মাছুম বিল্লাহ
মাধ্যমিকে পদসোপান একটি মহতী উদ্যোগ

১৭ কোটি মানুষের দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বহু বছর যাবত ছিল ৩১৭টি। এ নিয়ে কারো যেন কোনো চিন্তা ছিল না। অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারি খাতেই চলতে থাকবে। তবে বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনগুলো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন বহু দিন ধরে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে; যার জন্য দেশে ৬৫ হাজার ৬৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরোপুরি সরকারি। তবে মাধ্যমিকে উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ করে যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না, সেসব উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি করায় এখন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালযের সংখ্যা ৬৮৩টি। অর্থাৎ এখনো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষার তিন শতাংশের কাছাকাছি সরকারি বিদ্যালয় বাকি ৯৭ শতাংশ বেসরকারিভাবেই চলছে। তবে মাধ্যমিকের একটি বিরাট অংশ এমপিও নামক রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। তার পরও শিক্ষকতা চাকরিতে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পদসোপান একেবারেই আকর্ষণীয় নয়, যার ফলে অনেক মেধাবী এই পেশায় আসতে চান না, এলেও থাকতে চান না এবং থাকেন না। শিক্ষার এ দুটো স্তরেই বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন, তা না হলে শিক্ষকতাকে একটি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করা যাবে না। এই অবস্থার মধ্যে সরকারি মাধ্যমিকে একটি আনন্দের সংবাদ গত বছরের (২০২০) শেষের দিকে বইতে শুরু করেছে, শিগগিরই এর বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।
খুশির সংবাদটি হচ্ছে- সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ বা সিনিয়র টিচার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে মোট পদের অর্ধেক শিক্ষক এ পদে পদোন্নতি পাবেন। এটি প্রথম শ্রেণির পদ। এই পদে কর্মরত শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের নবম গ্রেডে (২২ হাজার টাকা মূল বেতন) পাবেন। প্রথমবারের মতো এই পদ সৃষ্টি করে তাতে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। এই পদে সারা দেশের ৫ হাজার ৪০৬ জন শিক্ষক এবার পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন। বর্তমানে যে বিষয়টি প্রচলিত আছে তা হচ্ছে জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এন্ট্রি পদে চাকরিতে ঢুকে শিক্ষকরা ক্রমান্বয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পান। এর মাঝখানে কোনো পদ ছিল না, পদোন্নতির সুযোগ খুবই সীমিত। মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ শিক্ষক পদোন্নতির সুযোগ পান। বাকি ৯৫-৯৬ শতাংশ শিক্ষক যে পদে (সহকারী শিক্ষক) চাকরি শুরু করেন, সেই পদেই ৩০-৩৫ বছর চাকরি করে অবসরে যান। এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তাই সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের বহু দিনের দাবি এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড ধরে যৌক্তিক পদসোপনা তৈরির মাধ্যমে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি করা হলে ৩০-৩৫ বছরে একই পদে থাকার বঞ্চনার অবসান হবে।
৬৮৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ১০ হাজার ৮১২টি। এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে জেষ্ঠ শিক্ষকের কোনো পদ নেই। এর বাইরে ৬৮৩টি প্রধান শিক্ষক ও ৬৮৩টি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে। যদিও এসব পদের বিপুলসংখ্যক বর্তমানে শূন্য রয়েছে। ২০১২ সাল থেকে টানা সাত বছর শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ ছিল। এতে শূন্যতা তৈরি হয়। ২০১২ সাল থেকে কারিকুলাম ও সিলেবাস পরিবর্তনের কারণে গত আট বছরে চারটি নতুন বিষয় বিদ্যালয়গুলোতে চালু রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- তথ্যপ্রযুক্তি ( আইসিটি), শারীরিক শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা, চারু ও কারুকলা। এসব বিষয়েরও কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নেই। এক বিষয়ের শিক্ষক পড়াচ্ছেন অন্য বিষয়। তথ্যপ্রযুক্তির মতো মৌলিক বিষয়ও পড়ানো হচ্ছে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে। সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের মাঝে নতুন করে জেষ্ঠ্য শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা হলো, এটিকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। এ পদ পূরণ করা হবে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে, চাকরিতে এন্ট্রি লেভেল দিয়ে নয়। চাকরির আট বছর পূর্ণ হলে সহকারী শিক্ষকরা এ পদে পদোন্নতির যোগ্য হবেন। তবে এ পদে পদোন্নতি পেতে শিক্ষকদের তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, সহকারী শিক্ষক পদে আট বছরের সন্তোষজনক চাকরিকাল হতে হবে। দ্বিতীয়ত, যোগদান থেকে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন করতে হবে এবং তৃতীয়ত শিক্ষাজীবনে একাধিক তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না। ২০১২ সালের ১৫ মে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা ঘোষণা করা হয়। আর এবার প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদায় ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ পদও চালু হলো। এটি মূলত ক্যাডার সার্ভিসের অধীনস্ত করা দরকার যদি শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থেই আমরা গুরুত্ব প্রদান করতে চাই।
জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পদের জন্য সহকারী শিক্ষকদের খসড়া গ্রেডেশন লিস্ট ১ ডিসেম্বর (২০২০) মাউসির ওয়েবসাইটে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে শিক্ষকদের কোনো আপত্তি থাকলে বা তথ্যগত কোনো ভুল থাকলে সাত দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়। ৭ ডিসেম্বর এ সময় শেষ হয়েছে। বহু শিক্ষক এই খসড়া গ্রেডেশন লিস্ট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন মাউশিতে। ৬ ডিসেম্বর বিপুলসংখ্যক শিক্ষক মাউশির ডিজি বরাবর আপত্তি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, নিয়োগবিধির শর্ত অনুসারে পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য তারা ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ সালে মৌখিকভাবে নিজ নিজ প্রধান শিক্ষকের কাছে এবং ২০১৫ সালের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লিখিতভাবে মাউশিতে আবেদন করেন এবং জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় বরাবরও প্রাথমিক আবেদন করেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক শ্রেণি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে তাদের অনুমতি দেননি। এখানে প্রধান শিক্ষককেও দোষ দেওয়া যাবে না, কারণ কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ১০ জন, কোথাও ১৫ জন পর্যন্ত নতুন শিক্ষক যোগদান করেছেন। তাদের সবাইকে একসঙ্গে বিএড করার অনুমতি দিলে বিদ্যালয়ের ক্লাস কীভাবে চলবে? এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। এখানে দুটো কাজ করা যেতে পারে। চাকরিতে ঢোকার আগে বিএড করা প্রার্থীদের সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া ভালো। তা না হলে একদল ‘ভিজিটিং শিক্ষক’ রাখতে হবে; যারা সরকারি কিন্তু প্রয়োজনের সময় জেলাভিত্তিক যেকোনো বিদ্যালয়ে গিয়ে কয়েক মাসের জন্য কিংবা এক বছরের জন্য বদলি ক্লাস করাবেন। যেসব শিক্ষক প্রশিক্ষণে যাবেন, তাদের ক্লাস করাবেন। বর্তমানে একটি ভালো নিয়ম প্রচলিত আছে যে, মাউশি থেকেই লিস্ট আসে কারা বিএড করতে যাবেন। তার পরও ‘ভিজিটিং শিক্ষক’ পদটি তৈরি করা উচিত। ১৯৯১ ও এর পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ২০১৮-এর নিয়োগবিধি অনুযায়ী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে; যা তাদের নিয়োগবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিএড বিষয়ক আদালতে মামলার রায় অনুযায়ী ৯ জন পিটিশনারের জন্য প্রয়োগ না করে সব শিক্ষকের জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে; যা সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানসহ ২০১১ ব্যাচের নিয়োগপ্রাপ্ত সব শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নন-ক্যাডার বিধিমিাল ২০১১ প্রয়োগ করা হয়নি। এ ছাড়া বিএডের ফলাফল প্রকাশের তারিখ না ধরে পাঁচ বছরে যারা বিএডে ভর্তি হয়েছেন, তাদেরই তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পাঁচ বছরে যারা বিএড করেননি- এমন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাকেও তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে গ্রেডেশন তালিকা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা ও নির্দেশনা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকের পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদায় কার্যকর হয়। তবে শিক্ষকরা এখনো দশম গ্রেডেই আছেন। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- এত বিলম্বে কেন? যেকোনো স্তরের শিক্ষকই হোক না কেন; তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন তো করতে হবে। তা না হলে আমরা কীভাবে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ব? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পার হয়েই তো ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সামনে এগোতে হবে। এরই মধ্যে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী ইনস্ট্রাক্টর, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন বিভাগের দশম গ্রেডের পদকে নবম গ্রেড তথা প্রথম শ্রেণির পদে উন্নীতকরণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। অন্যদিকে নার্স, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, খাদ্য পরিদর্শক, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্লক সুপারভাইজার (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা) পদগুলো নিম্ন গ্রেড (১৩, ১২, ১১) থেকে দশম গ্রেডে তথা দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক ও অডিটর পদ দশম গ্রেডে উন্নীতকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। সাংবিধানিক অধিকার প্রশ্নে সমগ্রেডের এবং পরস্পর বদলিযোগ্য পদের একটি অপডেট হলে বাকি পদগুলো আপডেট হওয়ার দাবিদার। তিনটি বিসিএসের (৩৪, ৩৫, ৩৬)-এর মাধ্যমে বহু মেধাবী তরুণ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিএসসির মাধ্যমে আরো দুই হাজার শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। এসব মেধাবী শিক্ষকের মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নের পথ আরো ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরের পদোন্নতি খুবই সীমিত ও ধীরগতি হওয়ায় এবং পদটি প্রথম শ্রেণির না হওয়ায় মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ পোষণ করছেন না এবং তরুণ মেধাবী শিক্ষকরা শিক্ষকতা পেশায় এলেও পরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তাভাবনাসহ বাস্তবায়নের সিংহ দরোজা খুলে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষকতা আমাদের দেশে একটি একক বৃহত্তম নিয়োগ বাজার। আর মাধ্যমিক শিক্ষার যেহেতু ৯৭ শতাংশই বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত হয় তার মানে হচ্ছে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাধ্যমিক শিক্ষার দায়িত্ব বেসরকারি পর্যায়ে। এটিও খুব একটা সুখকর বিষয় নয়। তাই অত্যন্ত সিনিয়র শিক্ষক পদ সৃজন বেসরকারি শিক্ষকদের বেলায় করাটা বাঞ্ছনীয়। আট বছর চাকরি করার পর সরকারি শিক্ষকরা সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি রাখা প্রয়োজন। তাদের হয়তো বাকি একটি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে এবং বাকি তিনটি শর্ত ঠিক রেখে। এটি করা না হলে শিক্ষায় বৈষম্য বাড়তেই থাকবে; যা দেশের কোনো সচেতন নাগরিকের কাম্য হতে পারে না।
লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
পিডিএসও/ জিজাক








































