তরুণদের চিন্তায় বইমেলা : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চিন্তার মহোৎসব
বইমেলা এমন একটি মহোৎসব, যেখানে বহুমুখী চিন্তাভাবনার মিলন ঘটে এবং পুনরুজ্জীবিত হয় আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে বইমেলা শুধু একটি মেলা নয়; এটি চিন্তা ও মননের উৎকর্ষ সাধনের এক অনন্য ক্ষেত্র। বইয়ের মাধ্যমে নতুন ভাবনা, জ্ঞান ও সৃজনশীলতার দ্বার উন্মুক্ত হয় তরুণদের সামনে। তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় বইমেলার এই বহুমুখী গুরুত্ব ও চিন্তাধারাই তুলে ধরেছি আমি শেখ সুলতানা মীম

বাংলা ভাষার ঐতিহ্যে রাঙা বইমেলা
বাংলা ভাষার ঐতিহ্যে রাঙা বই মেলা বাঙালি জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মহোৎসব। বই মেলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভাষার মাহাত্ম্য, সাহিত্যিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বই মেলায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি নতুন স্টল, বইয়ের সমারোহ ও পাঠকদের উচ্ছ্বাস। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী বইসহ নানাধরনের বইয়ের সমারোহে মেলা হয়ে উঠে আরো প্রাণবন্ত। নতুন প্রজন্মের লেখকরা তাদের সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। বইমেলার পরিবেশ, নতুন বইয়ের গন্ধ ও পাঠকদের উৎসাহ প্রমাণ করে যে বইমেলা এখনো জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। বইমেলা বাংলা ভাষার ঐতিহ্য রক্ষা, সাহিত্যচর্চা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মকে সাহিত্য প্রেমে উজ্জীবিত করার শক্তিশালী মাধ্যম। তাই আমাদের উচিত বই মেলায় অংশগ্রহণ করা, নতুন বই পড়া এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা।
লাবণি আক্তার
ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
বইমেলার ইতিহাস ও গোড়াপত্তন
বাঙালির মনন ও মেধার মিলনমেলা হলো অমর একুশে বইমেলা। তবে আজকের এই বিশাল আয়োজনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত বিনম্র। এর গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন বর্ধমান হাউসের সামনের বটতলায় চটের ওপর মাত্র ৩২টি বই সাজিয়ে একটি ক্ষুদ্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে তার প্রতিষ্ঠিত ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনীর এই উদ্যোগই ছিল বইমেলার বীজ।?পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯৮৪ সালে এটি ‘অমর একুশে বইমেলা’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় মেলার পরিধি একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে আজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি কেবল বই কেনাবেচার স্থান নয়, বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলা এই মেলা আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের শেকড়কে আরো মজবুত করে।
কানিজ সূবর্ণা বাবলি
অর্থনীতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ।
বইমেলা সাহিত্যের মেলবন্ধন
প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলা উদযাপন করা হয়। বইমেলা মানে আসলে সাহিত্য মিলনমেলা। এখানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের চর্চা হয়। এখানে লেখক, পাঠক, প্রকাশক সবাই মিলিত হন। নতুন বই প্রকাশের এটা একটা আদর্শ জায়গা। পাঠকরা প্রিয় লেখকদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনা হয় এর পাশাপাশি বাচ্চাদের জন্য থাকে বিশেষ আয়োজন। বই কেনা বেচার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানার্জনের সুযোগ থাকে। সাহিত্যিক পরিবেশে সবার মন ভালো হয়ে যায়। আজকাল ফেসবুক রিলসে আসক্ত হয়ে মানুষ বইমেলা থেকে বিমুখ হয়ে পড়ছে। বইমেলার প্রতি বিমুখতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত। তাই সকলকে বই মেলায় আসতে হবে এবং সাহিত্য চর্চা করতে হবে। মনে রাখতে হবে সাহিত্য মিলনমেলা আমাদের সংস্কৃতির অংশ তাই এটা ধরে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
