ফয়জুন্নেসা মণি
স্মরণ
সাদা মনের মানুষ ‘হ্যানিম্যান’

হোমিওপ্যাথি নিয়ে আলোচনা এলেই যে মহান ব্যক্তির নাম উচ্চারিত হবে, তিনি হলেন বিজ্ঞানী হ্যানিম্যান। ‘আমি বৃথা জীবন ধারণ করিনি, সমস্ত কিছুই প্রমাণ করব, যা ভালো তা শক্ত করে ধর’-এ ছিল তার প্রতিশ্রুতি। হ্যানিম্যান ভাবতেন রোগীকে কম কষ্ট দিয়ে, কম খরচে এবং কম সময়ের মধ্যে রোগ নিরাময়ের জন্য কী করা যায়-যা মানবজাতির কল্যাণে আসবে। নিরলস গবেষণায় তিনি রোগের উৎপত্তি, রোগের বিকাশ, রোগের চিকিৎসা, ওষুধ আবিষ্কার, ওষুধ পরীক্ষাকরণ, ওষুধ প্রস্তুত প্রণালি, ওষুধের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কার করেন। হ্যানিম্যানের হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষকদের মূল্যায়ন-‘গত দুই শ বছরে যার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু আবিষ্কার করা কোনো চিকিৎসা বিজ্ঞানীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। হ্যানিম্যান এমন এক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সন্ধান দিয়েছিলেন যাতে বাদশা থেকে ভিক্ষুক-কাউকেই টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরতে না হয়। প্রাকৃতিক নিয়মে ওষুধ পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ করার চিকিৎসা বিধান প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন এই বিজ্ঞানী। চিকিৎসাসেবাকে স্বল্প ব্যয়ে সব মানুষের নাগালে আনতে তিনি পরিশ্রম করেছেন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন প্রাকৃতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে মানবজাতিকে কিভাবে মুক্ত করা যায়, তা নিয়েই তিনি গবেষণা চালিয়ে গেছেন। চিকিৎসা পেশাজীবীদের তথাকথিত পেশাগত অহমিকা ও লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি প্রমাণ করেছেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও এই নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।
দুঃখজনক সত্যটি হলো, হোমিও চিকিৎসা আবিষ্কারের পর ডাক্তাররাই হ্যানিম্যানের এই আবিষ্কারকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় রোগীকে স্বল্পমাত্রায় সঠিক ওষুধ প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তখনকার রক্ষণশীল চিকিৎসকরা, বিশেষ করে ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতারা রোগীকে স্বল্পমাত্রায় ওষুধ প্রয়োগের পদ্ধতিটি সমর্থন করেননি। তারা হ্যানিম্যানের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেন। ফলে ১৮২১ সালে তিনি জার্মানির লিপজিগ ত্যাগ করে ফ্রান্সের প্যারিসে চলে যেতে বাধ্য হন। তখন থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞান অ্যালোপ্যাথি এবং হোমিওপ্যাথি নামে দুই ভাগ হয়ে যায়। ইউরোপ ও আমেরিকায় অ্যালোপ্যাথি ডাক্তাররা প্রথম যখন সমিতি গঠন করেছিলেন, তখন তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবী থেকে হোমিওপ্যাথিকে নিশ্চিহ্ন করা। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও নিজ লক্ষ্যে অবিচল। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি হোমিওপ্যাথিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা দিতে সমর্থ হয়েছেন। পরবর্তীতে আরো কিছু মনীষীর অবদান হোমিওপ্যাথিকে পূর্ণতা দিয়েছে।
১০ এপ্রিল হোমিওপ্যাথির জনক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের জন্মদিন। ১৭৫৫ সালের মধ্যরাত পেরিয়ে জার্মানির স্যাক্সনি রাজ্যের এলব্ নদীর পাশে এই সাদা মনের মানুষটি জন্মগ্রহণ করেন। ক্ষুদ্রনগরী মিসেনের এক অখ্যাত, অজ্ঞাত, হতদরিদ্র ক্রিশ্চিয়ান গটফ্রেড হ্যানিম্যান ও জোহানা ক্রিশ্চিয়ান পরিবারে স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের জন্ম। ২ বছর ১০ মাস বয়সে হ্যানিম্যানকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। একপর্যায়ে তার শিক্ষকরা অসীম মেধার অধিকারী স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের পড়ালেখার দায়িত্ব নেন। পিতা