যানজটে দীর্ঘশ্বাস, অর্থনৈতিক ও মানবিক মহাবিপর্যয় ঢাকায়

সকাল আটটা। রাজধানীর ব্যস্ত রাজপথ যেন কোনো গতিশীল শহরের ধমনি নয়, বরং স্থবির হয়ে থাকা এক বিশালাকার পার্কিং লট! সারি সারি ব্যক্তিগত গাড়ি, ধুঁকতে থাকা বাস, আর অটোরিকশা-মোটরসাইকেলের হাঁসফাঁস অবস্থা। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, গাড়ির অবিরাম হর্ন আর বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী। অথচ মাথার ওপর দিয়ে নীল আকাশ চিরে ঢাকা মেট্রো ছুটছে বুলেট গতিতে। রাজপথের এই চরম বৈপরীত্যই বলে দেয়—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র ঢাকা আজ এক মহা সংকটে আক্রান্ত।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে ফিকামলি তত্ত্বের জনক ও শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল ওয়াদুদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—যানজট আর কোনো সাধারণ ট্রাফিক সমস্যা নয়, এটি রূপ নিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক ও মানবিক মহাবিপর্যয়ে। আর এই থমকে থাকা ঢাকাকে সচল করার মূল ‘জাদুমন্ত্র’ লুকিয়ে আছে একটাই সূত্রে: ব্যক্তিগত গাড়ির নির্ভরতা কমিয়ে এক বিশ্বমানের ও শৃঙ্খলিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ গতির বোঝা:
বিশ্বব্যাংক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সীমিত অবকাঠামোর ওপর অসীম চাপের ফলেই ঢাকার গতি থমকে গেছে। একটি আধুনিক ও আদর্শ শহরের অন্তত ২৫ শতাংশ এলাকা সড়ক থাকা প্রয়োজন। অথচ আয়তনের দিক থেকে ঢাকায় তা মাত্র ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে সর্বোচ্চ ২ লাখ ১৬ হাজার যানবাহন চলাই নিরাপদ। কিন্তু সেই সীমিত পথেই প্রতিদিন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ৫ লাখ গাড়ি! আর প্রতিদিন নতুন করে নামছে গড়ে ২৩০টি যানবাহন। একসময় ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার, যা বর্তমানে নেমে এসেছে মাত্র ৭ কিলোমিটারে! পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যস্ত সময়ে হেঁটেই অনেক গাড়ির আগে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।
অর্থনীতির ক্ষতি: যানজটের বলিকাষ্ঠে আটকে প্রতিদিন রাজধানীর ৮০ লাখেরও বেশি মহামূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এটি শুধু সময়ের অপচয় নয়; বরং থমকে থাকা চাকার প্রতিটি মিনিটে পুড়ছে বিপুল জ্বালানি, ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন ও আমদানি-রপ্তানি।
বিশ্বের মেগাসিটিগুলো যা করেছে: বিশ্বের বহু বড় শহর একসময় তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারা ফ্লাইওভার বা চওড়া রাস্তা বানিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িকে তোষণ না করে সাধারণ মানুষের গণপরিবহনে নজর দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সিঙ্গাপুর: ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার ওপর কঠোর কর ও বিশেষ অনুমতি নীতি কার্যকর করে বিশ্বমানের এমআরটি (MRT) চালুর মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
টোকিও: নিখুঁত সময়নিষ্ঠা ও সমন্বিত টিকিট ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বৃহত্তম রেলভিত্তিক নগর পরিবহন গড়ে তুলেছে।
সিউল ও দিল্লি: বাস র্যাপিড ট্রানজিট (BRT), স্মার্ট সিগন্যাল ও বিশাল মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সাহায্যে সড়ক থেকে লাখ লাখ ব্যক্তিগত গাড়ি সরিয়ে নিয়েছে।
সচল করার আসল 'জাদুমন্ত্র':
মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় অবকাঠামো নিঃসন্দেহে আশার আলো। তবে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। ঢাকাকে সচল করতে চাই এক সমন্বিত পরিবহন নীতি। মেট্রোরেল ও BRT এর দ্রুত প্রসার: পরিকল্পিত সবকটি এমআরটি লাইন দ্রুত শেষ করা এবং বিআরটি প্রকল্প কার্যকর করা।
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন: লক্কড়-ঝক্কড় বাসের যত্রতত্র থামার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস চালানো।
একক টিকিট ব্যবস্থা (Integrated Ticketing): একটিমাত্র স্মার্ট কার্ড দিয়েই বাস, মেট্রো ও রেলে যাতায়াতের সুবিধা চালু করা।
প্রাযুক্তিক ও নগর ব্যবস্থাপনা
স্মার্ট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ: ম্যানুয়াল সিগন্যাল বাদ দিয়ে এআই (AI) ও ক্যামেরাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা।
ফুটপাত উদ্ধার ও পথচারীবান্ধব নগর: ফুটপাত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষকে নিরাপদে হাঁটার সুযোগ দেওয়া।
অফিস ও স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস (Staggered timing): পিক-আওয়ারের অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সময় ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: সরকারি-বেসরকারি প্রধান দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলোকে ধীরে ধীরে রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া।
শেষের রূপরেখা:
উন্নত শহরের আসল পরিচয় উঁচু উঁচু দালান বা বিশাল উড়ালসড়ক নয়; বরং উন্নত শহরের আসল সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার সহজ ও সর্বজনীন যাতায়াত ব্যবস্থায়।
ঢাকা তখনই সত্যি সচল ও আধুনিক মেগাসিটি হয়ে উঠবে, যখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক নিজ ব্যক্তিগত গাড়িটি গ্যারেজে রেখে স্বাচ্ছন্দ্য ও গর্বের সাথে গণপরিবহনে উঠে বলবেন—"আমার গণপরিবহনই আমার সবচেয়ে দ্রুত ও ভরসার বাহন। সেই লক্ষ্য অর্জনই হওয়া উচিত আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার প্রধান অঙ্গীকার।









































