মোহাম্মদ আবু নোমান

  ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

পর্যবেক্ষণ

চরম আস্থার সংকটে ই-কমার্স

ক্ষুধা ও চাহিদার কোনো সীমা আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানীও বের করতে পারেনি। বেঁচে থাকার জন্য একজন মানুষের কত সম্পদ-টাকার প্রয়োজন? একজন পুলিশ কর্মকর্তার সরকারের দেওয়া যথেষ্ট বেতন, বোনাস, রেশন, পোশাক ছাড়াও সম্মান, ক্ষমতা, সবকিছুই থাকে। অবসরের পরও পেয়ে থাকেন অনেক টাকা। তারপরও তিনি আরো চান! এক জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে কত টাকার প্রয়োজন? সম্প্রতি দেশ ছেড়ে পালানোর পর ভারতে গ্রেপ্তার ঢাকার বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানার চারটি দেশসহ বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে। তার এ বিপুল সম্পদের কথা শুনে খোদ পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিস্মিত। এই সোহেল রানা আলোচনায় আসেন ই-অরেঞ্জ নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হওয়ার পর। ওই মামলায় তার বোন সোনিয়া মেহেজাবিন ও ভগ্নিপতি মাসুকুর রহমান এখন কারাগারে। তার চতুর্থ স্ত্রী নাজনীন নাহার (বীথি) পলাতক।

একজন শেখ সোহেল রানার কত সম্পদ প্রয়োজন! সে কত বছর ধরে ডিএমপিতে কর্মরত? ডিএমপির বাইরে তার বদলি হয়নি কেন? কাকে কীভাবে ম্যানেজ করে সে ঢাকাতেই পোস্টিং ধরে রেখেছিল? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, শুধু সোহেল রানাই নয়- এরকম অনেক সরকারি কর্মকর্তাই একেকটা সম্পদের খনি! মনে হচ্ছে পুলিশ বিভাগের কোনো জবাবদিহি নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সরকারি চাকরি করা অবস্থায় ই-কমার্সের মতো প্রতারণামূলক ব্যবসায় জড়িয়ে হাজার কোটি টাকা নিয়ে ভারতে পালিয়ে গেল। বিষয়টি কখনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নজরে আসেনি! বিষয়টিকে ভৌতিক বা অন্য কিছু ভাববার অবকাশ নেই।

সামান্য একজন এসআই যদি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান তবে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। বিষয়টি শুধু পুলিশ ডিপার্টমেন্টের জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্যও অত্যন্ত লজ্জাকর। বলা হয়ে থাকে কিছু পুলিশ সদস্যের জন্য পুরো পুলিশ বিভাগকে দোষারোপ করা ঠিক না। কিন্তু এই ‘কিছু’ যখন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ হয় তখন পুরো ডিপার্টমেন্ট সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু হবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের ঘুনে ধরা সমাজ এবং রাজনৈতিক কাঠামোয় এরকম সোহেল রানার সংখ্যা অগণিত। যেকোনো থানায় গেলেই সেটা টের পাওয়া যায়।

সোহেল রানা এক দিনে এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কোনো প্রভাবশালী মহলের মদদ ছাড়া এত বছর ধরে তিনি অনিয়ম চালিয়ে যেতে পারেন না। এটাই সবার বিশ্বাস। সদ্য বরখাস্ত বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানা চোরাই পথে পালাতে গিয়ে ভারতে আটক হওয়ার পর তার ‘সম্পদের পাহাড়’ সম্পর্কে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে নিছক বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সোহেল রানা বা প্রদীপের মতো বড়সড় অঘটন না ঘটালে এদের ব্যাপারে তাদের কর্তারা কিছুই জানেন না। সম্ভবত এটাই পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কালচার। আগেও দেখেছি, এখনো দেখছি, ভবিষ্যতেও দেখব বলেই আশা রাখছি।

‘ডাবল ভাউচার’ অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেয় ‘ই-অরেঞ্জ’। অফারের ভাষ্য, কেউ এক লাখ টাকা জমা দিলে দুই লাখ টাকার ভাউচার পাবেন। ওই ভাউচার দিয়ে আমানতকারী প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্য কিনতে পারবেন। কিন্তু দ্বিগুণ অর্থের পণ্য কেনা তো দূরের কথা বরং মূল অর্থেই গ্রাহকরা পণ্য বুঝে পাচ্ছেন না। বর্তমানে পৃথিবীতে অনলাইন শপিং একটি দারুণ কম্পিটিশন মার্কেট। কোন কোম্পানি কত দ্রুত প্রোডাক্ট ডেলিভারি ও সেবা দিবে এ প্রতিযোগিতা। আর আমাদের দেশে মাসের পর মাস বসে থাকার পরে শোনা যায় পণ্য আসবে না! বিশ্বে অনলাইন ব্যবসায়ীরা সততা, আস্থা, স্বচ্ছতা ও দ্রুত হস্তান্তরের কম্পিটিশন করে। আর আমরা আছি চুরি ও ফাঁদের প্রতিযোগিতা নিয়ে! ই-অরেঞ্জ ও ইভ্যালিকে কোনোভাবেই ‘ই-কমার্স’ বলে মনে করা যায় না। বিশ্বে এমন কোনো ই-কমার্স কোম্পানি নেই যাদের পণ্য ডেলিভারিতে দুই থেকে ছয় মাস লাগে। আবার কোনো কেনো ক্ষেত্রে বছর ফুরিয়ে গেলেও পণ্য ডেলিভারি দিতে পারে না।

