মাসুদ রানা, বরিশাল

  ১৯ জানুয়ারি, ২০২১

সরকারি পদের দাপট

ধনী পরিবার পেল খাসজমি বাদ যায়নি মৃত ব্যক্তিও

সরকারি উচ্চপদের প্রভাব ও দাপট খাটিয়ে ধনী পরিবারের এক সরকারি কর্মকর্তা বরিশালে তার বাবা ও মায়ের নামে খাস জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন। ওই বন্দোবস্তের দলিলে তার মৃত বাবাকেও করা হয়েছে জমির সমান অংশীদার। তবে এই উপসচিব জানিয়েছেন, তার মায়ের নামে কোনো জমি নেই, সে কারণে তার নামে খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছে। এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। তার মতে, এলাকার এক দল ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাইদুর রহমান নিজের মা জাহানারা বেগম এবং বাবা মৃত আবদুর রহমানকে ভূমিহীন দেখিয়ে নিজ গ্রাম বরিশাল উজিরপুরের ওটরায় সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন। এ বন্দোবস্তের সূত্রধরে সেখানে মার্কেট নির্মাণ ও পাশের আরো ২০ শতক জমি দখল করে রেখেছেন তিনি। সরকারিবিধি মোতাবেক খাস জমি প্রাপ্য নয়, এমন পরিবারের সদস্যদের সরকারি খাস জমি পাইয়ে দিতে বা জালিয়াতি কাজে কেন সহায়তা করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে উজিরপুর উপজেলার সাবেক ভূমি কর্মকর্তা ও নলছিটি উপজেলার বর্তমান ইউএনও রুম্পা সিকদার এবং উপসচিবের বেয়াই ওটরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহাদাৎ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমান ইউএনও চাইলে বন্দোবস্ত বাতিল করতে পারেন। এদিকে উপসচিব সাইদুর রহমানের ব্যাপারে পাওয়া গেছে বিভিন্ন বিতর্কিত তথ্য। এগুলো হচ্ছে একাধিক ব্যক্তির ভূমি দখল, টাকার বিনিময়ে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া এবং এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতদের আড়ালে থেকে প্রশাসনিক ছত্রছায়া দেওয়ায় অভিযোগ। এতে সাধারণ মানুষ নানা ধরনের হয়রানি ও অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। এলাকায় বেড়ে গেছে মাদক ও জালিয়াতি কর্মকা-। সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অস্থির আবহের পরিবেশ। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এসব ব্যাপারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপসচিব সাইদুর রহমানকে বর্তমানে বদলি করে সমপদমর্যাদায় জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেছেন, একজন উপসচিব পদমর্যাদার ব্যক্তি নিজের গ্রামকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক ভূমিকা রাখতে পারেন। অথচ আমাদের এলাকার উপসচিব নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে শ্বশুর-শাশুড়ির নামে ঢাকায় বাড়ি গাড়ি ক্রয় করেছেন, আর নিজ এলাকার সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন।

