শরতের ছোঁয়া

আবদুস সালাম

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

রাকিবদের বাড়ি মেহেরপুরের দারিয়াপুর গ্রামে। গ্রামের একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সে পড়াশোনা করে। তার বাবা গ্রামে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করে। মা গৃহিণী। গ্রামের অন্য ছেলেমেয়েদের মতো সবুজে ঘেরা প্রকৃতির মধ্যে রাকিব বেড়ে উঠেছে। শহর দেখার সৌভাগ্য তার তেমন হয়ে ওঠেনি। তার ছোট চাচা ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করে। দু-এক বছর পরপর গ্রামে বেড়াতে আসে। দুদিন থেকেই আবার চলে যায়। চাচাতো ভাই মুকিত যখন ছোট ছিল, তখন একবার গ্রামে এসেছিল। এরপর বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল সে আর গ্রামে আসেনি। ঢাকা শহর ছেড়ে তার নাকি গ্রামে আসতে ভালো লাগে না। ঢাকা শহর খুব সুন্দর শহর। সেখানে অনেক কিছু আছে। রাকিব স্কুলের শিক্ষক এবং তার বাবার কাছে শুনেছে ঢাকায় বাচ্চাদের জন্য সুন্দর সুন্দর পার্ক রয়েছে। চিড়িয়াখানা, জাদুঘরসহ অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রাতের বেলায় ঢাকা শহর দেখতে খুব সুন্দর লাগে। শপিং মল এবং বড় বড় দালানকোঠায় রং-বেরঙের বাতি জ্বলে। একবার ঢাকায় গেলে নাকি আসতে মন চায় না।

রাকিব মনে মনে স্বপ্ন দেখে ঢাকা শহরটা খুব সুন্দর করে একবার দেখবে। সে শুনেছে কদিন পরেই তার ছোট চাচা গ্রামে আসবে। তখন চাচার সঙ্গে ঢাকায় বেড়াতে যাবে। দেখতে দেখতে রাকিবের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই তার চাচা গ্রামে আসে। চাচা নিজ থেকেই বলেছে রাকিবকে কয়েক দিনের জন্য ঢাকায় নিয়ে যাবে। রাকিবের বাবা এতে সম্মতি দেয়। খুশিতে রাকিবের মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। ঢাকায় বেড়াতে যাওয়া তার অনেক দিনের শখ। এবার সেই শখ পূরণ হবে। এক দিন পরই রাকিব চাচার সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিল। খুব সকালেই রওনা দিয়েছে। কোচের জানালার পাশে রাকিবকে বসতে দিয়েছে। কোচ দ্রুত গতিতে সামনের দিকে ছুটে চলছে। দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে রাকিবের খুব ভালো লাগছে। ঘণ্টা তিনেক পরেই কোচটি গোয়ালন্দ ফেরিঘাটে পৌঁছে যায়। ফেরি যখন চলতে থাকে, তখন পদ্মা নদীর দৃশ্য দেখতে রাকিবের খুব ভালো লাগে। মাথার ওপর গাঙচিল উড়তে থাকে। নদীতে ছোট-বড় অনেক লঞ্চ, স্টিমার চলাচল করছে। এক ঘণ্টার আগেই ফেরি আরিচাঘাটে পৌঁছে যায়। আবার ছুটতে কোচ। ঘণ্টা দু-একের মধ্যেই তারা ঢাকায় পৌঁছে যায়। একটা সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে রাকিবে চাচা মিরপুরের উদ্দেশে রওনা হয়। সড়কপথে একসঙ্গে এতগুলো যানবাহন চলাচল করতে রাকিব এর আগে কখনো দেখেনি। সে এর আগে শুনেছিল ঢাকার রাজপথে দোতলা বাস চলাচল করে। আজ সে নিজ চোখে সেগুলো দেখছে। কিছুক্ষণ পরই তারা বাসাতে পৌঁছে যায়। রাকিবকে দেখে মুকিত খুশি হয়। রাকিব তার সমবয়সি।

চাচি তাদের জন্য ভালো ভালো খাবার রান্না করে রেখেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে তারা কিছু সময় বিশ্রাম করে। রাকিব ও মুকিত দুজনেরই স্কুল ছুটি। কদিন মজা করে তারা ঘুরে বেড়াবে। পরদিন তারা চিড়িয়াখানায় বেড়াতে গেল। পরিচিত পশুপাখিসহ নাম না জানা অনেক প্রাণীকে তারা ঘুরে ঘুরে দেখল। চিড়িয়াখানা ঘুরতে পেরে রাকিবের সময়গুলো ভালোভাবেই কেটে গেল। এভাবে তারা একে একে জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় জাদুঘর, শিশুপার্ক, নন্দনপার্ক, সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ, আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, নভো থিয়েটারসহ বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে। এক দিন ছোট চাচা রাকিবকে তার অফিস বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ে গেল। লিফটের মাধ্যমে তারা ওপরের তলায় উঠে যায়। ওপরের তলা থেকে রাকিব চারদিকটা একবার দেখে নেয়। মতিঝিলের চারদিকে অবস্থিত সুউচ্চ অট্টালিকা দেখে রাকিবের খুব ভালো লাগে। এরপর চাচার অফিসে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাকিব এর আগে কখনো প্রবেশ করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশপাশের এলাকা ঘুরতে পেরে রাকিবের খুবই ভালো লাগল।

