একটি বানান ভুলই বাঁচিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা

সেদিন হ্যাকররা প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮০০০ কোটি টাকার মত হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এমনটাই বের হয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর সমন্বিত অনুসন্ধানে।
হ্যাকারদের প্ল্যান অনুযায়ী অ্যামেরিকান ফেডেরাল রিজার্ভ এ থাকা বাংলাদেশের অ্যাকাউন্ট থেকে ৮০০ কোটি টাকা বা ১০০ মিলিয়ন ডলার সরানোর পর আর বাকি টাকা সরাতে পারেনি তারা। মূলত একটি বানান ভুলের কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক বিশাল অংকের প্রায় '১ বিলিয়ন' ডলার চুরির হাত থেকে এ যাত্রা রক্ষা পায়।
হ্যাকাররা অনলাইন চেকে 'ফাউন্ডেশান' বানানটি ভুল করেছিল। গতকাল রয়টার্সে এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়।
ফাউন্ডেশান বানানে হ্যাকাররা লিখেছিল Fandation, এই সাধারণ বানান ভুল দেখেই তখন ব্যাংকে প্রথমবারের মত সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এই লেনদেনটি হচ্ছিলো ডয়চে ব্যাংক এর মাধ্যমে।
এতে প্রথম চারটি ট্রানজেকশানে ৮১ মিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়ে যাওয়ার পর, ৫ম রিকুয়েস্টে শ্রীলংকার একটি নন-প্রোফিট ফাউন্ডেশানে ২০ মিলিয়ন প্রসেস করার সময়ই তারা লক্ষ্য করেন যে সেখানে ঐ ফাউন্ডেশান বানানটি ভুল।
তাই তখনি তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে এটা জানায় এবং পরবর্তী লেনদেন স্থগিত করে দেয়। এদিকে, হঠাত এত রিকুয়েস্ট আসছে দেখে অ্যামেরিকান ফেডেরাল রিজার্ভও নোটিস পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকে। তারা প্রায় ৩০টি বড় অংকের রিকুয়েস্ট পান ফিলিপাইন এবং শ্রীলংকায় বাংলাদেশের রিজার্ভের টাকা পাঠানোর জন্য।
এই অ্যাডভাইজ বা রিকুয়েস্টগুলো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ ট্রান্সফার করাতেও ফেডেরাল রিজার্ভ ব্যাংকের সন্দেহ হয়। সাধারণত কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায় যে, তাদের পক্ষ থেকে অর্থ স্থানান্তরের জন্য কোনো অ্যাডভাইজ পাঠানো হয়নি।
এর অনেক পরে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, তাদের ইউএস ফেডেরাল রিজার্ভের অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছে এবং সেখান থেকেই টাকা চুরি হয়েছে। যার কিছু অংশ শনাক্ত করে উদ্ধারও করা গেছে।
এই ঘটনায় কারা জড়িত, বা কে দায়ী, এমন প্রশ্নে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত অ্যামেরিকার ফেডেরাল ব্যাংককে দায়ী করে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। এতে তিনি তাদের গাফিলতি আছে বলে মনে করছেন।
তবে নিউ ইয়র্ক ফেডেরাল রিজার্ভ-এর পক্ষ থেকে তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দেয়া হয়। তাদের সব লেনদেনই স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানায় তারা। তারা এও বলেছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংকের কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে কিনা– তাও প্রকাশ করছে না বাংলাদেশ। বরং বাংলাদেশেই সুইফট কোড জালিয়াতি হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয় তারা।
ফেডেরাল রিজার্ভ অ্যামেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে অন্য প্রায় সকল দেশেরই বিদেশি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। নিউ ইয়র্ক ফেডেরাল রিজার্ভে প্রায় ২৫০টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যাকে এক অর্থে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলও বলা যায়।
উল্লেখ্য, ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়ারার প্রথম গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার চুরির হয়েছে বলে একটি খবর প্রকাশ করে। এরপর গতপরশু, বাংলাদেশ থেকে পরবর্তীতে আবার চুরি হওয়া ৮৭০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেন আটকে দেয়ার রিপোর্টও প্রকাশ করে তারা।
এই হ্যাকিং-র ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক অনলাইন এক্সপার্ট এবং সাইবার নিরপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক করেছে বুধবার। জানা গেছে, প্রথমে হ্যাকড হওয়া ঐ ১০০ মিলিয়ন ডলারের মাঝে ১৯ মিলিয়ন ডলার এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোর জুয়ার আসরে খরচ হয়ে যাওয়ায় বাকি অর্থ উদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
বৈঠকে উপস্থিত আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের ডাইরেক্টর অপারেশন তথ্য প্রযুক্তিবিদতানভীর হাসান জোহা ডয়চে ভেলেকে জানান, 'ম্যালওয়্যার' ভাইরাস ইনফেকশনের মাধ্যমে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের আইডি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। পরে ফেডেরাল রিজার্ভ ব্যাংকে অ্যাডভাইজ পাঠায় তারা।
তিনি জানান, ''বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমেই হ্যাকার ঢুকেছে, ফেডেরাল রিজার্ভ ব্যাংকে নয়।''
বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হ্যাকড হয়েছে ব্যাংকের 'সুইফট কোড' এবং 'সিস্টেম' ব্যবহার করেই। হ্যাকাররা যেভাবেই হোক বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে ঢুকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডেরাল রিজার্ভ সিস্টেমে পেমেন্ট অ্যাডভাইজ পাঠায়। বলা বাহুল্য, এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষিত আছে। টাকার অংকে যা প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার উপরে।









































