মুক্তমত

দূর করতে হবে প্রবাসীদের দুর্ভোগ

খায়রুজ্জামান খান

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

পরিবারের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখতে কারাবিহীন কারাগারে বন্দি যাদের জীবন নাম দিয়েছি তাকে প্রবাসজীবন। অচিন ঠিকানার খোঁজে কেউ দুবেলা পরিবারের মুখে আহার তুলে দিতে কেউবা পরিবারের সব সদস্যের চাওয়া-পাওয়া মেটাতে পাড়ি জমান প্রবাসে। প্রবাসজীবন মানে পরিবারের মানুষ থেকে দূরে এক অনিশ্চয়তার জীবনে পদার্পণকেই বোঝানো হয়ে থাকে। হতাশা, দুর্দশা, অসুস্থতায় কেউ যেন নেই পাশে। কখনো আত্মীয়স্বজন কখনোবা বাবা-মা, ছেলেমেয়ের মৃত্যুতে হয় না শেষবারের মতো দর্শন। শত অসুস্থতার মাঝেও এক দিন কর্মস্থলে না গেলে পরিবারের কী হবে ভেবেও নিজেদের সুখ-দুঃখ ভুলে চলে যায় কর্মস্থলে আয়-রোজগারের তাগিদে। ১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। ঠিক তখন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি। সোনায় মোড়ানো দেশ শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করার পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আজ লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে পৃথিবীর বৃহৎ অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪১তম। ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘দ্য লং ভিউ : হাউ উইল দ্য গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার চেঞ্জ বাই ২০৫০।’ এখানে বলা হয়েছিল, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হবে বিশ্বে ২৩তম।

যার পেছনে প্রধান অবদান রেখে আসছে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ। প্রবাসী এসব শ্রমিক যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন, তা দেশের মোট রফতানি আয়ের অর্ধেক। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ ১০টি মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। তার মধ্যে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল অন্যতম। অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেমিট্যান্সের অবদান মোট জিডিপির ১২ শতাংশের মতো। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।

কোভিড-১৯-এর কারণে জনজীবনে দুর্ভোগ যেন কমছেই না। বেকারত্বহীনতায় ভুগছে যখন যুবক; ঠিক তখন পাড়ি জমিয়েছিল প্রবাসে বেকারত্ব দূর করতে। এখন যেন সেই আশাটাও নেই। ১৯৭১ সালের পর এ পর্যন্ত ১ কোটি ২৫ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসে গিয়েছেন। বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিয়োজিত করেছেন নিজেকে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। প্রবাস থেকে আসা লক্ষাধিক বাঙালি ফিরতে পারছেন না কর্মস্থলে, চাকরিচ্যুত হয়েছেন লক্ষাধিক প্রবাসী। কর্মহীনতায় ভুগছেন। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের। রেমিট্যান্স হলো দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং উন্নয়নের ভিত্তি ও অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশের অর্থনীতির চাকা যেখানে অচল হয়ে পড়ার দিকে ধাবিত হচ্ছিল ঠিকই ভূমিকা রেখে চলেছে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। করোনাভাইরাসের প্রকোপের মধ্যে জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য অনুযায়ী রেমিট্যান্স এসেছে ২৫৯ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। একক মাস হিসেবে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এযাবৎ কালের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮২০ কোটি ডলার বা ১৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিরা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। তৈরি পোশাকের পরে অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থান; যা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। ২০২০ সালের ১৫ জুন বা সাড়ে ছয় মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১ হাজার ৩০ কোটি (১০.৩৬ মিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

দেশের উন্নয়ন যেখানে রেমিট্যান্স আহরণবিহীন যায় না, ভাবা সেখানে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কথা হয় না ভাবা একবারও। অন্তত ৪ কোটি মানুষের জীবিকা প্রবাসের প্রেরিত অর্থের ওপর নির্ভরশীল। পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল খুললেই চোখের সামনে ভাসে প্রবাসীদের দুর্ভোগের কথা। বর্তমান সময়ে যেন দুর্ভোগের নেই সীমা। দেখা যায় মানব পাচারমূলক জঘন্য অপরাধ। সৌদি আরব, কুয়েত যেখান থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ হতো দেশের, সেখানে চাকরিচ্যুত সম্ভাবনা রয়েছে অনেকের আবার অনেকে আটকে আছেন নিজ দেশে। সৌদি আরব থেকে করোনাকালে বা তার আগে আসা অনেক শ্রমিক আটকে পড়েছেন নিজ দেশে। পারছেন না ফিরে যেতে কর্মস্থলে। প্রবাসে অনেকের আকামা, ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। আকামাবিহীন তারা কর্মস্থলে যেতে পারবেন না। পুলিশ দ্বারা নাজেহাল অবস্থায় পড়তে হবে। দেশে চলে আসতে হবে।

এদিকে ভিসার মেয়াদ শেষ বা ভিসা লাগানোর পর যেতে পারছেন না লক্ষাধিক মানুষ। দেশে ফিরতে তাদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। আইনি জটিলতার পাশাপাশি তাদের মূল্যায়ন করা হয় না সঠিকভাবে। বর্তমানে সৌদিতে যাওয়ার টিকিট নিয়ে ভোগান্তির যেন শেষ নেই। দুই দিন হয়ে এলেও টিকিট মিলছে না অনেকের। আকামার মেয়াদ ২৪ দিন বৃদ্ধি করা হলেও বিশ্বস্ততার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি কমাতে ইতিবাচক দিক হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে যেখানে প্রবাসীরা; সেখানে নতুন করে বেকারত্বের হার তীব্রতর হয়ে না উঠুক সেই প্রত্যাশায় প্রবাসীদের সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্ভোগ লাঘব করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

 

 

"