দেখতে দেখতে দশ দিন কেটে যায়। বাড়ির জন্য তার মনটা পুড়তে থাকে। তার বন্ধু শাহিদ, আরিফ, মজনু ও মিজানদের কথা তার খুব মনে পড়ছে। চাচাদের ফ্ল্যাটটি আটতলায় অবস্থিত। আশপাশে খেলাধুলা করার তেমন কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। সব সময় তাকে ঘরের মধ্যে বন্দি থাকতে হয়। এভাবে ঘরের মধ্যে বন্দি থাকতে তার আর মোটেও ভালো লাগছে না। যত দিন যায় ততই সে হাঁপিয়ে ওঠে। ঢাকায় তার একদম মন বসছে না। এক দিন সে চাচাকে বলল তাকে বাড়িতে রেখে আসার জন্য। উত্তরে চাচা বললেন, আগামী শুক্রবার তোমাকে রেখে আসব। শুক্রবার আসতে এখনো তিন দিন বাকি। খুব কষ্ট করে এ কটা দিন সে পার করল। গ্রামে তার কীভাবে সময় কাটে, তার অনেক গল্প সে মুকিতকে বলেছে। মুকিতেরও ইচ্ছা ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাবে ঘুরতে। শুক্রবার ছোট চাচা রাকিবকে গ্রামে রেখে আসে। গ্রামে ফিরতে পেরে তার মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। মুকিত বলেছে, এবার ঈদের ছুটিতে সে গ্রামে যাবে। দুই মাস পরই ঈদ। দেখতে দেখতে দুই মাস হয়ে যায়। মুকিত তার মা-বাবার সঙ্গে গ্রামে গেল ঈদ উদ্যাপন করতে। বর্ষাকাল শেষে হয়ে শরৎকাল পড়েছে। এখন ভাদ্র মাস। এ সময় বৃষ্টিস্নাত গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি বড়ই মনোরম। মুকিত সর্বশেষ যখন গ্রামে এসেছিল তখন সে ছোট ছিল। দারিয়াপুর গ্রামটা তেমন করে দেখা হয়নি। এবার সে গ্রামটিকে ভালোভাবে দেখতে চায়। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ভৈরব নদ। নদটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ। মুকিতের ইচ্ছা সে নৌকায় চড়বে। সে বড় চাচার কাছে তার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করল। বড় চাচা বলল, ‘বেশ তাই হবে। বিকালবেলায় আমরা নৌকা নিয়ে ঘুরতে বের হব।’ বিকালে তারা ঘুরতে বের হলো। নদীতে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দাঁড় বাইছে বড় চাচা অর্থাৎ রাকিবের বাবা। মুকিতের সঙ্গে রয়েছে রাকিব, রাকিবের বন্ধু আরিফ ও মিজান। নদীর দুই পাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে তাদের খুব ভালো লাগছে। দুই পাশে সারি সারি কাশফুল। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নদীতে সারিবদ্ধভাবে রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে। পাড়েও কিছু পাতিহাঁস শামুক-ঝিনুক ও গুগলি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। পাশেই আবার গরু-ছাগল আপন মনে চরে বেড়াচ্ছে। কোথাও আবার ডিঙি নৌকায় জেলেরা মাছ ধরছে। নদীর স্বচ্ছ জলে খলসে, পুঁটি, চান্দা মাছ খেলা করে। কানাবক ও মাছরাঙা পাখি সারা দিন ব্যস্ত থাকে মাছ শিকারে। তাদের চোখে পড়ে নদীতে ভাসছে লাল গোলাপি সাদা শাপলা। নদীর চারদিকের দৃশ্য দেখে মুকিতের খুব ভালো লাগল। এত কাছ থেকে সে আগে কখনো নদ-নদী ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করেনি। তার প্রাণটা ছুঁয়ে গেল।

