reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২০ ঘণ্টা আগে

পোশাক খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বড় বিনিয়োগের হাওয়া  

সরকারে নীতি সহায়তায় বাড়ছে আস্থা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত এক বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারের সমীকরণ পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের এই সময়ে দেশের পোশাক শিল্পে যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। সরকারের দূরদর্শী ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালার ওপর ভরসা করে ব্যাংকঋণের নির্ভরতা এড়িয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এগিয়ে আসছেন নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা। একই সাথে দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট গ্রুপগুলোও বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান, যা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।

সরকারের পলিসিতে ফিরছে আস্থা, আসছে বড় তহবিল: খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেট এবং এর আগে-পরে যেসব সময়োপযোগী ও ইতিবাচক নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে, বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করতে বাজেটে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি, স্থানীয় সুতা (ইয়ার্ন) ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নগদ প্রণোদনা ১.৫ শতাংশ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে করছাড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে বিপুল আস্থা তৈরি হচ্ছে।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা অত্যন্ত স্পষ্ট। সম্প্রতি আমরা বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রতিফলনও দেখেছি, যা শিল্পমালিকদের মনে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।

বড় গ্রুপগুলোর মেগা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ছোঁয়া: আগে দেশের পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি মূলত প্রাথমিক গার্মেন্টস অ্যাসেম্বলির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমান বিনিয়োগের ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন জোর দেওয়া হচ্ছে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ, উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দামি অ্যাকসেসরিজ তৈরির ওপর। এই নতুন ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপগুলো।

এনভয় গ্রুপ: সুতা ও ম্যান-মেইড ফাইবারের (কৃত্রিম তন্তু) দুটি অত্যাধুনিক কারখানায় নতুন করে বিনিয়োগ করছে গ্রুপটি। দিনে প্রায় ৪০ টন উৎপাদন সক্ষমতার এই ইউনিট দুটিতে নতুন করে ৫০০ জনের কর্মসংস্থান হবে। এনভয় টেক্সটাইলের কোম্পানি সেক্রেটারি এম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চীন এখন বেসিক পোশাক থেকে বের হয়ে প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে যাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক পোশাকের দীর্ঘমেয়াদি বাজার ঘুরেফিরে বাংলাদেশের বুকেই আসবে।

হা-মীম গ্রুপ: নরসিংদীতে চীনা অংশীদারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছে 'হা-মীম চিং তাই পকেটিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ' নামক একটি বিশাল কারখানা। পুরোদমে চালু হলে এখানে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। জুনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্রুপটির চেয়ারম্যান এ কে আজাদ জানান, এই কারখানার ফলে পণ্য সরবরাহের সময় (লিড টাইম) অনেকটাই কমে আসবে এবং আমদানি বাবদ বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় হবে।

ডিবিএল গ্রুপ: বিশ্ববাজারের চাহিদা মাথায় রেখে অন্তর্বাস ও দামি অ্যাকসেসরিজ তৈরিতে নতুন মেগা বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে গ্রুপটি।

ব্যাংকঋণ এড়িয়ে স্বনির্ভরতার নতুন মডেল: চলতি বছরে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৭০টি নতুন ও আধুনিক কারখানা সফলভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে অথবা চালুর চূড়ান্ত অপেক্ষায় রয়েছে। এর মাধ্যমে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে প্রায় ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তারা উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ এড়িয়ে নিজস্ব মূলধনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

১২ বছর এই শিল্পে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে মাঝারি পরিসরে কারখানা চালু করেছেন স্টাইলোমোর লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াহিয়া খান। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা অত্যন্ত ইতিবাচক মনস্তত্ত্ব নিয়ে এই ব্যবসায় এসেছি। ছোট করে শুরু করলেও কোনো ব্যাংকঋণ নিইনি। ইতিমধ্যেই আমরা ভালো ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছি এবং আমরা সফল হবই।

একইভাবে নিজস্ব সঞ্চয় ও পারিবারিক অর্থায়নে ৯৫০ জন কর্মী নিয়ে 'ফ্যাশন ফ্লোর বিডি লিমিটেড' চালু করেছেন জসিম উদ্দিন। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের বোঝা মাথায় না নিয়ে নিজস্ব শক্তিতে টিকে থাকার এই মডেলকে পোশাক খাতের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME): বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, গত ছয় মাসে ৪৪টি নতুন কারখানা সফলভাবে উৎপাদনে এসেছে, যার বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের। এছাড়া নিটওয়্যার (বিকেএমইএ) ও টেক্সটাইল (বিটিএমএ) খাতেও নতুন উদ্যোক্তারা আসছেন নতুন আশা নিয়ে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের আগমন একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও ইতিবাচক প্রক্রিয়া। সরকারের নগদ প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং বিশেষ তহবিলের সুপ্রভাবে আগামী দিনগুলোতে নতুন কারখানা চালুর এই গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

সবমিলিয়ে, সরকারের সময়োচিত নীতি সহায়তা এবং উদ্যোক্তাদের সাহসী পদক্ষেপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখন শুধু একটি রপ্তানি খাতই নয়, বরং স্বনির্ভর ও উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন এক আধুনিক শিল্পে রূপান্তরিত হওয়ার গৌরবময় অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়