মো. রেজাউল করিম রনি

  ৮ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

দালালের ফাঁদে জনশক্তি খাত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো বৈদেশিক কর্মসংস্থান বা জনশক্তি রপ্তানি খাত। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে বিকশিত হওয়া এই খাত আজ দেশের অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের শ্রম, মেধা ও ত্যাগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। প্রতি বছর প্রবাসীদের পাঠানো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করে, অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং লাখো পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া অসংখ্য মানুষ প্রতারণা, হয়রানি, ঋণের বোঝা এবং অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি পর্যন্ত দালালদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। তারা নিজেদের কখনো এজেন্ট, কখনো প্রতিনিধি, কখনো আবার প্রবাসফেরত সফল ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে। বিদেশে উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাপন এবং দ্রুত ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে তারা মানুষকে আকৃষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন কৃষক বা দিনমজুর তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, এমনকি বসতভিটা বিক্রি করেও বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করেন। কিন্তু বিদেশে পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন যে তাকে যে কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।

জনশক্তি রপ্তানি খাতে দালালদের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো অভিবাসন ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া। সরকারিভাবে বিদেশে যাওয়ার জন্য যে খরচ নির্ধারিত থাকে, বাস্তবে একজন শ্রমিককে তার কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক সময় এই খরচ তিন লাখ থেকে বারো লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একজন দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। পরিবারের জমিজমা বিক্রি, এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার সবকিছু মিলিয়ে বিদেশ যাওয়ার আগেই একজন শ্রমিক ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। ফলে বিদেশে পৌঁছানোর পর তার প্রথম লক্ষ্য হয় ঋণ পরিশোধ করা, নিজের জীবনমান উন্নয়ন নয়।

দালাল চক্রের প্রতারণার কৌশল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তারা ভুয়া ভিসা, জাল নিয়োগপত্র, নকল মেডিকেল রিপোর্ট এবং অস্তিত্বহীন কোম্পানির চাকরির অফার ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। অনেক সময় শ্রমিকদের বলা হয় যে তারা কোনো নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, কিন্তু বিদেশে গিয়ে দেখা যায় বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আবার অনেককে ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে পাঠিয়ে পরে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর তারা অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হন এবং আইনগত জটিলতায় পড়ে যান।

বিদেশে গিয়ে এই শ্রমিকদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। প্রতিশ্রুত বেতনের পরিবর্তে অল্প বেতন, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ, বিশ্রামের সুযোগের অভাব এবং অমানবিক আবাসন ব্যবস্থা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের পাসপোর্ট আটকে রাখেন, যাতে তারা চাকরি পরিবর্তন বা দেশে ফিরতে না পারেন। ফলে তারা একপ্রকার আধুনিক দাসত্বের শিকার হন। যাদের বৈধ কাগজপত্র থাকে না, তারা আরো বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার, জরিমানা, কারাদণ্ড কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যাওয়া অনেক নারী বিভিন্ন ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। অনেক সময় তারা নিয়োগকর্তার বাড়িতে বন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করেন। নির্যাতনের শিকার হয়েও ভাষাগত সমস্যা, আইনগত জটিলতা এবং সহযোগিতার অভাবে তারা ন্যায়বিচার পান না। এমন অসংখ্য নারী দেশে ফিরে এসেছেন, যারা বিদেশে গিয়ে স্বপ্ন নয়, বরং দুঃস্বপ্নের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন।

এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয় এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অদক্ষ শ্রমিক বেশি সংখ্যায় বিদেশে যাওয়ার কারণে তারা উচ্চ বেতনের কাজ পান না। ফলে রেমিট্যান্সপ্রবাহও প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পায় না। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন। এর ফলে তারা শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন এবং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব, যদি সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করে। প্রথমত, জনশক্তি রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। বিদেশগামী শ্রমিক যেন অনলাইনে আবেদন, ভিসা যাচাই এবং চাকরির তথ্য যাচাই করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তৃতীয়ত, দালালদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যেতে পারে। চতুর্থত, বিদেশগামী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারেন।

একইসঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে শর্টকাট কোনো সমাধান নয়। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বৈধ পথ অনুসরণ করাই নিরাপত্তা ও সাফল্যের একমাত্র উপায়।

বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির প্রকৃত নায়ক। তাদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স দেশের উন্নয়নযাত্রাকে গতিশীল করে। অথচ সেই মানুষগুলোর একটি বড় অংশ যদি দালালদের প্রতারণার শিকার হন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় ক্ষতিও বটে। তাই জনশক্তি রপ্তানি খাতকে দালালমুক্ত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই খাতকে পুনর্গঠন করতে পারলে বাংলাদেশ আরো শক্তিশালী শ্রমবাজার গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

অতএব, জনশক্তি রপ্তানি খাতকে ঘিরে গড়ে ওঠা দালাল চক্রের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়ার আগে হাজারো মানুষ যেমন প্রতারণার শিকার হবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিও তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে না। একটি দালালমুক্ত, স্বচ্ছ ও মানবিক অভিবাসন ব্যবস্থাপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই প্রবাসীদের স্বপ্ন, মর্যাদা এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা সুরক্ষিত করা সম্ভব।

লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়