অধ্যাপক ড. এম ছিদ্দিকুর রহমান খান
মতামত
পলাশির ট্র্যাজেডি ও জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার

বাংলার ইতিহাসে ২৩ জুন একটি বেদনাবিধুর দিন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশির আম্রকাননে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাহ ও ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যকার এক যুদ্ধে নবাবের পরাজয় কেবল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথই বদলে দেয়নি, বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পলাশির মর্মন্তুদ ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা হারানোর সূচনা হয়। পলাশির পরাজয়ের ফলে ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনের যে দীর্ঘ ও অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার অভিঘাত দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই উপমহাদেশের মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বিকাশ এবং সামাজিক অগ্রগতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই ২৩ জুন কেবল একটি পরাজয়ের স্মারক দিন নয়; এটি জাতীয় আত্মসমালোচনা, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং স্বাধীনতার মূল্য অনুধাবনের এক অনিবার্য দিন। বিভেদ, বিভক্তির বিষময় ফল এবং বিপরীতে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির গুরুত্ব অনুধাবনের দিন।
ইতিহাসের বিচারে পলাশি ছিল এক যুগসন্ধিক্ষণ। পলাশি পূর্ব বাংলা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্কৃতিতে বাংলা ছিল সমকালীন বিশ্বের বিস্ময়। ইউরোপীয় পর্যটক ও বণিকরা বাংলাকে ‘প্রাচ্যের স্বর্ণভাণ্ডার’ বা ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে অভিহিত করতেন। কিন্তু এই সমৃদ্ধির অন্তরালে নবাবী আমলের শেষ দিকে বাংলায় রাজনৈতিক দুর্বলতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভিজাত শ্রেণির স্বার্থান্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় সংহতির অভাব ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। ইংরেজরা পুরোমাত্রায় এর সুযোগ নেয়। নবাব বিরোধী ষড়যন্ত্রকারী এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে আঁতাত করে পলাশির প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলাহর পরাজয় নিশ্চিত করে। বস্তুত, পলাশির প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পেছনে ইংরেজদের সামরিক শক্তির চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি।
মীরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খান প্রমুখের ষড়যন্ত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে বিদেশি শক্তির হাতে সমর্পণ করেছিল। পলাশি আমাদের সামনে এক চিরন্তন সত্য উন্মোচন করে-কোনো জাতির পতন বাইরের আক্রমণে যতটা ঘটে, তার চেয়ে বেশি ঘটে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, স্বার্থান্ধতা ও নেতৃত্বের সংকটের কারণে। পলাশি ছিল ভারতবর্ষের পরাধীনতার দীর্ঘ যন্ত্রণার সূচনাকাহিনি। পলাশির পরাজয়ের মাধ্যমে বঙ্গ-ভারতে যে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়েছিল, তার ফল ছিল ভয়াবহ। বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। শিল্প ও বাণিজ্যের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে শোষণের নির্মম চক্র। রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতাও জাতির ওপর ভর করে। পলাশি নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক এক মর্মন্তুদ অধ্যায়। কিন্তু পলাশিকে শুধুমাত্র শোকগাথা হিসেবে দেখলেই হবে না। পলাশির ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, ইতিহাসের প্রতিটি ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা বহন করে। পলাশি আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে। আমরা বুঝতে পারি জাতীয় ঐক্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। অভ্যন্তরীণ বিভক্তি একটি জাতিকে কীভাবে বহিরাগত শক্তির পদানত করে পলাশি তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতীয় সংহতিকে রাষ্ট্রশক্তির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পলাশির ঘটনাও সেই সত্যকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্বায়নের যুগে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরো নতুন মাত্রা লাভ করেছে। কারণ বর্তমানের বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে উপনিবেশবাদের রূপ বদলেছে। এখন আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জাহাজ বোঝাই সৈন্য নিয়ে আসে না। আজকের বিশ্বে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করতে কামান-বন্দুকেরও প্রয়োজন হয় না। এখন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ, ‘সফট পাওয়ার’, ঋণ-ফাঁদ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, তথ্য-প্রযুক্তির আধিপত্য, তথ্য-যুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ, কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রকে দুর্বল ও পঙ্গু করা যায়।
এই বাস্তবতায় অভ্যন্তরীণ বিভক্তি যে কোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। যে রাষ্ট্রের জনগণ পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল নয়, যে রাষ্ট্রে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐকমত্য নেই, সেই রাষ্ট্র বহুমাত্রিক সংকট পড়ে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশের কথা বলা যায়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা ও সংঘাত, তথ্য বিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস জাতীয় শক্তিকে ক্ষয় করছে। জাতীয় সংহতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। অথচ বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সেই ঐক্যের শক্তিই ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল।
এদিক থেকে পলাশি ও মুক্তিযুদ্ধ-এই দুটি ঘটনা আমাদের সামনে ইতিহাসের একটি অভিন্ন শিক্ষা তুলে ধরে এবং তা হলো জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা প্রভাব ও স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদ বজায় এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রা সুরক্ষিত রাখতে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
স্মর্তব্য যে, জাতীয় ঐক্য মানে মতের একরূপতা নয়; বরং ভিন্নমত, বৈচিত্র্য ও বহুত্বের মধ্যেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে একত্রিত হওয়ার সক্ষমতা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পায়, তখন তা জাতির জন্য অমঙ্গল ডেকে আনে। একটি সুস্থ জাতির বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে মতের ভিন্নতা থাকলেও রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের প্রশ্নে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য বিদ্যমান থাকে। প্রকৃত জাতীয় ঐক্য হলো একটি ‘সর্বসম্মত জাতীয় এজেন্ডা’, যেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু মৌলিক বিষয়ে কোনো আপস থাকবে না। রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি সর্বজনীন জাতীয় ঐকমত্য বজায় থাকবে। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের চাপ ও প্রভাব দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করা যাবে।
পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশের জন্য জাতীয় ঐক্য শুধু একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এ সত্য আমাদের সকলকে বুঝতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এক্ষত্রে পলাশির ঘটনা আমাদের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা হতে পারে। এ ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি যে, বিভক্তি ও সংকীর্ণ স্বার্থ কত বড় জাতীয় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অস্ত্রের ভাণ্ডারে নয়, জাতীয় ঐক্যে নিহিত। ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা বিভেদ নয়, সংহতির পথ বেছে নিতে পারি; প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি; সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ নয়, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারি-তবেই পলাশির ট্র্যাজেডি আমাদের জন্য অর্থবহ হয়ে উঠবে। ব্যক্তিগত ও দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রসত্তাকে সবার আগে স্থান দেওয়ার প্রত্যয় হোক পলাশি দিবসের অঙ্গীকার। জাতীয় ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আর কোনো পলাশির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না এবং যেখানে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অটুট থাকবে।
লেখক : ভিসি, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
"





