মূল্য ছাড়ের লোভনীয় অফারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কিছু মানুষ। ১০০ টাকার পণ্য ৯০ টাকায় কেনা যায়, কিন্তু ৬০ টাকায় কেনা যাবে না। সর্বসাধারণের বুঝতে হবে এখানে নিশ্চয় কোনো ফাঁকফোঁকর ও ঝামেলা আছে। এটা সাধারণ জ্ঞানের বিষয়। এ ছাড়া ই-ভ্যালি ও ই-অরেঞ্জের সঙ্গে মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতাহীন যেসব সেলিব্রেটি যোগ দিয়ে, অ্যাম্বাসেডর হয়ে মানুষকে এখানে ইনভেস্ট করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উদ্বুদ্ধ করলেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। আমরা মনে করি, তারা কোনোভাবেই সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়াতে পারেন না। অতীতে ইসলামিক ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেড (আইটিসিএল), যুবক ও ডেসটিনিসহ বিভিন্ন এমএলএ প্রতিষ্ঠান সেবা ও ব্যবসার নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে এসেছে। কিন্তু অতীত ঘটনা থেকে আমরা কোনোভাবেই শিক্ষা গ্রহণ করিনি বরং অস্বাভাবিক, চমকপ্রদ ও লোভনীয় অফারে বারবারই প্রলুব্ধ হয়েছি।

বাংলাদেশে বর্তমানে অনলাইনে কী কী পণ্য কেনাবেচা হয় না বলে, বলতে হবে কী নেই সেখানে। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, পোশাক, প্রসাধনী ও কসমেটিকস এসব তো নস্যি। এগুলো পুরোনো খবর। যারা সময়ের স্বল্পতার জন্য ছোট মাছ কাটতে পারেন না, সবজি সঠিক সাইজে কাটতে পারেন না তাদের জন্য চালু হয়েছে রেডি টু কুক নামের এক ধরনের উদ্যোগ। সেখানে মাছ, গরু-ছাগলের বট, কেটে, ধুয়ে, পরিষ্কার করে রান্নার উপযোগী করে ডেলিভারি দেওয়া হয়। বলতে গেলে জীবনযাপন সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে যত ধরনের পণ্য ও সেবা প্রয়োজন তার সবই এখন অনলাইন বিজনেসের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা প্রদান করে যাচ্ছেন। খাবার, শাক-সবজি, ফল, মাছ, গোশত, গরু, ছাগল, শুঁটকি থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ঘরে বসে অনলাইনে পণ্য কেনাকাটা বা ই-কমার্স ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর গোটা খাতটি এখন ভুগছে আস্থার সংকটে।

ই-কমার্সে ভোক্তার আস্থা সবচেয়ে বড় শর্ত। কিন্তু এমন অঘটন ঘটলে মানুষ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারাবে যা এই শিল্পকে ক্ষতির মুখে ফেলবে বলে। আমাদের দেশের ইলেকট্রনিক কমার্স বা ই-বাণিজ্য এখন অকল্যাণের অনুসঙ্গেও রূপ নিয়েছে। শ্রেণি বিশেষের কারণে পুরো পদ্ধতিকেই এখন সন্দেহের চোখে দেখছে সাধারণ মানুষ। অনলাইনে পণ্য বিক্রিতে ব্যবসার পদ্ধতি, ধরন একসময়ের আলোচিত এমএলএম কেলেঙ্কারির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। বড় অঙ্কের ক্যাশব্যাক, অফারের নামে ক্রেতাকে সময়মতো পণ্য না দেওয়া ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অর্থ না দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালিসহ অন্তত ১৫ প্রতিষ্ঠান।

টেকসই ব্যবসায় এবং ক্রেতা স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কোম্পানির সম্পদ ও দায়ের অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে এটি আরো জরুরি বিষয়। কারণ এতে পণ্যের উৎপাদক বা সরবরাহকারী এবং ভোক্তারা সরাসরি অংশীজন। কোম্পানির সম্পদের তুলনায় দায় অধিক হারে বেড়ে গেলে একদিকে উৎপাদক বা সরবরাহকারীকে তাদের পাওনা সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে দেওয়া সম্ভব হয় না, অন্যদিকে সঠিক সময়ে মানসম্মত পণ্যটি পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই দীর্ঘ সময় ক্ষতি নিয়ে চলতে পারে না। যার বাস্তব উদাহরণ ই-ভ্যালি।

বাংলাদেশে ই-কমার্সের কার্যক্রম যেভাবে ধোঁকা ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে গেছে, তাতে শিগগিরই বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়ে নেবে। ই-কমার্সের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধন করেছে। ইউরোপের আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান কিউবি বাংলাদেশের বাজারে আসার আগ্রহ নিয়ে স্বল্প পরিসরে কাজ করছে। চীনের আরেক বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান টেনসেন্টও বাংলাদেশের বাজারে আগ্রহী। ই-কমার্স সময়ের চাহিদা। মানুষ ই-কমার্সে যাচ্ছে। প্রচলিত ব্যবসার জায়গা করে নেবে ই-কমার্স। এজন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত হতে হবে। তা না হলে নতুন বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়ে নেবে। দেশীয় ব্যবসায়ী ও পুঁজির জন্য যা সুনামি ডেকে আনতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

www.nobosongbad.com

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close