১৩ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নাটোর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, চাঁদপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

গঙ্গা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, অপরদিকে পদ্মা নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এসব কথা বলা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, মনু নদী ব্যতীত উত্তরাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা সিটি করপোরেশন সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেরর বন্যা পরিস্থিতির স্থিতিশীল থাকতে পারে। দেশের ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে বন্যা আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ১৮টি।

এর মধ্যে বৃদ্ধি ৩৪টি এবং হ্রাস ৬৩টির, বিপৎসীমার ওপরে নদ-নদীর সংখ্যা ১৪টি এবং অপরিবর্তিত চারটি, আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ১৩টি, বিপৎসীমার ওপর স্টেশনের সংখ্যা ২০টি, বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত স্টেশন ২২টি। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে, পটুয়াখালী ৬৬ মিলিমিটার, মৌলভীবাজার ৫১ মিলিমিটার ও বরগুনা ৫৫ মিলিমিটার।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন বানভাসি মানুষ। গ্রামে ফিরে লন্ডভন্ড রাস্তাঘাট ও নড়বড়ে ঘরবাড়ি দেখে তাদের আহাজারি শুরু হয়েছে। চারপাশে কেবলই ধ্বংসস্তূপ। ফসলি জমিতেও কাদামাটি। তাই এখনো অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে অথবা বিভিন্ন বাঁধেই থাকছেন।

আমতলী বাজারের পশ্চিম পাশে বলিয়াদহ উচ্চবিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সামনে এখনো হাঁটুপানি। বিদ্যালয়টিতে আশ্রয় নেওয়া ১৫টি পরিবার এখনো আছে। গ্রাম থেকে পানি নেমে গেলেও তারা বসতবাড়িতে ফিরতে পারেননি। তাদের অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। অনেকের ঘরে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কারো কারো বাড়িঘর বন্যায় ভেসে গেছে।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ওই বছর বন্যার পানি ৬৩ দিন ছিল। চলমান বন্যা সেই হিসেবে দ্বিতীয় দীর্ঘতম। ৩৯ দিন পরও বন্যায় পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছে দেশের উত্তর-দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের মানুষ। উজানে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যার স্থায়িত্বকাল দফায় দফায় বেড়েছে। তবে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এবারের বন্যা স্থায়ী হওয়ার আটটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এবার বন্যার পানির সম্প্রসারণ পরিমাণ ১৯৯৮ সালের চেয়ে অনেক কম হলেও স্থায়িত্ব বাড়ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৩৩ জেলার কোথাও না কোথাও বন্যার পানি রয়েছে। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা এখন প্রায় ৫৬ লাখ। এর মধ্যে ৭৬ হাজার মানুষ সরকারিভাবে খোলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে উঠেছে। সড়ক, বাঁধসহ নানা উঁচুস্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ চলতি সপ্তাহে সরকারকে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে চলমান বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আটটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় এখন পানি ঢুকেছে কিন্তু নামছে না, সেসব এলাকার বেশির ভাগই নিচু ও চর। এসব এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ ও নগরায়ণ হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত মাটির নিচে নামতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, জলাভূমি ও প্লাবনভূমিগুলোর বড় অংশ বেদখল হয়ে গেছে। ফলে নদীগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণেও পানির প্রবাহ ধীরগতিতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, বন্যা মোকাবিলায় যেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তা নদীর সঙ্গে প্লাবনভূমির যে সম্পর্ক ছিল, তা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

চতুর্থ কারণ হিসেবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় যেসব বনভূমি ছিল, তা কেটে কৃষিজমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে ভূমি থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি গিয়ে নদীতে পড়ছে। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে উঠছে। পঞ্চম কারণ, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে প্লাবনভূমির মধ্যেও সড়ক নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা তৈরি করা হয়েছে। ষষ্ঠ বিষয়টি হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর উজানে জলাধার, বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে, যা নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। সপ্তম কারণ, বাঁধ ও নানা অবকাঠামোর কারণে নদীতীরবর্তী এলাকার তাপমাত্রাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বৃষ্টিপাত বেড়ে গেছে।

বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অষ্টম কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীর চারদিকে অবকাঠামো নির্মাণ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে নদীতে পলির পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে পানি দ্রুত বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।

বন্যা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন তৈরির কাজে যুক্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় এমনিতেই পানির প্রবাহ বেড়ে গেছে। বাড়তি বৃষ্টিপাত এর সঙ্গে যোগ হয়েছে। আর অবকাঠামোগুলোর মাঝখানে পানি আটকে থাকায় বন্যার স্থায়িত্ব বাড়ছে। তিনি বলেন, হাওরের বুক চিরে রাস্তা বানানোসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে। এসব তৎপরতা বন্ধ না করলে হাওর এলাকায়ও দীর্ঘমেয়াদে বন্যা হতে পারে।

 

"