স্পেন-আর্জেন্টিনার ভাগ্য ঝুলছে যে ছয় লড়াইয়ে

আর মাত্র আড়াই ঘণ্টার অপেক্ষা; এরপরই শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই। যার জন্য নেমেছিল ৪৮টি দল। দীর্ঘ ৩৮ দিনের যুদ্ধ শেষে টিকে আছে দুটি দল।
নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। দুই দলই ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত ফুটবলকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এখানে পৌঁছেছে।
স্পেন পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিল দুর্দান্ত ছন্দে থাকা একটি সুসংগঠিত দল। প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা আবার দেখিয়েছে তাদের চিরচেনা লড়াকু মানসিকতা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল লিওনেল মেসির। তাহলে শিরোপা কার হাতে উঠবে? ইউরোর পর বিশ্বকাপও কি জিতবে স্পেন, নাকি ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা? ফুটবল ভিত্তিক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট গোল ডটকমের বিশ্লেষণে ফাইনালের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এই ছয়টি লড়াই।
১. রদ্রি বনাম এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার
ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের আধিপত্যের অন্যতম বড় কারণ ছিলেন রদ্রি। চোট কাটিয়ে ফিরে তিনি আবারও নিজের সেরা ছন্দে। মাঝমাঠে তার নিয়ন্ত্রণই স্পেনের খেলাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর্জেন্টিনার জন্য তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রদ্রিকে সময় না দেয়া। এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে নিরবচ্ছিন্ন চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে স্পেনের অধিনায়ক স্বাভাবিকভাবে খেলা গড়ে তুলতে না পারেন। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনা চাইবে এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টার যেন আক্রমণেও প্রভাব ফেলতে পারেন। এনজো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক না হলেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করেছেন। আর ম্যাক অ্যালিস্টার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুইবার পোস্টে বল মেরে বুঝিয়েছেন, তিনিও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
২. উনাই সিমন বনাম এমিলিয়ানো মার্তিনেজ
পরিসংখ্যান বলছে, গোলরক্ষক হিসেবে এই বিশ্বকাপে উনাই সিমনের পারফরম্যান্স এগিয়ে। স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে, যেখানে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সাতবার বল কুড়িয়েছেন জাল থেকে। তবে বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতার কথা উঠলে পাল্লা ভারী মার্তিনেজের দিকেই। দুর্দান্ত সেভ, মানসিক চাপ তৈরি করা কিংবা প্রতিপক্ষকে হতাশ করে দেয়ার ক্ষমতা; সব মিলিয়ে তিনি বড় মঞ্চের খেলোয়াড়।
অন্যদিকে সিমন তুলনামূলকভাবে নিরিবিলি টুর্নামেন্ট কাটিয়েছেন। কারণ স্পেনের রক্ষণভাগ তাকে খুব বেশি পরীক্ষার মুখে পড়তে দেয়নি। কিন্তু ফাইনালে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের বিপক্ষে তার সামর্থ্যের সত্যিকারের পরীক্ষা হতে পারে।
৩. মিকেল ওইয়ারসাবাল বনাম হুলিয়ান আলভারেজ (অথবা লাউতারো মার্তিনেজ)
একজন স্পেনের, আরেকজন আর্জেন্টিনার; তবে দুজনের ভূমিকায় মিল রয়েছে। আক্রমণের শেষ ভাগে দলের জন্য কার্যকর হওয়াই তাদের প্রধান কাজ। ওইয়ারসাবাল পুরো টুর্নামেন্টেই দুর্দান্ত ছন্দে। সৌদি আরব ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের পাশাপাশি ফ্রান্সের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টিও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রূপান্তর করেছেন। ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালের জয়সূচক গোলও ছিল তার।
অন্যদিকে হুলিয়ান আলভারেজ এখনও নিজের সেরাটা দেখাতে পারেননি। চোট কাটিয়ে ফেরায় শুরুটা ধীর ছিল। তবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তার অসাধারণ গোল প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে তিনি কতটা ভয়ংকর হতে পারেন।
এদিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করা লাউতারো মার্তিনেজও একাদশে ফেরার জোর দাবি জানিয়েছেন। ফলে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির জন্য এটিও বড় সিদ্ধান্ত।
৪. মার্ক কুকুরেয়া বনাম লিওনেল মেসি
মেসি পুরো সময় ডানপ্রান্তে খেলবেন না, তবে এই বিশ্বকাপে তিনি দেখিয়েছেন যে ৩৯ বছর বয়সেও উইং থেকে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। ড্রিবলিংয়ের পাশাপাশি তার ক্রস এখনও প্রতিপক্ষের জন্য বড় অস্ত্র। ইংল্যান্ড ও মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনে ডানদিকে মেসিকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ফলে কুকুরেয়াকে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে, কারণ মেসি বারবার ডানপ্রান্তে সরে যেতে পারেন।
তবে মেসির রক্ষণে খুব বেশি ভূমিকা না থাকায় কুকুরেয়াও সামনে ওঠার সুযোগ পাবেন। তাই আর্জেন্টিনার ডান পাশের মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল কিংবা জুলিয়ানো সিমিওনে, কুকুরেয়াকে আটকে রাখার পাশাপাশি মেসির জন্য জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করবেন।
৫. লামিন ইয়ামাল বনাম নিকোলাস তাগলিয়াফিকো
এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে নিজের সেরা খেলাটা খেলতে পারেননি লামিন ইয়ামাল। চোট এবং নিজেকে প্রমাণ করার বাড়তি চাপ তার পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে। তবুও আত্মবিশ্বাস হারাননি এই তরুণ তারকা। তিনি বিশ্বাস করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই নিজের সেরাটা দেখাবেন। অন্যদিকে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওসমান দেম্বেলেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিলেন তিনি।
তবে ২০২৬ সালের ইয়ামাল অনেক বেশি গতিময় ও বৈচিত্র্যময়। তাই এনজো ফার্নান্দেজ ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে তাগলিয়াফিকোর জন্য এই লড়াই কঠিন হয়ে যেতে পারে।
৬. লুইস দে লা ফুয়েন্তে বনাম লিওনেল স্কালোনি
টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে। তার দল টানা ছয়টি ম্যাচ জিতে, সবকটিই নির্ধারিত সময়ে শেষ করে ফাইনালে পৌঁছেছে। স্কোয়াড রোটেশন, বদলি খেলোয়াড়দের ব্যবহার এবং ফাবিয়ান রুইজকে নিয়মিত একাদশে এনে তিনি দারুণ সফল হয়েছেন।
অন্যদিকে স্কালোনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে প্রশংসা পেলেও পুরো টুর্নামেন্টে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রুপপর্ব থেকে শুরু করে নকআউটের কয়েকটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের ভারসাম্য নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
ফাইনালের আগে তাই সবচেয়ে বেশি চিন্তা স্কালোনিরই। স্পেনের একাদশ অনেকটাই স্থির, আর তারা ফ্রান্সের বিপক্ষে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে পরিপূর্ণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে। ফলে শুরু থেকেই সঠিক কৌশল বেছে নিতে হবে আর্জেন্টিনা কোচকে। কারণ স্পেনের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়লে, এবার হয়তো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আর নাও মিলতে পারে।








































