মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

  ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আদল-মুনিরা দম্পতির অনন্য উদ্যোগ

জি.এম আদল ও সিরাজুম মুনিরা একসঙ্গে পিরোজপুর জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় পণ্যকে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশেও পরিচিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করেছেন ‘আমার পিরোজপুর.কম’। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন জি.এম আদল। তার সহধর্মিণী সিরাজুম মুনিরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরিবারে আদলের মা ও ছোট ভাই রয়েছেন, আর মুনিরার বাবা-মা এবং দুই বোন।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে গ্রাজুয়েশন করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসার সময় পরিচয়ের সময় বাড়ি কোথায় তা বলতে গিয়ে আদল লক্ষ্য করেন, পিরোজপুরের নাম সঠিকভাবে কেউ চিনে না। তখনই তার মনে জন্মায় স্বপ্ন- একদিন তার জেলার নাম দেশ-বিদেশে সবাই চিনবে। সেই চিন্তা থেকেই ২০১৯ সালে তারা ‘আমার পিরোজপুর.কম’ শুরু করেন।

প্রথম মূলধন ছিল মাত্র ৫-৭ হাজার টাকা। চাকরি করলেও ভিন্ন ভিন্ন স্থানে থাকায় একসঙ্গে থাকা সম্ভব ছিল না। করোনার লকডাউনের সময় দুজনই চাকরি হারান। হাতে থাকা অল্প মূলধন নিয়েই তারা পুরো সময় দিয়ে উদ্যোগটি চালু করেন। ফেসবুকে পেজ খুলে অল্পদিনের মধ্যেই আশার চেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া পান।

চাকরি না করে উদ্যোক্তা হওয়ার সময় পরিবারের অনেকে নেগেটিভ মন্তব্য করলেও আদল বলেন, ‘চাকরি করাই একমাত্র পেশা নয়। উদ্যোক্তাও পেশা হতে পারে, যদি ধৈর্য ও মনোবল থাকে।’ কৈশোর থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। মাধ্যমিকের সময় উদ্যোগ ও উদ্যোক্তার বইগুলো তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ঝুঁঁকি জানার পরও স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতা ভেবে তিনি এই পথ বেছে নেন। পিরোজপুর জেলার অগাধ ভালোবাসা। সে কারণেই নাম রেখেছেন ‘আমার পিরোজপুর.কম’। পণ্য হিসেবে তারা বিক্রি করেন পিরোজপুরের মাল্টা, সুগন্ধি কালোজিরা চাল, তালের গুড়, নদীর মাছ, বিভিন্ন শুঁটকি, রেডি টু ইট চিংড়ি ভর্তা, নারিকেল নাড়ু এবং পিরোজপুরের ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলা টি-শার্ট। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী খাঁটি মধু ও ঘিও বিক্রি হয়। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে আদল পণ্যের কাঁচামাল সংগ্রহ করেন।

এছাড়া তারা পরিচালনা করেন স্মার্ট টু-লেট সার্ভিস এবং ট্যুর গাইড সার্ভিস, যা পিরোজপুর জেলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও পর্যটকদের সুবিধা দেয়। স্মার্ট টু-লেট সার্ভিসের মাধ্যমে জেলার বাসবাড়ির মালিকরা সহজেই বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, এবং যারা বাসা ভাড়া চাইছেন, তারা ‘আমার পিরোজপুর.কম’ ব্যবহার করে সহজেই বাসা খুঁজে পেতে পারেন। ট্যুর গাইড সার্ভিসের মাধ্যমে পিরোজপুর জেলা ঘুরতে চাইলে যে কেউ তাদের সহযোগিতা নিয়ে স্থানীয় দর্শনীয় স্থান ঘুরতে পারে।

আদল জানান, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ব্যবসা করার সুবিধা অনেক। পারিবারিক ও ব্যবসায়িক দায়িত্ব ভাগাভাগি করা, ব্যবসার ভিশন ও মিশন এক রাখা, আর সৃজনশীলতার ব্যবহার করা যায়। আদল সোর্সিং, বিক্রি ও মার্কেটিং দেখেন, সিরাজুম মুনিরা কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও প্যাকেজিং দেখেন। ফলে গ্রাহকের কাছে পণ্য সবসময় মানসম্মত পৌঁছে।

