ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্যোগগুলোর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষুদ্রবিমা (Micro Insuranceব) বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে শহরের দরিদ্র শ্রেণি এবং গ্রামের সাধারণ কৃষক নিম্ন আয়ের মানুষ, ভূমিহীন মানুষ তাদের ভাগ্য বদলে বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ সহায়তা নিতে আগ্রহী হলেও বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যান্য অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে তাদের গৃহীত উদ্যোগ মাঝপথে ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় তারা বিদ্যমান বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারে না। গৃহীত ঋণ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের জীবনে নেমে আসে নানা হয়রানি। তাদের প্রতিটি উদ্যোগে যদি বিমার ব্যবস্থা থাকত তাহলে তা ঝুঁকিমুক্ত হয়ে উঠতে পারত।

বড় বড় ঋণের বিপরীতে বিমা করা থাকায় তা ঝুঁকিমুক্ত হয়ে ওঠে। ঠিক সেভাবে দারিদ্র্যদূরীকরণে গৃহীত ক্ষুদ্র বিনিয়োগ উদ্যোগগুলোতে ক্ষুদ্রবিমা (Micro Insurance) এর প্রচলন দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দিতে পারে। বিষয়টি উপলব্ধি করে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সাধারণ নিম্নবিত্ত দরিদ্র, কৃষক শ্রেণির গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমা কোম্পানিগুলো সহায়ক বিমা পণ্য প্রচলন করেছে যেগুলো এরই মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। অথচ বাংলাদেশে তেমনভাবে ক্ষুদ্র বিমা ব্যবস্থার প্রচলন হয়নি এখনো। বিমা সুবিধা না থাকার কারণে দরিদ্র মানুষগুলোর গৃহীত নানা উদ্যোগ যেখানে বারবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে তা দূরীভূত হবে ক্ষুদ্র বিমা (Micro Insurance) ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে। দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে যখন এ অঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে সেখানে স্বাভাবিকভাবে ক্ষুদ্র বিমা বাজারের (Micro Insurance Market) বিস্তৃতির সুযোগ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বিমা কোম্পানিগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সাধারণ দরিদ্র কৃষক গ্রামীণ মানুষের গৃহীত ব্যবসা শিল্প কৃষি উদ্যোগের সহায়ক নতুন নতুন বিমা পণ্য (Insurance Product) নিয়ে আসতে পারে।

বাংলাদেশে শস্য বিমা চালু হলেও এটা তেমন ব্যাপকতা লাভ করেনি বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে। কৃষকদের শস্য বিমার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্য তেমন কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশে শস্য বিমা ব্যাপকভাবে চালু হলে কৃষি খাতে এক ধরনের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তাবোধ সৃষ্টি হতো। কৃষি অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব সৃষ্টিতে শস্য বিমা বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে, এটা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের অভিঘাতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও স্বাভাবিক জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা, সংকট ও বিপর্যয়।

করোনার প্রথম ঢেউয়ের ভয়াবহ ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে আবার হানা দিয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। করোনায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, যারা ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত তাদের প্রায় সবার অবস্থা মারাত্মক সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে, যারা স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যাদের পুঁজির পরিমাণ নেহায়েত কম তারা চাকরি হারিয়ে, ব্যবসা হারিয়ে এখন দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের ক্ষতি ও বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার মতো সহায়ক কিছু না থাকায় তারা আরো বেশি বিপদে পড়েছেন। তাদের ভবিষ্যৎ আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে বলে আশঙ্কা বুকে নিয়ে কোনোভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ সময় তাদের সব বিপদ-আপদ এবং সংকটে পাশে অনেকটা সহযোগী হতে পারত বিমা। যদি তাদের চাকরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি সামাল দিতে বিমা করা থাকত তাহলে খুব বেশি অসহায় অবস্থার মধ্যে হয়তো পড়তে হতো না।

