reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১৩ অক্টোবর, ২০২১

অবহেলিত গবেষণা তবু সাফল্য

অনেক সাফল্য আছে। তবে গবেষণায় সাফল্য আছে এমন কথা খুব একটা শোনা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা উঠেই গেছে, ইদানীং এমন সংবাদই দিচ্ছে গণমাধ্যম। বাস্তবতাও বলছে সে রকম। কিন্তু মাঝেমধ্যে দু-একটি সংবাদ আমাদের চিত্তকে প্রফুল্ল করছে। করছে আন্দোলিত। যাদের খবরে আমরা আন্দোলিত হচ্ছি, তারা কেউই সমাজের গণ্যমান্য কেউ নন। খুবই সাধারণ। সম্প্রতি এমন একটি উদ্ভাবন আমাদের আন্দোলিত করেছে। নতুন এই উদ্ভাবনের নাম ‘তোগুড়’। গুড়শিল্পে নতুন উদ্ভাবন। তরমুজের রস দিয়ে তৈরি এই গুড়। প্রথমবারের মতো এই গুড় উৎপাদন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ছোটবন্ড গ্রামের কৃষক মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল। সুঘ্রাণ ও সুস্বাদু এই গুড়ের নাম দিয়েছেন ‘তোগুড়’।

আমাদের দেশে খেজুরের রস, তালের রস আর আখের রস দিয়ে তৈরি গুড়ের কথা আমরা জানি। এই গুড় যে আমাদের মিষ্টি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে সে কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিষয়টি সবারই জানা। তবে তোগুড়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় না থাকলেও শিগগিরই পরিচয় ঘটবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। উদ্ভাবনের কথা বলতে গিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি তরমুজের চাষ করছেন। সফলতাও পেয়েছেন। তবে চাষ করতে গিয়ে দেখেন, প্রতি মৌসুমেই কিছু কিছু তরমুজ সাইজে ছোট হচ্ছে। ছোট আকৃতির এই তরমুজ ‘ক্যাট’ নামে পরিচিত। এই তরমুজ বিক্রি করা যায় না। বেশির ভাগ সময় এই তরমুজ মাঠেই থেকে যায়। কিছু অংশ গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

হঠাৎ করেই তার ভাবনায় আসে, খেজুর ও তালের রস থেকে গুড় তৈরি করা গেলে তরমুজের রস থেকে নয় কেন? এই জিজ্ঞাসা থেকেই শুরু। মৃত্যুঞ্জয় এবং তার সহধর্মিণী বিক্রয়যোগ্য নয় এমন ছোট তরমুজ (ক্যাট) দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে গুড় উৎপাদনের চেষ্টা করেন। ২০-২৫ কেজি তরমুজ থেকে পাঁচণ্ডছয় কেজি রস সংগ্রহের পর জ্বালিয়ে গুড়ে রূপান্তর করেন। প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফলতা। দেখতে খেজুরের গুড়ের মতো। মিষ্টি তো বটেই- স্বাদটা মধুর মতো। এ পর্যন্ত তিনি ১০-১২ কেজি গুড় তৈরি করেছেন। প্রথমে পাড়া-প্রতিবেশী ও পরে কৃষি কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্যকে নমুনা হিসেবে দেন। তারা মন্তব্য করেছেন, চমৎকার। এরই মধ্যে কিছু গুড় বিক্রি করেছেন ৩০০ টাকা কেজি দরে।

বিক্রয়যোগ্য নয়, আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া তরমুজ দিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে উৎকৃষ্টমানের গুড় আমাদের মিষ্টির ঘাটতি পূরণে কতটা সহায়ক হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। মৃত্যুঞ্জয় একা পরীক্ষামূলক উৎপাদন করে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মৃত্যুঞ্জয়েরা যখন এ কাজে যোগ দেবেন তখন উৎপাদন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করতে কারো বেগ পাওয়ার কথা নয়। দেশের অর্থনীতিতে এটি হতে পারে একটি বড় মাপের বাড়তি জোগান। এলাকার অনেকেই বলছেন, এটি কৃষি ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন। দেশে গুড়শিল্প দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তাল ও খেজুর বৃক্ষ কমতে কমতে এখন বিরল বৃক্ষে পরিণত হতে চলেছে। গাছিদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গুড়শিল্প পড়েছে হুমকির মুখে। সেই মুহূর্তে তরমুজ সেই ঘাটতি পূরণে একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।

আমরা মনে করি, গুড়শিল্পকে রক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের নানাবিধ সহযোগিতা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করাটা আজ সময়ের দাবি। কেবল তাল ও খেজুর বৃক্ষের বংশ বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। আর, তোগুড় যেহেতু নতুন উদ্ভাবন তার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়াটা যে খুবই দরকার, তা অনুধাবন করতে হবে এবং সরকার তা করবেন।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close