------
জানা গেছে, ১০-০৫-২০১৮ সালে বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের জেএল ৩৭নং মৌজার রাস্তার মাথা বাজারের সরকারি খাস জমির ১৫৭২ ও ১৫৮১ দাগের ১০ শতাংশ জমি এই এলাকার বৃদ্ধা জাহানারা বেগম ও তার মৃত স্বামী আবদুর রহমানের নামে সাবরেজিস্ট্রার বন্দোবস্ত হিসেবে দলিল (দলিল নং-১৮১১/১৮) দিয়েছেন। ওই দলিলের সূত্র ধরে দেখা যায়, সেই সময়ের ওই উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা ও বর্তমানে বরিশাল ঝালকাঠি জেলার নলছিঠি উপজেলার ইউএনও রুম্পা শিকদার ওই বন্দোবস্তে সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি বন্দোবস্তে গ্রহীতা জাহানারা বেগমের পরিচিতির ঘরে ওটরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহাদাৎ হোসেনের স্বাক্ষর রয়েছে। বন্দোবস্ত জমির গ্রহীতা জাহানারা বেগমের ৫ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে মিজানুর রহমান পল্লী বিদ্যুতের ইঞ্জিনিয়ার, মেজ ছেলে সাইদুর রহমান উপসচিব, ছোট ছেলে কাউছার হোসেন প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজার। আর দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে স্কুলের শিক্ষিকা ও ছোট মেয়ে এক ধনাঢ্য পরিবারের গৃহিণী। প্রশ্ন হচ্ছে, খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়া বা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘১৯৯৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে সংশোধনী গেজেট প্রকাশিত মতে, যে পরিবারের বসতবাড়ি এবং কৃষি জমি কিছুই নেই কিন্তু পরিবারটি কৃষিনির্ভর অথবা পরিবারের একাধিক সদস্য কৃষি শ্রমিক হিসেবে অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করে কেবলমাত্র তারাই ভূমি বন্দোবস্ত পাবেন।’ তাহলে কিভাবে ওই পরিবারের সদস্যরা সরকারি জমি বন্দোবস্ত পেল সে বিষয়ে জানতে সরেজমিনে গেলে জানা যায়, উপসচিব সাইদুর রহমান বন্দোবস্ত জমিতে মার্কেট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। পার্শ্ববর্তী আরো জমি দখল করে ছোট বড় দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। একাধিক সূত্র মতে, উপসচিব সাইদুর রহমান ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মায়ের নামে জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন। এ দলিলসম্পন্ন হওয়ার আগে উপসচিবের বাবা আবদুর রহমান বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেলেও দলিলের ভেতর মৃত বাবাকে বন্দোবস্ত জমির সমান অংশীদারিত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জালিয়াতির সহায়ক উজিরপুর উপজেলার তৎকালীন সহকারী ভূমি কমিশনার বর্তমান নলছিঠি উপজেলার ইউএনও রুম্পা শিকদার জানান, যদি দলিলের ভেতর মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া হয় তাহলে বর্তমান ইউএনও বন্দোবস্ত বাতিল করতে পারেন। বিভিন্ন মানুষের সুপারিশ ও টেলিফোনের তদবিরের কারণে এসব ভুল হতে পারে।

এদিকে ওটরা ইউপি চেয়ারম্যান সাহাদাৎ হোসেন একজন গরিব পরিবারকে জমি বন্দোবস্ত পেতে সহায়তা না করে কেন উপসচিবের পরিবারকে বন্দোবস্ত জমির দলিলের পরিচিতি হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন, সে বিষয়ে জানা গেছে, উপসচিব সাইদুর রহমানের বোন জেসমিনের শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে চেয়ারম্যান সাহাদাৎ সম্পর্কে বেয়াই। ওদিকে এলাকার একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, আলাউদ্দিন নান্নান ওরফে হান্নান ও নাসির নামে দুই সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে এলাকায় ভূমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য, জালিয়াতি,সাধারণ মানুষকে হয়রানী করছে। এ সন্ত্রসীদের পুরো দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে রয়েছে জালিয়াতি, ভাড়াটে খুনিদের নেটওয়ার্ক। এ সন্ত্রাসীদের আড়ালে থেকে উপসচিব সাইদুর রহমান সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ আছে। সাধারণ মানুষ স্থানীয় থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ দিলেও সচিব পরিচয়ের ফোনে উল্টো ওই ভুক্তভোগীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। অবশেষে ওটরা এলাকার সাধারণ মানুষের পক্ষে আবদুল মান্নান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপসচিব সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। একই এলাকার ভুক্তভোগী বিধবা মনি ইয়াসমিন জানান, আমাদের জমি দখল করে উপসচিব ভবন করেছেন। এর প্রতিবাদ করায় এখন বিভিন্ন লোকজন দিয়ে আমাকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। থানায় অভিযোগ করতে গেলে উপসচিবের নাম শুনে ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ। তবে আলাউদ্দিন নান্নান ওরফে হান্নান বলেন, নানা মানুষের ষড়যন্ত্রের কারণে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। খাস জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার বিষয়ে জানতে উপসচিবের মা জাহানারা বেগমের বাড়িতে গেলে তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তার ছেলে উপসচিব সাইদুর রহমান মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, ‘আমার মায়ের নামে কোনো জমি নেই তাই বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়া দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। এলাকার কিছু মানুষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে তাই বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন।

 

 

"

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close