গটফ্রেড হ্যানিম্যান আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না। তিনি পুত্র হ্যানিম্যানের শিক্ষার ব্যয় জোগাড়ে অক্ষম থাকায় পড়াশোনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের ধীশক্তি ও অধ্যবসায় লক্ষ্য করে শিক্ষকরা তার পিতাকে লেখাপড়া বন্ধ না করার জন্য রাজি করান। অতঃপর তিনি বৃত্তির অর্থে অধ্যয়ন চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা পদ্ধতির (অ্যালোপ্যাথিক) সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। এবং জার্মানের স্টেট ফিজিশিয়ানরূপে নিযুক্ত হন। ২০ বছর বয়সেই স্যামুয়েল হ্যানিম্যান লাতিন, গ্রিক, হিব্রু, ইতিহাস, পদার্থবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। পৃথিবীতে যত দিন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা থাকবে ততদিন হোমিওপ্যাথির জনক মহাত্মা হ্যানিম্যানের নাম মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকবে। হ্যানিম্যানই চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানী, বহু ভাষাবিদ, অনুবাদক ও গবেষক। ১৭৭৫ সালে ২০ বছর বয়সে মাত্র ২০ ডলার নিয়ে লিপজিকে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে যান স্যামুয়েল। ১৭৭৭ সালে অস্ট্রিয়ায় ভিয়েনার লিওপোন্ডস্টট জেলার ব্রাদার্স অব মার্সি হাসপাতালে চিকিৎসাবিদ্যা শিখতে যান। ১৭৭৯ সালে স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এনলার্জেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, সেখানে তিনি উদ্ভিদবিদ্যায় পারদর্শী হন। চিকিৎসা বিদ্যায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি ডক্টরেট এমডি লাভ করেন। ১৭৮০ সালে জার্মানির ম্যানস্? ফিল্ড রাজ্যের হেট স্টেড শহরে সর্বপ্রথম চিকিৎসা আরম্ভ করেন, তিনি গোমারন ধর্মমন্দিরে চিকিৎসক নিযুক্ত হন। ১৭৮১ সালের শেষ দিকে তিনি ম্যাগডিবার্গের নিকটবর্তী গোমেরনে জেলা মেডিক্যাল অফিসার নিযুক্ত হন।
স্যামুয়েল হ্যানিম্যান একাধারে ছিলেন মানব দরদি, একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী, সেরা কেমিস্ট, পরমাণু ও অণুজীব বিজ্ঞানী, প্রত্যয়ী চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, সংস্কারক, বহুভাষাবিদ, সাহসী সংগঠক, অনুবাদক, লেখক, ত্যাগী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। চিকিৎসা গবেষণার একপর্যায়ে তিনি অ্যালোপ্যাথিতে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখতে পান। এতে তিনি অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি পরিত্যাগ করেন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে এবং পেরুভিয়ান কফি বা সিঙ্কোনা গাছের বাকল নিয়ে গবেষণা করতে করতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সূত্র উদ্ভাবন করেন মনীষী হ্যানিম্যান। সুস্থ মানবদেহে ওষুধ প্রয়োগ করে ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ওষুধের গুণাবলি পরীক্ষা করতেন। এ ধরনের গুণাবলি যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে দেখা যেত তখন তিনি তা প্রয়োগ করলে রোগটি সেরে যেত। এটাকে বলে সদৃশ বিধান বা হোমিওপ্যাথি। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের বহু আগে হিপোক্রেটিস, প্যারাসেলসাস, গ্যালেন প্রমুখ মনীষী সদৃশ বিধানের কথা স্বীকার করে গেছেন। সদৃশ তত্ত্বের ওপর পরিপূর্ণ গবেষণা করে হোমিওপ্যাথিকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিষ্ময় এই সাদা মনের মানুষটি। চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করতে গিয়ে ইসলামের স্বর্ণযুগের আবিষ্কার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞান লাভের জন্য আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন স্যামুয়েল। আরব বণিক ও পরিব্রাজকদের কাছ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের ধর্ম, সম্পর্কেও অবগত হন। আরবি ভাষায় দক্ষতার কারণে মহাগ্রন্থ আল কোরানও তিনি অধ্যয়ন করেন। ইসলাম সম্পর্কে অবহিত ও আকৃষ্ট হয়ে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এ কারণে হ্যানিম্যানের আত্মীয়-স্বজন তার প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। চির পরিচিত পরিবেশও তার বিরুদ্ধে চলে যায়। শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে সব সম্পদ উত্তরাধিকারী ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করে, স্ত্রী মাদাম ম্যালানিকে নিয়ে তিনি প্যারিসে চলে যান।
