গাজী শাহাদত ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
আছাব আলী-সালেকা দম্পতি
১০ সন্তানের বাবা-মা, দুবেলা খাবার জোটে না

সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বাবা-মা সারা জীবন নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন। দিনের পর দিন পরিশ্রম করে গড়ে তোলেন তাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই সন্তানরাই যদি জীবনের শেষ বয়সে বাবা-মায়ের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে তার চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে? জানা যায়, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বানিয়াগাঁতী গ্রামের ৯০ বছর বয়সি আছাব আলী ও তার ৮০ বছর বয়সি স্ত্রী সালেকা বেগমের জীবন যেন সেই নির্মম বাস্তবতারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েসহ ১০ সন্তানের বাবা-মা হয়েও আজ তারা দিন কাটাচ্ছেন চরম দারিদ্র?্য, অসুস্থতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। দুবেলা খাবার জোটাতেও তাদের নির্ভর করতে হয় প্রতিবেশীদের সহানুভূতি আর মানবিক সাহায্যের ওপর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন আছাব আলী। কষ্ট করে তাদের বড় করেছেন। সংসার গুছিয়ে দিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন। অথচ আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানদের অধিকাংশই বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছাব আলী প্রায় চলাফেরার শক্তি হারিয়েছেন। নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন না, দৈনন্দিন কাজও অন্যের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন সালেকা বেগম। নিজের অসুস্থতা ভুলে প্রতিদিন স্বামীর সেবাযত্নে ব্যস্ত থাকেন তিনি।
কখনো স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যান, আবার কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন।
প্রতিবেশীরা জানায়, দারিদ্র?্যরে নির্মম চিত্র যেন তাদের ছোট্ট বসতঘর। জরাজীর্ণ টিনের চাল, ছিদ্রযুক্ত বেড়া বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। নিরাপদ থাকার মতো পরিবেশ নেই, নেই ভালো শৌচাগার কিংবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। একটি ভালো খাটও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। বাঁশের তৈরি একটি মাচার ওপর চট বিছিয়ে কোনোভাবে রাত কাটান এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভার আর অসুস্থতার যন্ত্রণায় প্রতিটি রাত যেন তাদের কাছে দীর্ঘশ্বাসের আরেকটি অধ্যায়। প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে বলেন, চাচা-চাচিকে এই কষ্টে দেখতে খুব খারাপ লাগে। আমরা যার যা সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এভাবে তো আর কত দিন চলবে? জীবনের শেষ সময়ে তাদের পাশে সমাজের সবাই দাঁড়ানো উচিত। আরেক প্রতিবেশী কামাল শেখ বলেন, এত ছেলে-মেয়ে থাকার পরও বাবা-মায়ের এই অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। এই বয়সে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সন্তানদের ভালোবাসা ও যত্ন। কিন্তু তারা পেয়েছেন শুধু অবহেলা। স্থানীয় বাসিন্দা জুরান আলী জানান, আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ে মোট ১০টি সন্তান। সবাইকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। কিন্তু আজ কেউই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন না। ফলে দুবেলা খাবার জোগাড় করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, সবার সহযোগিতায় অন্তত ৭০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে তাদের জন্য একটি চলাচলের উপযোগী হুইলচেয়ার বা সহায়ক যান, খাদ্যসামগ্রী এবং জরুরি প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। সামান্য সহযোগিতাও তাদের জীবনের শেষ সময়টুকু স্বস্তির করে তুলতে পারে। শেষ বয়সে মানুষের কাছে সহযোগিতার আকুতি জানিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সালেকা বেগম বলেন, আমরা আর কিছু চাই না বাবা। শুধু দুবেলা ভাত খেয়ে, একটু শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই। আল্লাহ যেন সবাইকে ভালো রাখেন। ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সোহাগ মণ্ডল জানান, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হয়। কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো ১০টি সন্তান থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে তাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ যদি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে জীবনের শেষ সময়টুকু তারা অন্তত সম্মান আর স্বস্তির সঙ্গে কাটাতে পারবেন।
কারণ মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে শুধু প্রয়োজন আরেকটি সাহায্যের হাত। একসময় যে হাত ১০ সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছিল, আজ সেই হাতই প্রসারিত হয়েছে মানুষের সহানুভূতির আশায়। যে চোখ এক দিন সন্তানদের সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই চোখে জমেছে অসহায়ত্বের অশ্রু। হয়তো একটি সহানুভূতির স্পর্শ, কিছু খাদ্যসামগ্রী, একটি চলাচলের সহায়ক যান কিংবা সামান্য আর্থিক সহযোগিতাই ফিরিয়ে দিতে পারে এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবনের শেষ সময়ের কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা নিরাপত্তা এবং বহু দিনের হারিয়ে যাওয়া হাসি।
"








































