ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন ও সতর্কতা দুটোই প্রয়োজন

ডেঙ্গু আমাদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ক্রমেই এটি এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। এ রোগের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বড় আকার ধারণ করে জনমনে শঙ্কা তৈরি করেছে। গত সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩৯ ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে। ডেঙ্গু ছাড়াও চিকুনগুনিয়া ও করোনারও খবর মিলছে। বড় শঙ্কা হলো ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও করোনা-এ তিন রোগের বিস্তার ঘটতে থাকলে স্বাস্থ্য খাত পড়বে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে।
বলা সংগত, ২০২০ সালে শুরু হওয়া করোনার ভয়াবহতা এখনো আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে। সব মিলিয়ে আমাদের এখন সতর্ক হওয়ার সময়, যাতে ডেঙ্গু ছাড়াও চিকুনগুনিয়া ও করোনার বিস্তার না ঘটতে পারে। ডেঙ্গুর বাহন হলো এডিস মশা। এ মশার জীবনচক্রে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এডিস শুধু পরিষ্কার পানিতেই নয়, দূষিত পানিতেও বেঁচে থাকতে সক্ষম। রাতেও সংক্রমণ ঘটায় বলে জানা গেছে। এডিস মশার প্রজনন ঠেকানোর কাজটি কঠিন। এ মশা নির্মূলের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আমাদের সচেতন থাকতে হবে যেন ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি না হয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে এডিস মশার প্রজনন ঠেকাতে এবং এ মশা নির্মূলে সর্বাত্মক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গগুলোর সঙ্গে আমরা পরিচিত হলেও এ রোগের নতুন উপসর্গগুলো এখনো অনেকের অজানা। কাজেই জ্বর শুরু হওয়ামাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সমাজের প্রত্যেক নাগরিকই সচেতন না হলে এ রোগের কবল থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না। শুধু রাসায়নিক কীটনাশক দিয়ে এডিস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিনা, প্রশ্ন উঠছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রজাতির মশা প্রতিকূল জলবায়ুর সঙ্গে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করেছে। কাজেই এডিসের উৎপাত থাকবে বছরজুড়েই। ডেঙ্গু থেকে মুক্ত থাকতে হলে বছরব্যাপী মশক নিধনের কর্মসূচির সঙ্গে জনসাধারণকেও সদাসতর্ক থাকতে হবে অবশ্যই। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে হারে বেড়ে চলেছে, তা আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে একাধিক পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন।
বলা বাহুল্য, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টায় সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। এ সমস্যার কার্যকর সমাধানে জনগণের সক্রিয় ও সচেতন অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ পরিবার, পাড়া-মহল্লা এবং কর্মস্থলে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসে উদ্যোগী হতে হবে। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গুবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কীটতত্ত্ববিদ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করতে হবে। কারণ ডেঙ্গু কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়- এটি একটি জাতীয় সংকট, যার সমাধান একমাত্র সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব।
"





































