শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জ
বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়ছে প্রতিদিন ভাঙছে ১৫ সংসার

সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। এতে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৩ থেকে ১৫টি সংসারে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। সহনশীলতা, বেকারত্ব, অনলাইন জুয়া, পরকীয়া, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পারিবারিক অস্থিরতাকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা রেজিস্টার অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে জেলায় মোট ১৪ হাজার ১৯৭টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৫ হাজার ৩৩৩টি। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৩৯টি বিয়ের বিপরীতে ১৫টি তালাক হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে বিয়ের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩১৭টিতে। ওই বছরে তালাক হয়েছে ৪ হাজার ৮০৩টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩৬টি বিয়ে এবং ১৩টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট বিয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশের সমপরিমাণ তালাক হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিয়েবিচ্ছেদ ঘটেছে রায়গঞ্জ উপজেলায়। সেখানে ২০২৫ সালে ৮৪৯টি বিয়ের বিপরীতে তালাক হয়েছে ৫৬১টি। অর্থাৎ প্রতি ১০০টি বিয়ের বিপরীতে প্রায় ৬৬টি তালাক হয়েছে। প্রতিদিনই যে হারে সংসার ভেঙে যাচ্ছে, তাতে উদ্বেগ বাড়ছে। বিয়ের সংখ্যা কমার পাশাপাশি বিয়েবিচ্ছেদের উচ্চ হার এখন জেলার সামাজিক বাস্তবতায় নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৩৩টি এবং ২০২৫ সালে ১৪৯টি হিন্দু বিয়ে নিবন্ধিত হলেও এই দুই বছরে একটিও তালাকের ঘটনা ঘটেনি।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাজী শরিফ বলেন, গত কয়েক বছরে তালাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামী বেকার হয়ে পড়েছেন অথবা অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ধরনের কর্মকান্ডে জড়িয়ে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করছেন। অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক কলহের কারণে অনেক নারী শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, আগে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে অনেক সমস্যা সমাধান হতো। এখন মানুষ অনেক কম আপস করতে চায়। ফলে সামান্য বিরোধও বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির কর্নেল বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্মার্টফোনের অপব্যবহার দাম্পত্য কলহের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। আদালতে আসা অনেক মামলায় দেখা যায়, পারস্পরিক অবিশ্বাস, গোপন যোগাযোগ এবং অনলাইন সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি ও সহনশীলতার অভাবও বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তালাক নেওয়া এক নারী বলেন, আমি সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্বামী নিয়মিত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সংসারের খরচ দিতেন না। পরিবার থেকে বহুবার মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। শেষপর্যন্ত আর কোনো উপায় না দেখে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
অপরদিকে দুই বছর আগে বিয়েবিচ্ছেদের মুখোমুখি একজন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝি হতো। ধীরে ধীরে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়তে থাকে। একসময় আলাদা হয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়। এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় সন্তানের জন্য।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা নিয়মিত উঠান বৈঠক, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছি। পারিবারিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, নারী ও শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি।
সচেতন মহলের মতে, ক্রমবর্ধমান বিয়েবিচ্ছেদ কেবল পারিবারিক নয়, এটি একটি সামাজিক সংকটেরও ইঙ্গিত বহন করে। তারা বলছেন, পরিবারে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
"






































