গাজী মোঃ শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

  ১ ঘণ্টা আগে

উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত চরাঞ্চল, সেতুর অভাবে যুগ যুগ ধুঁকছে লাখো মানুষ

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। কেবল তিনটি সেতুর অভাবে চরগিরিশ ও মনসুরনগরসহ চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে আজও চরমভাবে বঞ্চিত। বছরের পর বছর ধরে কেবল আশ্বাসের বাণী শুনলেও বাস্তবে ভেটুয়া নৌকাঘাট, রাজনাথপুর গ্রামের পশ্চিম পাশ (জোড়া ব্রিজ) এবং মনসুরনগর ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব পাশে সেতু নির্মাণ না হওয়ায় চরম অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে এই জনপদ।

যোগাযোগের মান্ধাতার আমল ও জনদুর্ভোগ

কাজিপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে যমুনা নদীবেষ্টিত চরগিরিশ ও মনসুরনগর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো মান্ধাতার আমলের। শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালুচরে মাইলের পর মাইল পায়ে হাঁটা পথ কিংবা ঘোড়ার গাড়িই তাদের একমাত্র ভরসা। আর বর্ষাকালে পুরো এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়লে নৌকার ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই বেহাল দশার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা।

থমকে আছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা আধুনিকায়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোট পেরিয়ে গেলে কেউ আর খোঁজ নেন না। যাতায়াত সংকটের কারণে বর্ষায় প্রায় ছয় মাস এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মাঝপথেই ঝরে পড়ে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় অনেক শিক্ষক ও চিকিৎসক এখানে দায়িত্ব পালন করতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের উপজেলা সদর হাসপাতালে নিতে গিয়ে পথেই বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। পাশাপাশি কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিবহন খরচের শিকার হয়ে ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয়দের আক্ষেপ ও ক্ষোভ

চরাঞ্চলের কলেজ শিক্ষার্থী মিতু ও রাব্বী সেখ জানায়, “আমরা চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়ালেখা করাতে চাইলেও যোগাযোগ সংকটের কারণে তাদের আশা পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”

চরগিরিশ ইউনিয়নের কৃষক মফিজ উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “হাড়ভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসল যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে ঠিকমতো হাটবাজারে নিতে পারি না। ঘোড়ার গাড়ি আর নৌকার ভাড়া দিতেই ফসলের লভ্যাংশ শেষ হয়ে যায়।” গৃহিণী হালিমা বেওয়া তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভোটের আগে মেলা মানুষ আইসে কতা দেয়—ভোট দিলে পুল বানাই দিবো। ভোটের পরে তারা পলায়।”

মনসুরনগর গ্রামের শিক্ষক মাহিদুল হাসান জানান, এই চরাঞ্চলের মানুষ একদিকে যমুনার ভাঙনে সর্বস্বান্ত, অন্যদিকে ভাঙাচোরা যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিকভাবে যুগ যুগ ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আশ্বাসের ভিড়ে দৃশ্যমান কাজের অপেক্ষা

জানতে চাইলে কাজিপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী এ কে এম হেদায়েত উল্লাহ জানান, ভেটুয়া নৌকাঘাট এবং রাজনাথপুর গ্রামের পশ্চিম পাশের (জোড়া ব্রিজ) দুটি সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজা চরাঞ্চলবাসীকে আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি সেতু নির্মাণ ও নদীভাঙন রোধের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) জমা দিয়েছেন। প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়ে সেতুগুলো নির্মিত হলে সীমান্তবর্তী এই ইউনিয়নগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে।

তবে যুগ যুগ ধরে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুনে আসা চরাঞ্চলের এই লাখো মানুষ এখন আর কোনো মৌখিক আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছেন না। চরাঞ্চলবাসীর ভাষায়—“পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকা মুখস্থ করলে স্বাস্থ্য ভালো হয় না, তা খেতে হয়।” তাই তারা এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তিনটি সেতুর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে চান।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়