এম এ মাসুদ

  ২৫ জুলাই, ২০২১

আত্নহত্যা নয়, আসুন স্বপ্ন দেখি

জন্মলগ্ন থেকেই নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে মানবসন্তানকে তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। মানবজীবনে সুখ-দুঃখ যেন অলঙ্ঘনীয় এক নিয়তি। চিরজীবন ধারাবাহিকভাবে যেমন কেউ দুঃখ পায় না, ঠিক একইভাবে সুখের মুখও কেউ দেখে না।

জগতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল যার মনে কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, ব্যথা নেই, বেদনা নেই। অবস্থাভেদে হয়তো দুঃখ, কষ্টের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে, তবে একেবারে নেই বোধকরি এমনটি বলা যায় না। 

আমরা যা কিছুই করি না কেন, তার পিছনে রয়েছে আশা বা অভাববোধ এবং এটি জীবনব্যাপী একটি প্রক্রিয়া। সব আশা বা অভাব একই সাথে পুরণ হয় না বা অপূর্ণও থেকে যায়। যেমন- কোনো কিছু অর্জন করার আশা করে তা অর্জন করতে না পারার ব্যর্থতা, বাবা-মাসহ আপনজনের অকাল মৃত্যুজনিত বেদনা বা শোক, হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে সেই ভালবাসার মানুষটিকে কাছে না পাওয়ার মনঃকষ্ট, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেও কর্মসংস্হান না হওয়ায় বেকারত্বজনিত হতাশা, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট, মেয়েদের প্রতি বখাটেদের উৎপাত, মা-বাবার সামান্য বকুনি, নারী নির্যাতন, যৌতুক, ধর্ষণ ও ব্লাকমেইল কিংবা অভিমানে আত্নহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। আত্নহত্যার এ প্রবণতা একদিকে যেমন আমাদের সামাজিক সমস্যাকে প্রকট করে তুলছে, অন্যদিকে তেমনি উদ্বিগ্ন করে তুলছে পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রকে। 

২৪ জুলাই 'প্রতিদিনের সংবাদ' পত্রিকায় প্রকাশিত খবর- প্রথমে গণধর্ষণের শিকার এবং পরে ধর্ষণের সময় ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে অবিরত ব্ল্যাকমেইল করে যাওয়া ধর্ষকচক্রের যন্ত্রণায় অবশেষে আত্মহননের পথ বেছে  নেয় পিরোজপুরের কাউখালীর কাঠালিয়া স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুলছাত্রী সাদিয়া, কক্সবাজারের পেকুয়ায় ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যা, বরগুনার পাথরঘাটায় প্রেমিকাকে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেছেন মুন্না হোসাইন (২৬) নামে এক যুবক, গত ২২ জুলাই  কক্সবাজারের মহেশখালীতে কোরবানির মাংস নিয়ে কথা-কাটাকাটির জের ধরে স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে ৩ ছেলে-মেয়ে নিয়ে স্ত্রী মুরশেদা আক্তারের বিষপান। এতে মায়নুর নামে ১৪ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু এবং বাকিদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি, ১৬ জুলাই নওগাঁর নিয়ামতপুরে শরীরে আগুন দিয়ে মানসিক সমস্যাজনিত কারণে এক নারীর আত্নহত্যা, ১৭ জুলাই গুলশানে মালয়েশিয়ার একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রীর আত্নহত্যা, ২ জুলাই আড়াইহাজারে মা-বাবার সঙ্গে অভিমান করে রুমা আকতার নামে এক কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা, ১৬ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে প্রেমের বিয়েতে রাজি না হওয়ায় যতন চন্দ্র সিংহ ও সুমি বালা নামে দুই চাচাতো ভাই-বোন ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যা, ২০ জুন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে গলায় ফাঁস দিয়ে এক কলেজ ছাত্রী আত্মহত্যা, ২৬ জুন কুড়িগ্রামের উলিপুরে পুত্রের সাথে অভিমান করে বাবার আত্নহত্যা, ২৭ জুন পুঠিয়ায় মোবাইল ব্যবহার করতে না দেওয়ায় স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যা, ২৮ জুন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে স্বামীর ওপর অভিমান করে গৃহবধূর আত্মহত্যা শিরোনামে প্রকাশিত খবরগুলো থেকে আত্নহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির সাথে নারীদের আত্নহত্যার সংখ্যাটাও যে বেশি তা অনুমেয়।    

এছাড়া, গত ১২ জুন প্রতিদিনের সংবাদে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, করোনায় দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে মুরছালিন নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ায় ১ জুন মা তাকে গেম খেলতে নিষেধ ও ফোন কেড়ে নেওয়ায় ৪ জুন ওই শিক্ষার্থীর ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা, এর ৫ দিন আগে একই ধরনের ঘটনায় অভিমান করে অতিরিক্ত গ্যাসের ট্যাবলেট খেয়ে মারা যায় একই জেলার উল্লাপাড়ার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রাফি।