উদ্যোগের পথে আদল ও মুনিরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। ডেলিভারি সমস্যা, মূলধন সংগ্রহে অসুবিধা, এবং মানুষের কটু মন্তব্য-সবকিছুর মোকাবিলা করতে হয়। কখনো কখনো মাছ বা মাল্টার কাঁচামাল কাস্টমার ঠিকভাবে না নেওয়ায় ক্ষতি হয়; উদাহরণস্বরূপ, শুরুতে মাছের কাঁচামালে প্রায় ১২,০০০ টাকার ক্ষতি হয়েছিল। এসব হতাশার মধ্যেও তারা মনোবল হারাননি এবং পুনরায় শুরু করে সফলতা অর্জন করেছেন।

তাদের উদ্যোক্তা যাত্রার আনন্দের এক দিক হলো সুগন্ধি কালোজিরা চাল, যা সম্পূর্ণ ন্যাচারাল এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। অনেক গ্রাহক নবজাতক শিশুর প্রথম ভাত হিসেবে এই চাল ব্যবহার করেন। গ্রাহকদের আস্থা ও ভালোবাসা আদল ও মুনিরার জন্য গভীর প্রেরণার উৎস, যা তাদের উদ্যোক্তা জীবনে আনন্দ ও সন্তুষ্টি যোগ করে। প্রতিটি ক্রয় শুধু ব্যবসা নয়, বরং তাদের আবেগ ও উদ্যোগের প্রতি দৃঢ় মনোভাবকে আরো শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশের প্রায় ৬৪ জেলায় তাদের পণ্য পৌঁছেছে। ৩০-৪০ বছর বয়সী পেশাজীবীরা সবচেয়ে বেশি ক্রেতা। প্রবাসীদের মাধ্যমে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কানাডা, ইতালিসহ আরো কয়েকটি দেশে পণ্য পাঠানো হয়। বিশেষ করে চিংড়ি ভর্তা- রেডি টু ইট আইটেম বিদেশে বেশ জনপ্রিয়। প্রবাসীরা পরিবারের জন্য নিয়মিত এই পণ্য অর্ডার করে।

আমার পিরোজপুর.কম-এর গ্রাহকরা তাদের পণ্যের মান ও সেবায় সন্তুষ্ট। নিয়মিত গ্রাহক কাওসার আহমেদ বাঁধন, যিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বলেন যে তার পরিবারের জন্য কেনা মাল্টা সবসময় মিষ্টি ও রসালো হয়েছে। পাশাপাশি নারী গ্রাহক মহুয়া নন্দিনী জানালেন, সুগন্ধি কালোজিরা চালের স্বাদ ও প্যাকেজিং তার খুব ভালো লেগেছে, বাচ্চার বাড়তি খাবারের জন্য এটি ব্যবহার করেছেন এবং পরিবারের অন্যরাও সন্তুষ্ট হয়েছেন।

আদল ও মুনিরা সর্বদা গ্রাহক সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেন। পণ্য যদি ক্রেতার পছন্দ না হয়, তা বিনামূল্যে ফেরত নেওয়া হয়। তাদের ফেসবুক পেজ ‘আমার পিরোজপুর.কম’-এ প্রায় ১৮,০০০ ফলোয়ার রয়েছে। মাসে গড় বিক্রি প্রায় ৪০ হাজার টাকা, এবং নীট আয় ১৫-২০ হাজার টাকা।

পিরোজপুর জেলা ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের দিক থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। জেলার ভাসমান সবজি ক্ষেত বিশ্বব্যাপী পরিচিত, এবং স্বরূপকাঠীর ভাসমান পেয়ারা বাগান, পিরোজপুর সদর উপজেলার রায়েরকাঠী রাজবাড়ি ও শিব মন্দির, মঠবাড়িয়ার কাঠের মমিন মসজিদ, ভান্ডারিয়ার হরিণপালা রিভারভিউ ইকোপার্কসহ নানা দর্শনীয় স্থান রয়েছে। নদী বিধৌত এই জেলার নৌ পর্যটনেরও অপার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রচারের অভাবের কারণে এই সম্পদগুলো এখনো অনেকের অগোচরে, এবং ‘আমার পিরোজপুর.কম’ এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেশ-বিদেশে পরিচিত করার কাজ করছে।

পিরোজপুরের শতাধিক তরুণকে কর্মসংস্থানে আনতে, জেলা ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা। এছাড়া পিরোজপুরের পর্যটন ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করা। এইগুলো হলো তরুণ এই উদ্যোক্তা দম্পতির আগামীদিনের পরিকল্পনা।

জি.এম আদল ও সিরাজুম মুনিরার গল্প দেখায়, সীমিত মূলধন, লস ও চ্যালেঞ্জ থাকলেও যদি দৃঢ় মনোবল থাকে, উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব এবং নিজের জেলার নাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। তারা প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং সৃজনশীলতা থাকলে ছোট উদ্যোগও দেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়