পরের দিন মুকিত বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যায় অবারিত সবুজের প্রান্তরে। যেখানে রয়েছে সারি সারি ফসলের মাঠ। আমন ধানখেতে হিমেল হাওয়া দোল খেয়ে যায়। নানা ধরনের পাখির কূজনে মুখরিত নীল আকাশ। মাথাল মাথায় কৃষকরা সারিবদ্ধভাবে কাজ করছে। তাদের কণ্ঠে পল্লীগানের সুর। বাবলাগাছের ছায়ায় বসে এক রাখাল বালক বাঁশিতে সুর তুলেছে। তার গান শুনে থমকে দাঁড়ায় মেঠোপথের পথিকরা। কতশত ভালো লাগার পসরা চারদিকে। ঢাকায় এগুলো দেখার কোনো সুযোগ নেই। মুকিতের মনটা চায় সারা বেলা মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতে। সন্ধ্যা নেমে আসায় তাদের বাড়ি ফিরতে হলো। অন্য এক দিন রাকিব মুকিতকে আমবাগানে নিয়ে যায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে। সেখানে তারা দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি খেলায় মেতে ওঠে। বিকালবেলায় তারা গাছের ডালে দড়ি বেঁধে দোলনা বানায়। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে দোল খাওয়ার মজাই আলাদা। পরেরদিন সকালে তালের বড়া খেয়ে বন্ধুদের নিয়ে তারা ঘুরতে বের হয়। এবার তারা আরো দূরে চলে যায়। গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা ক্লান্ত হয়ে যায়। একটা গাছের নিচে তারা বসে বিশ্রাম করে। রাকিব মুকিতকে জানায় তারা যে গাছের নিচে বসে আছে সেটি ছাতিমগাছ। গাছভরা ছাতিম ফুল দেখে তাদের দুচোখ জুড়িয়ে যায়। সে আরো জানতে পারে যে ছাতিমের নরম কাঠ থেকে পেনসিল ও সেøট তৈরি হয়। দেশলাইয়ের কাঠি তৈরি করতে ছাতিমগাছের কাঠ ব্যবহার হয়। এরপর তারা আবার হাঁটতে শুরু করে। তাদের চোখে পড়ে একটা ফুলবাগান। সেখানে ফুটে আছে জুঁই মালতী ও শিউলি ফুল। তারা সাঁকো পার হয়ে ভৈরব নদের অপর পাড়ে পৌঁছে যায়। গিয়ে দেখে মাঠের মধ্যে বেশ কয়েকটি তালগাছে বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে। মুগ্ধ নয়নে মুকিত বাবুই পাখির বাসা দেখতে থাকে। সে এর আগে টেলিভিশনে এবং জাতীয় জাদুঘরে বাবুই পাখির বাসা দেখেছে। আজ সে সরাসরি বাবুই পাখির বাসা দেখছে। সেখানে তারা বেশখানিকটা সময় কাটিয়ে বাসায় ফিরে আসে। রাতেরবেলায় মুকিত দেখেছে বাঁশঝাড়ে কীভাবে জোনাকি পোকা আলো জ্বেলে উড়ে বেড়ায়। মনে হয় যেন তারাদের মেলা বসেছে। রাকিব কয়েকটি জোনাকি ধরে জামার পকেটের মধ্যে রেখে দেয়। দেখতে খুব ভালো লাগে। মুকিতও সাহস করে কয়েকটি জোনাকি ধরেছে। দূর আকাশে চাঁদ-তারাদের খেলা দেখতে তার খুবই ভালো লাগে।

দেখতে দেখতে ছুটি শেষ হয়ে যায়। গ্রাম ছেড়ে যেতে মুকিতের একদম ইচ্ছে করে না। শরৎকালে গ্রাম-বাংলার রূপ দেখে সে মুগ্ধ হয়েছে। তার আরো কিছুদিন থাকতে ইচ্ছা করছে। তবু তাকে যেতে হবে। কারণ দু-দিন পরেই তার স্কুল খুলবে। মুকিতের বাবা বলেছে এখন থেকে প্রতিটি ঋতুতেই তোমাকে গ্রামে নিয়ে আসব। কারণ প্রতিটি ঋতুতেই গ্রাম-বাংলার প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তখনো গ্রামের রূপ দেখলে তুমি খুশি হবে। বাবার কথা শুনে মুকিত খুশি হলো। ওদিকে মুকিত চলে যাবে শুনে রাকিবেরও মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছোট চাচা রাকিবকে বলল গ্রামে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা রয়েছে। এবার এলে তোমাকে একটা কম্পিউটার কিনে দেব। তবে তোমাকে পরীক্ষায় ভালোভাবে পাস করতে হবে। পরেরদিন সকালবেলায় মুকিতরা ঢাকায় চলে যায়। রাকিবের মনটা ভীষণ খারাপ। সে অপেক্ষা করতে থাকে আবার কবে ছোট চাচা গ্রামে আসবে।

 

 

 

"