নুসরাত জাহান বৈশাখী
ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
জ্ঞানের সমাহার বইমেলা
জ্ঞান বিভিন্ন বইয়ের অক্ষরে লুকিয়ে থাকে। অমর একুশে বইমেলা এক কথায় একটি দেশের জ্ঞানের মেলা বা আলোর মেলা। জ্ঞানের জগৎ নামে বইমেলায় বই বিক্রি করা হয়। বই নিয়ে মেলা হতে পারে এবং বইয়ের প্রচার-প্রসারের কাজে জ্ঞানের ভূমিকা বইমেলার মাধ্যমে ফুটে ওঠে। একটি মেলা আমাদের আগ্রহ, সংস্কৃতি, সমাজ, প্রেম-মোহ, ইতিহাস, ধর্ম ইত্যাদি একত্রে সমৃদ্ধ করে; যার ফলে জ্ঞান তার নির্দিষ্ট পথ সহজে বেছে নিতে পারে। বইমেলার মাধ্যমে পাঠকদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ ও জানার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়। একই জায়গায় কথাসাহিত্য, গবেষণাধর্মী গ্রন্থ, প্রবন্ধ, কবিতা, অনুবাদ, শিশুতোষ বই- প্রায় সবশাখার জ্ঞানপিপাসুদের উপস্থিতিতে মৌমাছির মতো জ্ঞানের কথা পৌঁছে দেয় পাঠকপ্রেমীদের মনে। এ যেন এক জ্ঞানের মিলন মেলা। আরো চোখে পড়ে, স্কুল-পড়ুয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বইমেলায় আসে যাতে তারা সরাসরি লেখক ও গবেষকদের বক্তব্য শুনতে পারে। বইমেলায় আরো দেখা যায়, শিশুরা গল্পপাঠ, চিত্রাঙ্কন ও কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। বর্তমান যুগ প্রযুক্তি নির্ভর, এ যুগে এসেও বইমেলায় পাঠকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে বইমেলা হলো একগুচ্ছ জ্ঞানের সমাহার। পাঠকপ্রেমীদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ আরো বাড়ুক এবং জ্ঞানের আলো নিজের মনে ও মস্তিষ্কে সতেজ রাখুক।
জান্নাতুল ফেরদৌস আনান
ইডেন মহিলা কলেজ।
নব্য লেখকদের শব্দের অভিষেক
?অমর একুশে বইমেলার প্রতিটি ধূলিকণা নব্য লেখকের কাছে একরাশ স্বপ্ন ও শিহরণের নাম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন নিজের নামাঙ্কিত প্রথম বইটি মেলায় আসে তখন সেই অনাবিল আনন্দ প্রকাশের ভাষা থাকে না। নবীন এই কলমযোদ্ধারা তাদের সৃজনশীলতা ও মননের মেলবন্ধনে সাহিত্যের আঙিনাকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিতে চান। পাঠকদের কৌতূহলী দৃষ্টি আর প্রকাশকদের উৎসাহ নব্য লেখকদের এই বন্ধুর পথে এগিয়ে যাওয়ার মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। এই আত্মপ্রকাশ কেবল একটি বইয়ের মুক্তি নয় বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের বীজ বপন করার সাহসী পদক্ষেপ। প্রবীণদের আশীর্বাদ আর সমসাময়িকদের প্রতিযোগিতার ভিড়ে একজন নতুন লেখক যখন তার নিজস্ব শৈলী খুঁজে পান তখন মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে সার্থক। প্রতিটি নতুন পৃষ্ঠা নতুন এক জীবনের গল্প বলে যা সাহিত্যের চিরায়ত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। মেলার এই মিলনমেলায় নবীনদের জয়যাত্রা চিরকাল অব্যাহত থাকুক এবং তাদের লেখনী হয়ে উঠুক সমাজের দর্পণ। সাহিত্যের এই বিশাল সমুদ্রে তারা যেন নিজেদের স্বতন্ত্র স্থান করে নিতে পারে সেই শুভকামনা নিরন্তর।
শাম্মী শফিক জুঁই
ইংরেজি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
"









































