নাজমুল হুসাইন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
নোনাজলের জনপদে জাকাতের আলো

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা। যেখানে দিগন্তজোড়া জলরাশি থাকলেও সেখানে পানের যোগ্য এক ফোঁটা মিঠা পানির জন্য হাহাকার দীর্ঘদিনের। লবণাক্ততা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, দারিদ্র্যতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি-এসব যেন এখানকার মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিশেষ করে সুপেয় পানির অভাবে চর্মরোগ ও পেটের পীড়া ছিল এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ধূসর জনপদে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। অত্র অঞ্চলে আশার আলো হয়ে এগিয়ে এসেছে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম)।
মানব উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ৫০০ পরিবারকে নিয়ে স্বাস্থ্যভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খড়িতলা গ্রামে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি সোলারচালিত অটো স্যান্ড পন্ড ফিল্টার (পিএসএফ) স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে এই পিএসএফের মাধ্যমে ১১টি গ্রামের ৬৩০টি পরিবারের প্রায় ৩ হাজার ৭৮০ জন মানুষ নিরাপদ পানি পাচ্ছেন। গড়ে প্রতিদিন ৮২টি পরিবার প্রায় ২ হাজার ৪৬০ লিটার পানি সংগ্রহ করে। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন আর্সেনিক, আয়রন ও লবণাক্ততায় ভোগা মানুষ এখন ধীরে ধীরে সুস্থ জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই উপকার তারা কোনোদিন ভুলবেন না, যতদিন এই পানি খাবেন, ততদিন যাকাতের অর্থের যোগানদাতাদের জন্য দোয়া করবেন।
নিরাপদ পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সিজেডএম। গত ১০ মাসে ২৯টি সাপ্তাহিক স্বাস্থ্য ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। এছাড়া ৭২টি সচেতনতামূলক সেশনে দুই হাজারের বেশি নারী অংশগ্রহণ করেছেন, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিশোরীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গঠন করা হয়েছে তিনটি বিশেষ দল। ৮৩ জন সদস্য নিয়ে পরিচালিত এসব দলের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং অংশগ্রহণকারীদের মাঝে স্যানিটারি ন্যাপকিন, পুষ্টিকর খাবার ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
দরিদ্র পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সিজেডএম জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্প চালু করে। প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, এখানকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস দিনমজুরি এবং ৭৫ শতাংশ পরিবারের আয় তাদের ব্যয়ের চেয়ে কম। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ধাপে ধাপে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ৪৯০টি পরিবারের মাঝে ৪৯ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার টাকার সহায়তা পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। এছাড়া জরুরি সহায়তা হিসেবে চিকিৎসা ও অপারেশন ব্যয়ের জন্য বিশেষ অনুদান এবং শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।
কালীগঞ্জের এই অসহায় পরিবারগুলোর মধ্যে আশার আলো জাগিয়ে তুলতে যিনি সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি হলেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ। তার দানকৃত নিজস্ব জমিতে এই প্রকল্প চালু হয়েছে। মরহুম শেখ গোলাম রহমান ও মরহুমা শেখ রাবিয়া রহমানের মাগফিরাত কামনায় সেখানে ‘ফেরদৌসী নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’ নির্মাণ করা হয়েছে। যা বাস্তবায়ন করেছে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট বা সিজেডএম। এবিষয়ে ড. শেখ আব্দুর রশিদ জানান, তার পূর্বপুরুষরা এলাকার মানুষের মঙ্গলের জন্য সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। ব্যক্তিগত প্রয়াসে বড় কিছু করা কঠিন হলেও সিজেডএম সেই সুযোগ করে দিয়েছে। নিজের পৈত্রিক ভিটায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের এ ধরনের জনকল্যাণমুখী উদ্যোগে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
সিজেডএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া জানান, গত ১৭ বছরে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৮ লাখ হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কালীগঞ্জ প্রকল্প দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যাকাত শুধু তাৎক্ষণিক দান নয়। এটি একটি টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থা হতে পারে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও কিশোরী উন্নয়ন এবং জীবিকা সহায়তার সমন্বয়ে একটি পরিবারকে হতদরিদ্র অবস্থা থেকে স্বাবলম্বী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার এই প্রয়াস আগামীর সামাজিক পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ।
"









































