সাধন সরকার

  ০১ জুন, ২০২৩

পরিবেশ

গ্রীষ্মের বিমুগ্ধ প্রকৃতি

ষড়ঋতুর রূপে-গুণে সুসজ্জিত আমাদের রূপসী বাংলা। বৈচিত্র্যময় রূপ-রস-গন্ধ বাংলার প্রকৃতি জুড়ে সারা বছরই বিরাজমান। সময়ের পালাবদলে বাংলার এমন বিমুগ্ধ প্রকৃতি পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা-নীকেতন এই বাংলা একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারণ করে। বিমোহিত বাংলার প্রকৃতিতে প্রথমে যে ঋতুর আগমন ঘটে তা হলো গ্রীষ্ম।

প্রকৃতিতে এখন গ্রীষ্মকাল। রূপের পালাবদলে গ্রীষ্মকাল বাংলার বুকে কাঠফাটা রোদ্দুর আর অসহ্য গরম নিয়ে জানান দেয়। কখনো কখনো প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধারণ করে। প্রকৃতি যতই তার অগ্নিমূর্তি ধারণ করুক না কেন বাস্তবে এর তপ্ত প্রকৃতি কোনো না কোনোভাবে সবাইকে মুগ্ধ করে! গ্রীষ্মের খাঁ-খাঁ অবস্থার মধ্যেও প্রকৃতি জুড়ে বয়ে বেড়ায় সবুজ পত্রপল্লবের দুলুনি, বিহঙ্গের শান্ত কূজন, বিস্তৃত খেতজুড়ে সোনালি ধানের ঢেউ ও রং-বেরঙের ফুল-ফলের মন মাতানো ঘ্রাণ। এ সময় বৃক্ষের নিচে ক্লান্ত পথিকের মনজুড়ানোর দৃশ্যও খুব সাধারণ বিষয়। সবুজ পাতারা ত্রাহি পথিককে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে যেন ধন্য হয়। গ্রীষ্মের মতো অপরিসীম নান্দনিকতা আর কোনো ঋতুতে খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রীষ্মের এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখে দিজেন্দ্রলাল রায়ের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে- ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ কবি-সাহিত্যিকরা গ্রীষ্মের রূপবৈচিত্র্যে বিমোহিত হয়েছেন বারবার।

সূর্যকিরণের দাবদাহ নিয়ে সবাই যখন অতীষ্ঠ, তখন হাহাকার করা প্রকৃতিতে চলে বৃষ্টির বন্দনা। গ্রীষ্মে বৃষ্টির বন্দনায় মাতেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রখর তপনতাপে চারদিক যখন ঝলসে যায়, মাঠ-ঘাট চৌচির হয়ে যায়। তখন আকাশে দেখা যায় কালো মেঘের ঘনঘটা। কালবৈশাখী ঝড় যেন তার রুদ্রমূর্তি নিয়ে হাজির হয়। কখনো কখনো বজ্রপাতের দাপট পরিশ্রমী কৃষককে চোখ রাঙায়। নগর জীবনে এক পশলা বৃষ্টিতে ছাদে ছাদে চলে বৃষ্টিবিলাস। এই শুভ্র মেঘ তো পরমুহূর্তে কালো মেঘ থেকে অঝর বর্ষণধারা। গ্রীষ্মে কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে পাকা ধান ঘরে তুলতে।

