স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ভয়ংকর রূপ!

কৈশোরে অপরাধ

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই অনেক ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। শুধুমাত্র ইভটিজিং কিংবা মহল্লাভিত্তিক বখাটেপনা নয়, কিশোররা গ্রুপ করে পরিকল্পিত হত্যায়ও অংশ নিচ্ছে। সহপাঠীকে অপহরণ করে দাবি করছে মুক্তিপণ। ধর্ষণ ঘটনায় জড়াচ্ছে। গড়ে তুলছে নিজস্ব গ্যাং। এ চিত্র শুধু রাজধানীর নয়; সারা দেশের। ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব আর পরিবারের যথাযথ দেখাশোনার অভাবের কারণেই কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে বলে মনে করেন সমাজ বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে শুধু আইনের প্রয়োগ ও কঠোরতায় তেমন ফল আসবে না। বরং কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন সামাজিক, পারিবারিক শাসন ও সচেতনতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিবছর সারা দেশে কিশোর অপরাধসংক্রান্ত ৫ শতাধিক মামলা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি মামলার সংখ্যা কিছুটা কমলেও কিশোরদের অপরাধের ধরন বেড়েছে। প্রতিবছর হত্যা ও ধর্ষণসংক্রান্ত ২ শতাধিক ঘটনায় কিশোররা জড়িত থাকছে। গ্রামপর্যায়েও কিশোর অপরাধের বিস্তার ঘটেছে। তারা ইন্টারনেট থেকে নানা অপরাধের খোরাক পাচ্ছে। টেলিভিশন সিরিজ থেকে জেনে নিচ্ছে কৌশল। ওসব কিশোরদের বেশির ভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা মাদকসেবনের টাকা জোগাতে গিয়েও বড় ধরনের অপরাধ করছে। এমনকি মা-বাবাকেও হত্যার অভিযোগে আটক রয়েছে অনেক কিশোর-কিশোরী। সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা এলাকায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ওই ঘটনায় যাদের আটক করা হয় তারা স্থানীয় স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। একই ভবনে তাদের বসবাস। মোবাইল ফোন নিয়ে বিরোধে দুই কিশোর হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রটিকে ডেকে নেয় ১০ তলা ভবনের ছাদে নিয়ে মারধর করে একটি বস্তায় ভরে পানির ট্যাংকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ঘটনা দেখে বাড়ির মালিকসহ পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ পৌঁছে শিশুটিকে উদ্ধার এবং দুই কিশোরকে গ্রেফতার করে। তাছাড়া পিরোজপুরে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেয়ে সালাউদ্দিন (১৩) নামে এক স্কুলছাত্রকে হত্যা করে একদল কিশোর। তারা টেলিভিশনে ভারতের সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রোল দেখে অপরাধের কৌশল শিখেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। গত মাসে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ৩ কিশোর অর্থ লোভে এক সহপাঠীকে খুন করে। গত জানুয়ারিতে একটি অপহরণ ঘটনায় যশোরে মুক্তিপণের ৫ লাখ টাকা নিতে গিয়ে আটক হয় বিলাল নামের এক কিশোর। পরে বন্দুকযুদ্ধে তার মৃত্যু হয়। গ্রেপ্তারের পর বিলালের দেয়া তথ্যে উদ্ধার হয়েছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের লাশ। সূত্র আরো জানায়, গত বছরের মার্চে পুরান ঢাকায় হত্যার শিকার হয় ১৫ বছরের সিজান। তাকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে ইমন ও মুন্না মিয়া নামের দুই কিশোর। স্থানীয় গ্যাং কালচারের অংশ হিসেবে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। তখন বংশাল ও চকবাজার থানা এলাকার সুরিটোলা, চানখাঁরপুল ও মালিটোলা এলাকায় অনেক কিশোর অপরাধী গ্রুপ শনাক্ত হয়। এর আগে উত্তরায় আদনান কবীর নামে এক স্কুলছাত্রকে হত্যার পর সেখানে একাধিক কিশোর গ্রুপ ধরা পড়ে। ওসব কিশোরের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপ খোলা ছিল। তাছাড়া গত বছর মার্চে চট্টগ্রামের পশ্চিম মাদারবাড়ীর সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসানকে অপহরণ ঘটনায় মুক্তিপণ নিতে গিয়ে গ্রেফতার হয় কিশোর গ্যাংয়ের ৪ সদস্য। তারা ছাত্রটিকে অপহরণের পর ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। জানা গেছে, উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, তুরাগ, দক্ষিণখান ও উত্তরখানসহ আশপাশের এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২৪টি কিশোর গ্যাং আধিপত্য বিস্তার করছে, যারা দিনকে দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত তিনমাসে এই এলাকা থেকে কমপক্ষে ২৯ জন কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু বারবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল তাদের ছাড়িয়ে আনে। যে কারণে এসব কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ।কিশোর গ্যাংয়ের সদ্যদের অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ বিষয়ে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক বলেন, উত্তরা ও এর আশপাশের এলাকায় যেসব কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে তারা অনেকটাই বেপরোয়া। তাদের নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। এখন পর্যন্ত এলাকার বিভিন্ন গ্যাং গ্রুপের ২৯ সদস্যকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু যেভাবে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে তাতে এখন পর্যন্ত যতটুকু অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বা গ্রেফতার হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। এলাকার বাসিন্দারা যেদিন থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে সেদিনই কিশোর গ্যাং কমেছে বলে মনে করব আমরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং মূলত পরিবারের দায়িত্ব-হীনতার কারণে গড়ে উঠে। কারণ সন্তান কখন কার সঙ্গে মিশে, কোথায় কি করে সে সে খোঁজ না নেওয়ার ফলেই এ কিশোর গ্যাংয়ের উত্তপ্তি ঘটে। তাই শুধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভর না করে পারিবারিক এবং সামাজিকভাবেও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। তা না হলে এটি আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। তখন এদের নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে উঠবে। এজন্য পরিবারের পাশাপাশি এলাকা ভিত্তিক যে সামাজিক সংগঠন থাকে তাদেরকেও সোচ্চার হতে হবে।

 

"