সম্প্রতি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (ইডরা) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি লিখে এ বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়েছে। পাঠানো চিঠিতে বিমা খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, শিল্প কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইন মেনে বাধ্যতামূলক গ্রুপ বিমা চালু করতে হবে। শ্রম আইনে উল্লেখ থাকলেও দেশের অধিকাংশ শিল্প এবং কল-কারখানায় বাধ্যতামূলক গ্রুপ বিমা চালু হয়নি। বিধান পরিপালন না করার ফলে আইনের মূল উদ্দেশ্য তথা শ্রমিকদের স্বার্থ যথাযথ সংরক্ষিত হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাম্প্রতিক একটি জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রায় অর্ধশত শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইডরার চিঠিতে উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিককালে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। অঙ্গহানিসহ স্বাস্থ্যগতভাবে অক্ষম হয়ে গেছেন অনেক শ্রমিক। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। উপরন্তু নিহত ও আহত শ্রমিকদের জন্য সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে আর্থিক সহায়তা দিতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সরকারের জন্য বিব্রতকর এবং জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় মালিকপক্ষও আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

সংশোধিত শ্রম আইনের ৯৯(১) ধারা অনুযায়ী যেসব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১০০ স্থায়ী শ্রমিক রয়েছে, তাদের জন্য মালিকপক্ষ গ্রুপ বিমা নিশ্চিত করবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইডরা চাইছে, আইনের এই ধারাটি প্রতিপালনে কর্মকৌশল নির্ধারণের জন্য যেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেওয়া হয়। ইডরা মনে করছে, শিল্প কারখানায় বাধ্যতামূলক বিমা নিশ্চিত করা হলে মালিক ও শ্রমিক উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। শিল্প-কারখানায় কোনো অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার কারণে যখন শ্রমিকদের জীবনহানি বা স্বাস্থ্যঝুঁকি ঘটে- তখন সবাই মালিকপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে। গ্রুপ বিমা নিশ্চিত করতে পারলে শ্রমিকদের জন্য এই ক্ষতিপূরণ করবে বিমা কোম্পানিগুলো। এতে মালিকপক্ষের যেমন আর্থিক দায়ভার কমবে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারগুলোও সংকট উত্তরণের সুযোগ পাবেন। গ্রুপ বিমা চালুর পর দুর্ঘটনা কবলিত শিল্প কারখানার মালিকদের আর্থিক দায়ের সিংহভাগ জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাহ করা সম্ভব। উপরন্তু গ্রুপ বিমা নিশ্চিত করার কারণে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের ফলে কোম্পানির প্রতি শ্রমিকদের যেমন দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে, তেমনি উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।

লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির তথ্য থেকে দেখা যায়, বেশির ভাগ কল-কারখানায় শ্রমিকদের গ্রুপ বিমার আওয়তায় আনা হয়নি। এতে শ্রমিকদের জীবন ও ক্ষতিপূরণ অনেকটা অবহেলিত। শ্রম আইনের ৯৯ ধারা অনুযায়ী গ্রুপ বিমা চালু করলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের একটি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনা যায়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকদের মৃত্যু অথবা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আর্থিক দায়ের বেশির ভাগ জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া হয়। আবার গ্রুপ বিমা চালু করা হলে সেই প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ে। সম্প্রতি কয়েকটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বহুসংখ্যক শ্রমিক আহত ও নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রতিটি কারখানায় গ্রুপ বিমা চালু করলে মালিক ও শ্রমিক উভয়েই লাভবান হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী শিল্প ও কল-কারখানার শ্রমিকদের বিমার আওতায় আনতে হবে। কিন্তু মালিকরা শ্রমিকদের বিমার আওতায় আনেন না। কারণ শ্রমিকদের বিমার আওতায় আনলে মালিকদের প্রিমিয়াম জমা দিতে হবে। মালিকরা খরচ কমিয়ে অধিক মুনাফার আশায় শ্রমিকদের ওপর বিমা করতে আগ্রহ দেখান না। তবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আইনে গ্রুপ বিমা বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়েছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলামিস্ট

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close