সবাই গ্রীষ্মের ফুল ও ফলে বিমুগ্ধ হয়। প্রকৃতিপ্রেমীরা হরেক রকমের পুষ্পের বন্দনায় মেতে ওঠে। সবুজের নান্দনিকতার মাঝে শুভ্র, লাল, হলুদের পসরা। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর জনজীবনে অস্বস্তি আনলেও মৌসুমের ফুল-ফলের প্রেমে পড়ে আবিষ্ট সবাই। হরেক রকমের নজরকাড়া ও মনজুড়ানো ফুল ফোটে এ সময়। লাল ও হলুদ রঙের কৃষ্ণচূড়ার সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেয় হলুদ রঙের সোনালু, বেগুনি রঙের জারুল ও হলুদণ্ডলাল রাধাচূড়া। এ ছাড়া কনকচূড়া, গন্ধরাজ, স্বর্ণচাপা, উদয়পদ্ম, গুলাচি, নাগেশ্বর, গুস্তাভিয়া, মধুমঞ্জুরি, লালসোনাইল, কুরচি, মেঘশিরীষ, রক্তিম গুলবাহার, ডুলিচাপা, ঝুমকোলতা, হিজল, বরুণ, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন ফুলের সৌন্দর্যে প্রফুল্লিত হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীর অন্তরের অন্তস্তল। প্রকৃতিপ্রেমীদের বলতে শোনা যায়, বর্ষার ফুল যেমন কদম, তেমনি গ্রীষ্মের মূল আকর্ষণ কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মে লাল কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু ফুলে বিমোহিত হওয়া ছাড়া উপায় কই! জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণচূড়ার প্রশস্তি করেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সোনালু ফুলের প্রেমে পড়েছিলেন। পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে সোনালু ফুলের রেশ থাকে। প্রকৃতির এমন সতেজ ও সাজানো রূপ দেখে গ্রীষ্মের রুক্ষতা ভুলে থাকে সবাই! যেভাবেই হোক এমনকি অযত্নে-অবহেলায় হলেও গ্রীষ্মের ফুলেল রূপ তার সৌন্দর্য জানান দেবেই। গ্রীষ্মের ফুল শুধু সৌন্দর্য বিলায় না কিছু কিছু ফুলের ঔষধি গুণও আছে।

রসালো ফল গ্রীষ্ম ঋতুর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। গ্রীষ্মকাল মানেই চারপাশে মণ্ডম সুঘ্রাণের ছড়াছড়ি। গ্রীষ্ম মানেই সবার কাছে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের সেই টসটসে রসালো ফলের সমাহার। অনেকের কাছে গ্রীষ্ম মানেই শুধু আম, জাম, কাঁঠাল, লিচ, তরমুজ আর আনারসের সেই মিষ্টি মিষ্টি ঘ্রাণ। গ্রীষ্মের ফল খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেননি, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাঙ্গি আর তরমুজ তো তৃষ্ণার্থ প্রাণে এক টুকরো শীতলতার পরশ। কাঁচাপাকা আম আর টকটকে লাল লিচুর স্বাদ শুধু গ্রীষ্মতেই পাওয়া যায়। এ ছাড়া আতা, গাব, খুদিজাম, করমচা, বেল, জামরুল, আমলকী, পেয়ারা, পেঁপে, কলা, নারিকেল, সফেদা, তালশাঁস, লেবু, কামরাঙা, ড্রাগন ফল, ডেউয়া, তৈকর, প্যাশন ফল, কাজুবাদাম, গোলাপজাম, চুকুর, আঁশফল, ফলসা, হামজাম, বৈঁচি, লুকলুকি, বেতফল, মুড়মুড়ি, খেজুর, ননিফল, শরিফা ইত্যাদি গ্রীষ্মকালীন ফল তো রয়েছেই। গ্রীষ্মের ফলফলাদি নিয়ে একে অপরের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আসা-যাওয়া যেন বাংলার প্রাচীনকালের ঐতিহ্য।

গ্রীষ্মকালের দাবদাহ যতই আমাদের অস্বস্তি তৈরি করুক না কেন একবার কী ভেবে দেখেছি যদি গ্রীষ্মকাল না থাকত তাহলে আমরা এত এত ফুল আর ফলের সমাহার কোথায় পেতাম! জ্যৈষ্ঠ মাস এখনো শেষ হয়নি। গ্রীষ্মকাল থাকবে আরো কিছুদিন। তাই তাকে আলিঙ্গন করার পাশাপাশি সৌন্দর্য উপভোগের এখনই সময়।

লেখক : শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী

সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়