২৯ মে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে পড়াশোনা না করায় ফাতেমা আক্তার নামে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে মা-বাবা বকাঝকা দিলে অভিমান করে ওই দিনই ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা, ৩১ মে স্মার্টফোন নিয়ে মা-বোনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে হতাশায় ভুগে নোবিপ্রবির ফারহানুজ্জামান রাকিনের ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা, ৭ জুন রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠায় মা বকাঝকা দেওয়ায় পুষ্প আক্তার মনি নামে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর আত্নহত্যার মতো ঘটনাগুলো সমাজের জন্য অশনিসংকেত।দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ১৫ মাসে অন্তত ১৫১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ৭৩ জন স্কুল শিক্ষার্থী, ৪২ জন বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী, ২৭ জন কলেজ শিক্ষার্থী ও ২৯ জন মাদরাসার শিক্ষার্থী রয়েছে। যাদের বেশির ভাগের বয়স ১২ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। গত বছরের ১৮ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর থেকে গত ৪ জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত তথ্য উঠে এসেছে।

গত ১৩ মার্চ অনলাইনে আয়োজিত এক ওয়েবনিয়ারে তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশেনের জরিপ টিমের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩টি জাতীয় পত্রিকা, ১৯টি স্থানীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরিকৃত প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময়ে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন।

আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে সারাদেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। 

দেশে ১৪ হাজার ৪৩৬টি আত্নহত্যার ঘটনার মধ্যে নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৮ হাজার ২২৮টি এবং পুরুষের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ২০৮টি, যা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। 

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মতে, আত্মহত্যা করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। ব্যক্তিবিশেষে ক্ষেত্রগুলো ভিন্ন হয়ে থাকে। নিজের স্বার্থে আঘাত লাগা, চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির ব্যবধান, অসহায়ত্ব, কর্মহীনতা, নৈতিক মূল্যবোধ একেবারে ফুরিয়ে যাওয়া, অর্থসংকট ও চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারাসহ বেশ কয়েকটি কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে করোনায় ঘরবন্দি সময়ে মানসিক অস্থিরতা এর জন্য অন্যতম দায়ী। 

একটি সম্ভাবনাময় জীবনের অকাল মৃত্যু মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্নীয়-স্বজনদের জন্য যে কতটা বেদনাদায়ক তা গতকাল ২৪ জুলাই প্রতিদিনের সংবাদে প্রকাশিত 'মাদারীপুরের কালকিনিতে কুকুরের কামড়ে বড় ছেলে নয়ন পালের মৃত্যু, সইতে না পেরে মা মেঘনা পালের বিষপানে আত্মহত্যা'র খবরটি থেকে বুঝা যায়। 

ইসলামে আত্মহত্যা করা শুধু মহাপাপই নয়, একটি অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। আত্মহত্যা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ঘোষিত হয়েছে, ‘তোমরা নিজের হাতে নিজেদের জীবনকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
আত্মহত্যার পরিণাম সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের এক ব্যক্তি আহত হয়ে সে ব্যথা সহ্য করতে পারেনি। সে একটি ছুরি দিয়ে নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলে। এরপর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। এ ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা নিজেকে হত্যা করার ব্যাপারে বড় তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (বুখারি ও মুসলিম) অর্থাৎ আত্মহত্যার প্রতিফল চিরস্থায়ী জাহান্নাম। 

সুতরাং আত্নহত্যার মতো ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যধি থেকে আমাদের উত্তরণ পেতে হলে- পরিবারে বাড়াতে হবে ধর্মীয় ও নৈতিকতার চর্চা, মাকে খেয়াল রাখতে হবে সন্তান বাসা থেকে বের হয়,  কখন ফিরে, রুমে কি করে। এছাড়া বাবা-মার খোঁজ রাখতে হবে ছেলে-মেয়েরা কোথায় যায়, কি করে, কার সাথে মিশে বা তার বন্ধু-বান্ধবরা কেমন প্রকৃতির। শাসনের পাশাপাশি সন্তানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে বন্ধুত্বের মতো। করোনায় চাকুরির বয়স ও শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের এমন দুশ্চিন্তা দূর করতে তাদের চাকুরির বয়স বৃদ্ধির বিষয়টিও সরকারিভাবে বিবেচনায় আনতে হবে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, অভাব বা অ-প্রাপ্তি থাকবে, এটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। সেই অভাব পুরণ করতে আমাদের ঘুমিয়ে নয়, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতে হবে। আকস্মিক দুর্যোগ বা বিপদে ভেঙে না পড়ে সমস্ত প্রতিকূলতা মোকাবেলায় ধৈর্য ধরতে হবে দৃঢ়চিত্তে। এগুলোকে জয় করার জন্য চালাতে হবে দৃঢ় প্রচেষ্টা। দুঃখ, কষ্ট, বিপদ দেখে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্ধকারই কেবল মানুষের জীবনে অনিবার্য সত্য নয়, আঁধারের মাঝেই আবার উদিত হবে স্নিগ্ধ চাঁদ। দূরীভূত হবে জীবনের সকল অন্ধকার। সর্বোপরি মহান স্রষ্টার প্রতি রাখতে হবে আমাদের অগাধ বিশ্বাস। তবেই কমবে আত্মহত্যার প্রবণতা। শান্তিময় হয়ে উঠবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। সেই প্রত্যাশা সবার। 

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আত্মহত্যা,স্বপ্ন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close