এম এ মাসুদ

  ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠুক শিক্ষাঙ্গন

কোভিট-১৯ মহামারির শুরুটা চীনে হলেও তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় পুরো বিশ্ব। দীর্ঘ সময় ধরে করোনা মহামারির তাণ্ডবে বিশ্বের অনেক স্থানে জিডিপি কমে যাওয়া, শিল্প-কারখানা বন্ধ, উৎপাদন কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া, ব্যবসায় বাণিজ্যে স্থবিরতাভাব, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধিজনিত কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি। সংক্রমণের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মানুষের মৃত্যু। ভিত নাড়িয়ে দেয় স্বাস্থ্য খাতের। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাখতে একের পর এক দেশে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম শনাক্ত হয় করোনাভাইরাস। বিশ্বে সংক্রমণের উর্ধ্ব গতি আঁচ করতে পেরে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আগাম সতর্কতা হিসেবে ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সংক্রমণ এবং মৃত্যর হার দু'টোই বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে ছুটি। এক সময় যাদের পদচারণায় ও কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠতো দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, কলেজ, মাদ্রাসা, উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন, সেই শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তা হয়ে পড়ে নিস্তব্ধ, প্রাণহীন। শ্রেণি কক্ষ, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল হয়ে পড়ে অপরিচ্ছন্ন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ভরে ওঠে ঘাস, লতাপাতা আর গুল্মে। মাঠগুলো হয়ে উঠেছিল যেন চারণভূমি। বারান্দায় বেঁধে রাখা হতো গবাদিপশু। গত বোরো মৌসুমে ধান মাড়াই, খড় শুকানো এমনকী খড়ের গাদা দেয়ার স্থানেও পরিণত হয়েছিল কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ। দেখা গেছে, মাঠে সবজি চাষও। রক্ষণাবেক্ষণ অভাবে ক্ষতি হয়েছে অবকাঠামো। পরিচিত হলেও ক্যাম্পাসের দিকে তাকালে মনে হতো এ যেন ভুতুড়ে এক অচিন জায়গা ! 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং পড়াশোনায় চাপ না থাকায় পড়ার টেবিল ছেড়ে অনেক শিক্ষার্থীর দৃষ্টি নিবদ্ধ থেকেছিল মোবাইলের স্কিনে। ঝুঁকে পড়েছিল তারা অনলাইন গেমের দিকে। বিষণ্ণতা যেন গ্রাস করেছিল তাদের। প্রিয় সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে চরম উৎকন্ঠা আর হতাশায় সময় অতিবাহিত করছিলেন অভিভাবকগণ। শুধু কী তাই ! যে শিক্ষকরা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে যাওয়া ও শ্রেণি কক্ষে পাঠদানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, গ্রীষ্মকালীন বা রমজানের মতো বন্ধেও যারা প্রতিষ্ঠান খোলার আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, প্রায় আঠার মাস বন্ধ থাকায় শ্রেণি কক্ষে পাঠদান করতে না পারার মানসিক যন্ত্রণা তাদেরও কম ছিলনা। অলস সময় কাটাতে কাটাতে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন মানুষ গড়ার কারিগররা। আফছোস প্রকাশ করতেও দেখা গেছে অনেককে। গ্রামাঞ্চলের মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই হয়েছে বাল্যবিয়ের শিকার। করোনাকালীন সময়ে বাল্যবিয়ে যে ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষত মেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পারে শিক্ষার্থী সংকটে। এমন কথা এখন শিক্ষকদের মুখে চাউর। 

সে যাই হোক,  অনেক দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে ১২ সেপ্টেম্বর খুলছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেরে ফেলতে হবে প্রস্তুতি। এমন ঘোষণায় প্রতিষ্ঠানগুলোয় চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। বিদ্যালয় খোলার সুখবরে শিক্ষার্থীরা বেশ উৎফুল্ল। অভিভাবকদের কাটতে শুরু করেছে হতাশা। আর শিক্ষকদের মাঝেও আনন্দ কম কিসে! কারণ শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের মধ্যেই তো মানুষগড়ার কারিগরদের পরম আনন্দ।    

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে- শুরুতে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির ক্লাস হবে সপ্তাহে একদিন। আর প্রতিদিন ক্লাস হবে পঞ্চম শ্রেণি ২০২১ ও ২০২২ সালে এসএসসি ও এইচএসসির। আপাতত বন্ধ থাকছে প্লে, নার্সারি, কেজি ও প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে চালু হবে অন্যান্য সব ক্লাস। 

যাই হোক, দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস পর আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আবারও হাসি আর আনন্দ নিয়ে তাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এতে অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও বেজায় খুশি। ১২ সেপ্টেম্বর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পদচারণায় ও কোলাহলে আবার মুখরিত হয়ে উঠবে ক্যাম্পাস, শ্রেণি কক্ষগুলো ফিরে পাবে প্রাণ, ফিরবে সেই চির চেনা রূপ। সেই প্রত্যাশা সবার। 

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
[email protected] 

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
শিক্ষার্থী,পদচারণা,শিক্ষাঙ্গন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close