ফারহানা মুনমুন
মুক্তমত
বৃদ্ধাশ্রম : এক রঙিন মরীচিকা

পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হলো বাবা-মায়ের ভালোবাসা। দশ মাস দশ দিন গর্ভে সন্তানকে ধারণ করে নিজের শারীরিক ও মানসিক কষ্টকে উপেক্ষা করে মা সন্তানকে জন্ম দেন। জন্মের পর থেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে বাবা মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। নিজেদের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়ে বাবা-মা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত গঠনের চেষ্টা করেন। সমাজে প্রতিষ্ঠিত নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলেন। অথচ সেই সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলে বাবা-মাকে বোঝা মনে করে। যে বাবা-মায়ের হাত ধরে সন্তান হাটতে শিখে তাদেরকেই বৃদ্ধাশ্রম নামক রঙিন মরীচিকার মধ্যে রেখে আসে তাদের সন্তানরা। যেখানে বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যাবেনা ভিতরে অসংখ্য বাবা-মা নিরবে আর্তনাদ করছেন এবং অসহায়ত্ব আর একাকীত্ববোধে ভুগছেন।
একসময় বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ছিল যেখানে বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি, দাদা-দাদি এবং চাচা-চাচী একসঙ্গে সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন। পরিবারের বৃদ্ধরা সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাস করতেন। সময়ের পরিবর্তনে আজ তথাকথিত ভদ্র সমাজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় যৌথ পরিবার ভেঙে গড়েছেন একক পরিবার যেখানে স্বামী স্ত্রী ও তাদের সন্তান ব্যতীত অন্য সদস্য বোঝা। যাদের কাঁধে ভর করে সন্তান উপরে উঠল যাদের নিরলস পরিশ্রম আর প্রার্থনা তাকে সমাজের সম্মানিত স্থানে বসালো সেই সন্তান বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৬০ সালে ঢাকার আগারগাওয়ের শান্তিনিবাস নামে একটি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি ছাড়াও এনজিও এবং ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ৬৫০টির মতো বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যার সম্মুখীন হয়। বৃদ্ধাশ্রমে সর্বোচ্চ যত্ন ও সেবা দিলেও বৃদ্ধরা একাকীত্ব বোধ করেন, তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট তারা পরিবারের স্নেহ, ভালোবাসা ও আপনজনের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন। তাদের দিন কাটে দুঃখ হতাশা ও নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে। একাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গতার কারণে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং বিষণ্ণতায় ভোগেন। শেষ পর্যায়ে এসে তারা চান পরিবারের সঙ্গে হাসিখুশি থাকতে। তাছাড়া বৃদ্ধাশ্রমে সার্বক্ষণিক যত্ন, পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা সেবা অপ্রতুল। অধিকাংশ সময় বৃদ্ধাশ্রমে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সেবার অভাব দেখা যায়।
বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতা, নানা রোগ, দুর্বলতা এবং চলাচলের অক্ষমতা তাদের বৃদ্ধ জীবনকে কঠিন করে তোলে। অতীতের স্মৃতি মনে করে অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকায় তারা নিজেদের অবহেলিত মনে করে। অনেকে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিদের একবার দেখার জন্য হা হুতাশ করেন। পরিচিত পরিবেশ ও বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্ট তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের ভদ্র সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে দেখা করতেও যান না। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বাড়িতে রাখলেও কেউ তাদের দেখাশোনা করেন না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বৃদ্ধরা পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবারটুকুও পায় না। অনাদর আর অবহেলায় তাদের দিন কাটে।
সম্প্রতি দেশে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় বাবা-মায়েরা একাকিত্ব ও অবহেলায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অথচ তাদের মৃত্যুর সঠিক তারিখ এবং সময় কেউই জানেন না। কর্মব্যস্ত বর্তমান রঙিন সমাজে প্রতিদিন এরকম হাজারো ঘটে। পরিবার ও বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নানা সমস্যা সমাধানের জন্য পরিবার ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবারের যেসব বৃদ্ধ সদস্য রয়েছেন তাদের প্রতি সর্বদা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও যত্ন প্রদর্শন করতে হবে। বৃদ্ধদের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। তাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো, গল্প করা, তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামত নেওয়া উচিত কারণ তাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক মূল্যবান। ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে এতে তারা আনন্দিত হবেন।
এছাড়া সমাজের সচেতন মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বৃদ্ধদের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে পারে। সরকারকে বৃদ্ধ কল্যাণে কার্যকর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করতে পারে এবং সঠিকভাবে দেশের সকল বৃদ্ধাশ্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বৃদ্ধাশ্রমের সমস্যা দূর করা সম্ভব এবং বৃদ্ধদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সুখী জীবন উপহার দেওয়া সম্ভব। একজন সন্তান হিসেবে আমাদের সকলের উচিত বৃদ্ধ মা-বাবার সঠিক যত্ন নেওয়া। তাদের আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক সকল বিষয়ে দায়িত্বশীল হয়ে তাদের জীবনের শেষ সময়টুকু সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ করা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের উচিত বৃদ্ধ মা-বাবাকে তাদের পরিপূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে সমাজকে আরো সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ করে তোলা। শিশু অবস্থায় মা-বাবা আমাদের যেভাবে লালন-পালন করেছেন তাদের জীবনের শেষ সময়টা যেন আমরা তাদেরকে সেইভাবে যত্নে রাখতে পারি। তাই সবার উচিত পরিবারের সকল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরকে যথাযোগ্য সম্মান এবং মর্যাদা দেওয়া। সেইসাথে আমাদের আশপাশের সকলকে পরিবারের বৃদ্ধদের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলেই একটি সুন্দর ও সুশীল সমাজ গড়ে উঠবে যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই যথোপযুক্ত সম্মান পাবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ জীবন কাটাতে পারবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
munmunfarhana2@gmail
"






