১৭৯০ সাল হোমিওপ্যাথির জন্য স্মরণীয় বছর। এ সময় এডিনবার্গের বিখ্যাত অধ্যাপক, রসায়নবিদ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. উইলিয়াম কালেনের অ ঃৎবধঃরংব ড়ভ ঃযব গধঃবৎরধ গবফরপধ-এর জার্মান ভাষায় অনুবাদকালে ঈড়ৎঃবী চবৎঁনরধহং ড়ৎ চবৎঁনরধহ ইধৎশ অধ্যায়ে ঞড়হরপ বভভবপঃং ড়হ ংঃড়সধপষ মন্তব্যের ওপর গবেষণা চালাতে গিয়েই হোমিওপ্যাথির মূলসূত্র আবিষ্কার করেন হ্যানিম্যান। ১৭৯২ সালের শেষ দিকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করলেও তিনি একই সময়ে হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করতেন ১৮০৫ সাল পর্যন্ত। এরপর থেকে শুধু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মনোনিবেশ করেন তিনি। ১৮০৫ সালে তার লেখা ‘ফ্রাগমেন্টা দ্য ভিরিবাস মেডিকামেন্টোরাম পজিটিভিজ সিভ্ ইন্? স্যানো করপোরি হিউম্যানো অব্জ্যার্ভটিস বা ফ্রাগমেন্টা দ্য ভিরিবাস’ বইটি খুব আলোচিত হয়। ১৭৯২ থেকে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় এবং ১৮৩৫ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন। ১৮১০ সালে ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান প্রকাশ করেন তার অমরগ্রন্থ ‘অর্গানন ডার হেইলকুঁস্ত বা অর্গানন অব মেডিসিন’ যা হোমিওপ্যাথির সংবিধান হিসেবে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের কাছে পরিচিত। এই গ্রন্থের মাধ্যমে হ্যানিম্যান ‘হোমিওপ্যাথি’ নামটি প্রকাশ করেন। এতে রয়েছে হোমিওপ্যাথ চিকিৎসা সম্পর্কিত ২৯১টি সূত্র। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করে ১৮২১ সালে আনহ্যান্টাকিথেনের নগরীর সিউক কর্তৃক সনদ পান এবং ১৮২২ সালে তিনি কিথেনের ইফারস অর্থাৎ কোর্টের কাউন্সিলর উপাধি পান। ১৮৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে লিপজিকে একটি হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল স্থাপন করেন। তিনি প্রায় ১১৬টি বৃহৎ গ্রন্থ ও অসংখ্য ছোট প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে ৪৭টি চিকিৎসা বিদ্যা ও ২৩টি রসায়ন শাস্ত্রের ওপর মৌলিক রচনা। রসায়ন শাস্ত্রে তার রচিত গ্রন্থ ‘ফার্মাসিউটিক্যালস্? লেক্সিকন’ একটি অনন্য গ্রন্থ। তার অপর একটি গ্রন্থ ‘কফির ক্রিয়া’, মৃত্যুর এক যুগ পরও বইটি ফরাসি, ভেনিস, হাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ান, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, ইংরেজি ভাষায় ভাষান্তরিত হয়েছে।
মানবতাবাদী চিকিৎসক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানই প্রথম বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দেন, চিকিৎসা শুধু পেশা নয় জীবনের মহৎ কর্তব্য। হ্যানিম্যান ছিলেন একজন অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসায় ব্যর্থতা দেখে এমডি হয়েও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সুযোগ-সন্ধানীর মতো অর্থ উপার্জনে মনোযোগ না দিয়ে সৎভাবে বাঁচার জন্য অনুবাদ কর্মে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তবু পেশার অমর্যাদা করেননি। মানবজাতিকে রোগযন্ত্রণা থেকে আরোগ্যদানের উদ্দেশে যারা নিজেদের নিয়োজিত করেন তারাই চিকিৎসক। ডা. হ্যানিম্যান নিজে দেহে মতান্তরে ৯০টি থেকে ১০০টির মতো ওষুধ পরীক্ষা করেন। ১৮৪৩ সালের ২ জুলাই রোববার ভোর ৫টায় প্যারিসে নিজ ঘরে ‘রুই দ্য মিলান নং-১’ স্থানে এই সাদা মনের মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক : কলামিস্ট
"




































