মোসা. মিশকাতুল ইসলাম মুমু

  ১৯ এপ্রিল, ২০২৫

দৃষ্টিপাত

বিচারহীনতার সংস্কৃতি : আমাদের করণীয় কী

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় বিচারহীনতা একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের নাম। এটি শুধু আইন বা বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার ফল নয়, বরং একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিচারহীনতা মানে অপরাধ করে শাস্তি না পাওয়া, অপরাধীর রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ে মুক্তি পেয়ে যাওয়া, অথবা দীর্ঘসূত্রতায় বিচার প্রক্রিয়া এমনভাবে ধীরে এগোনো যে সেটি কার্যত একটি বিচারহীন অবস্থায় পরিণত হয়। এই সংস্কৃতি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা সমাজে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে দেয়।

বাংলাদেশে বিচারহীনতা বিভিন্ন রূপে দেখা যায়। রাজনীতিক হত্যাকাণ্ড, সাংবাদিক নিপীড়ন, গুমণ্ডখুন, ধর্ষণ, পুলিশি হয়রানি, ভূমি দখল বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম- এসব ঘটনার পেছনে বহু সময়ই অপরাধীরা ধরা পড়ে না, বা ধরা পড়লেও তারা প্রভাব খাটিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়, বা তা বিলম্বিত করে। বিচারহীনতার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচারহীনতা। অতীতের বিভিন্ন ঘটনা যেমন পিলখানা হত্যাকাণ্ড ২০০৯, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা ২০১৯, এছাড়া সাগর-রুনি হত্যা মামলা ২০১২, তনু হত্যা মামলা ২০১৬ এখনো অনেকাংশে রাজনৈতিক বিতর্কে আবদ্ধ। অপরদিকে, ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিচারহীনতা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, অনেক ভুক্তভোগী বিচার চাওয়ার আগেই নিরুৎসাহিত হন।

বিচারহীনতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যেগুলো একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর অন্যতম হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, যা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় মামলার তদন্তে বাধা প্রদান করেন, সাক্ষীদের হুমকি দেন কিংবা বিচারকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করেন। পাশাপাশি আমাদের দেশের তদন্ত সংস্থাগুলোর দক্ষতার অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও অপরাধ প্রমাণে ব্যর্থ হয়, যার ফলে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয় বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা- বছরের পর বছর ধরে মামলা ঝুলে থাকা, বারবার শুনানি পিছিয়ে যাওয়া কিংবা মামলার তারিখ পরিবর্তনের ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষ নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। দুর্নীতি বিচার ব্যবস্থাকে আরো দুর্বল করে তোলে; বিচারক থেকে শুরু করে পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে অনিয়ম ও স্বার্থপরতা বিচারহীনতাকে আরো পাকাপোক্ত করে। এসব কারণে বিচারহীনতার একটি বিস্তৃত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

বিচারহীনতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হলো অপরাধের পুনরাবৃত্তি এবং সমাজে অপরাধের প্রতি একধরনের সহনশীলতা গড়ে ওঠা। যখন একজন অপরাধী দেখে যে, তার কোনো শাস্তি হচ্ছে না বা রাষ্ট্র তাকে কোনোভাবে ছাড় দিয়ে দিচ্ছে, তখন সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং পুনরায় অপরাধ করার সাহস পায়। শুধু তাই নয়, অন্যরাও এতে উৎসাহিত হয়- কারণ তারা বুঝে নেয়, শাস্তির ভয় না থাকলে অপরাধ একটি ‘সম্ভাব্য পথ’ হয়ে উঠতে পারে। এতে সমাজে এক ধরনের অনৈতিকতার স্বীকৃতি জন্ম নেয়, যেখানে ন্যায়-অন্যায় বা সত্য-মিথ্যার বিভাজন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। বিচারহীনতা আইনের শাসনকে দুর্বল করে দেয় এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, কারণ এতে ন্যায়বিচারের বদলে প্রভাব, পরিচয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আর্থিক অবস্থানের প্রাধান্য সৃষ্টি হয়। ফলে সমাজে বিশ্বাস জন্মায়, ‘ক্ষমতার সঙ্গে থাকলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা যায়।’ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ প্রজন্ম। তারা যখন দেখে অন্যায় করে পার পাওয়া যাচ্ছে, তখন তাদের চোখে আইনের মর্যাদা কমে যায়। সৎ ও নৈতিক পথ অনুসরণ করার পরিবর্তে তারা চতুরতা হিসেবে ‘সিস্টেমকে বাইপাস’ করাকে গ্রহণযোগ্য মনে করে। এতে তারা হতাশ, ক্ষুব্ধ ও সংশয়গ্রস্ত হয়ে ওঠে- যা একসময় সামাজিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়।

ভয়াবহ এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত ও বহুমুখী উদ্যোগ, যা শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে নয়- সমাজের প্রতিটি স্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণেই সম্ভব। প্রথমত, বিচারব্যবস্থাকে করতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়া বিচারকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এজন্য বিচারকদের নিরাপত্তা, দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে; তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘসূত্রিতা বিচারপ্রক্রিয়ার একটি বড় শত্রু, তাই বিশেষ করে ধর্ষণ, গুম, খুন ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ আদালত বা ফাস্ট ট্র্যাক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, তাদের নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি সাহসী ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সময়োপযোগী ও আধুনিক আইনের প্রয়োজন রয়েছে, তাই পুরোনো আইনগুলো সংস্কার করে প্রযুক্তিনির্ভর, মানবাধিকারবান্ধব ও কার্যকর আইন প্রণয়ন এবং কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে। বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং অনুসন্ধানী ভূমিকা অপরিহার্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ একত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এই সংস্কৃতি সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা দেয় যে, আইন সবার জন্য সমান নয় এবং অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়। এর ফলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নাগরিক মর্যাদা সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগোলেও যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে এই উন্নয়ন টেকসই হবে না। তাই এখনই সময়- বিচারহীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে একসাথে কাজ করার। আমাদের করণীয় একটাই- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস লড়াই চালিয়ে যাওয়া যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে বেঁচে থাকতে পারে, যেখানে অপরাধী নয়, আইনের জয় হয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়