প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
কবি নজরুলকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা সময়ের দাবি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মারা গেছেন অর্ধশতাব্দী আগে। কিন্তু তার সাহিত্য, দর্শন, রাজনৈতিক চিন্তা, সংগীত, সাংবাদিকতা, নাট্যচর্চা ও বহুমাত্রিক জীবন নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা এবং একটি নির্ভরযোগ্য জীবনী রচিত হয়নি। ফলে ভবিষ্যৎ গবেষকরা তথ্য অনুসন্ধানে বিভ্রান্তির মুখে পড়তে পারেন। এ অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নজরুলকে নিয়ে সমন্বিত গবেষণা এবং পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনা এখন সময়ের দাবি বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন)।
‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করায় জাতীয় কবিকে নতুন করে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ যেন এক বছরের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশ-বিদেশে বহু গবেষক কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও সেগুলোর অধিকাংশই খণ্ডিত বা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়কেন্দ্রিক। ফলে নজরুলের জীবন, সাহিত্য, দর্শন ও কর্মের সামগ্রিক মূল্যায়ন এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম নজরুলের জীবনী রচনা করলেও সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অধ্যাপক আতাউর রহমান জীবনী রচনার কাজ শুরু করলেও শেষ করার আগেই মারা যান। কবি ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দও একইভাবে তার গবেষণা অসমাপ্ত রেখে যান। গবেষক গোলাম মুরশিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ দীর্ঘদিন নজরুলের জীবনী নিয়ে কাজ করেছেন। তবে এখনো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যসমৃদ্ধ জীবনী পাওয়া যায়নি, যা জাতীয় কবির সমগ্র জীবন ও কর্মকে ধারণ করে।
তিনি বলেন, ‘বিদেশেও নজরুলচর্চার বিস্তার ঘটেছে। ব্রিটিশ কবি, গবেষক ও অনুবাদক উইলিয়াম রাদিচে নজরুলের কবিতা ও গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইনিং ল্যানলি নজরুলের সাহিত্য, ধূমকেতু ও লাঙল পত্রিকার ভূমিকা, লেটো দলে তার অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনার নাম ‘নৈতিক সাহস এবং সত্যরক্ষা : কাজী নজরুল ইসলাম’।
মহাপরিচালক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির এথনোমিউজিকলজির অধ্যাপক হেনরি গ্লাসিও নজরুলের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা করেছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পাঠ শেষে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, বিংশ শতাব্দীর দুটি শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি টি. এস. এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ এবং অন্যটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দ্য রেবেল’।’ তিনি জানান, কানাডার টরেন্টো ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রবাসীদের উদ্যোগে নজরুলের নামে ‘চেয়ার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে কাজী নজরুল ইসলামের নামে একটি স্কুল রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। এ ছাড়া কলকাতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নজরুলকে নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ‘নজরুল বক্তৃতা’ চালু করেছিলেন। সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবতাবাদী চিন্তাবিদ শিবনারায়ণ রায় ‘নজরুলের মানবতাবাদ’ বিষয়ে বক্তৃতা দেন। একই সময়ে তিনি নজরুলের ৩ হাজার ৩১৭টি গান, পাঁচ শতাধিক কবিতা, শিশুতোষ রচনা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও ছড়া সংকলনের কাজেও যুক্ত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যজীবনে (১৯১৯-১৯৪২) নজরুল যে বিপুল সাহিত্যভাণ্ডার সৃষ্টি করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যে এক বিরল ঘটনা। কখনো কখনো তার মনে হয়, নজরুল যেন নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস পেয়েছিলেন। সেই কারণেই হয়তো তিনি লিখেছিলেন-‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিবো না...’। নিজের নিয়তি উপলব্ধি করার যে অসাধারণ ক্ষমতা নজরুলের ছিল, তা সত্যিই বিস্ময়কর।’ তিনি আরো বলেন, নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদ, দার্শনিক চিন্তা, কমরেড মুজাফফর আহমেদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক, রুশ বিপ্লব ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ভাবাদর্শগত পরিবর্তনসহ জীবনের বহু অধ্যায় এখনো গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
মহাপরিচালক বলেন, নজরুলের গান, কবিতা, প্রবন্ধ, সম্পাদকীয়, সাংবাদিকতা, সৈনিক জীবন, বেতার জীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, চলচ্চিত্র, নাট্যচর্চা ও কারাজীবনের প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও ইতিহাসের অনন্য দলিল। এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা গেলে জাতীয় কবির প্রকৃত প্রতিভা ও চিন্তার গভীরতা নতুনভাবে উন্মোচিত হবে।
তিনি বলেন, এ কারণেই ঘোষিত নজরুল বর্ষে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। না হলে ভবিষ্যতের গবেষকরা নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবেন।
রেজাউদ্দিন আহমেদ জানান, ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বছরব্যাপী নানান কর্মসূচি পালন করবে। এর মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ শীর্ষক প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি, উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে একশ তরুণ শিল্পী নির্বাচন, নজরুল সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির কর্মশালা, বিভিন্ন জেলায় আর্ট ক্যাম্প, ‘নজরুল নাট্য উৎসব’, নজরুলভিত্তিক যাত্রাপালা, গবেষণাগ্রন্থ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতে নজরুলের অবদান নিয়ে বিশেষ আয়োজন। তিনি বলেন, নজরুলের লেখা ১১টি নাটকের মধ্যে বর্তমানে পাওয়া সাতটি নাটক নিয়ে জাতীয় নাট্য উৎসব আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি তার জীবনভিত্তিক যাত্রাপালা দেশের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চস্থ করা হবে। এরই মধ্যে এটির রচনার কাজ শুরু হয়েছে।
রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলাদেশের জাতীয় কবি নন, তিনি বিশ্বমানবতার কবি। পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমত, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মতো বিশ্বকবিদের সমপর্যায়ের, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও বিস্তৃত মানবিক চেতনার অধিকারী ছিলেন তিনি। তিনি বলেন, যথার্থই গবেষক উইনিং ল্যানলি নজরুলকে ‘উপনিবেশবাদবিরোধী সর্বশেষ কণ্ঠস্বর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাই নজরুলকে নতুন প্রজন্ম ও বিশ্বের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, প্রামাণ্য প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই।
"








































