বিশ্লেষণ

জাগ্রত হোক মানবিকবোধ

রায়হান আহমেদ তপাদার

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

করোনাভাইরাসসহ অসংখ্য ভাইরাসের উৎপত্তি ইতিহাস ও ধ্বংসযজ্ঞ, করোনা সবকিছুকে পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এমন মহাবিপর্যয় সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে কখনোই হয়নি। আগে বিভিন্ন বিপর্যয়ে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সেই বিপর্যয় ও প্রাণহানি সীমাবদ্ধ ছিল বিশেষ কিছু অঞ্চলে। সমগ্র পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় সৃষ্টিকারী এমন দৃশ্য কখনো এভাবে দেখিনি সভ্য জগতের মানুষ। করোনার করুণমৃত্যু মনে হচ্ছে নরকের আগুনে পুড়ছে মানুষ, নেই কোনো সাহায্যকারী ও সাহায্য করার অভিপ্রায়। একটি ভাইরাস একটি আতঙ্ক, শুধু আতঙ্ক নয় অকল্পনীয়, অচিন্তনীয় আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। এমন একটি ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলবে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তির সভ্যতাকে বিপন্ন করবে সব দাম্ভিকতাকে ধূলিসাৎ করবে এমনটি কিছুদিন পূর্বেও সভ্য জগতের মানুষ উর্বর মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তাও করেনি। বর্তমানে একটি অদৃশ্য ভাইরাসের থাবায় মানুষকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে, অসহায় করে দিয়েছে সব বুদ্ধিদীপ্ত অহংকার। এখনো পর্যন্ত কোনো বিশেষজ্ঞ এমন কোনো তত্ত্ব উদ্ভাবন করতে পারেননি, যেই উদ্ভাবনী শক্তি হতে পারে একটা বাস্তবমুখী কার্যকরী সমাধান। করোনাভাইরাস পৃথিবীজুড়ে চলতে থাকা এ মুহূর্তে ভয়াবহ এক মহামারির নাম। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই ভাইরাস। উঁচু থেকে নিচু, ধনী থেকে গরিব কেউ রক্ষা পাচ্ছেন না এই ভাইরাসের করালগ্রাস থেকে। মানবজাতি কখনো ভাবতেই পারেনি তাদের জীবনে এমন ভয়, এমন আতঙ্ক বিরাজ করবে। এমন অসহায় অবস্থায় পড়তে হবে তাদের! অহংকার, প্রাচুর্য, দম্ভ প্রভৃতি শব্দগুলোকে যেন দুমড়ে-মুচড়ে একাকার করে দিয়েছে এই করোনা নামের ভাইরাস।

মানবজাতি এমন এক যুদ্ধে নেমেছে, যেখানে শত্রুকে দেখা যায় না। কখন কোথা থেকে শত্রু এসে তাকে আক্রমণ করবে, তাও সে জানে না। মানবজাতি আজ কত অসহায়! কত অগ্রসর বিজ্ঞান, কত উন্নত প্রযুক্তি, কোথায় আজ? একটি ভাইরাস লন্ডভন্ড করে দিয়েছে মানবজাতির সব অর্জন। ঠিক এমনই এক অসহায় মুহূর্তে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন মানবিকতার, প্রয়োজন সহমর্মিতার। প্রশ্ন তাই থেকেই যাচ্ছে এমন ক্রান্তিলগ্নে কতটুকু মানবিক হতে পেরেছে মানবসমাজ? করোনা-পূর্ব পৃথিবী ছিল হিংসা-বিদ্বেষপূর্ণ সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় ভরা যুদ্ধবিগ্রহের চারণভূমি। করোনা-পূর্ব পৃথিবীতে আমরা দেখেছি যুদ্ধের ডামাডোল। শক্তিশালী দেশগুলো কোনো নিয়মনীতি, আন্তর্জাতিক আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে তাদের স্বার্থসিদ্ধি উদ্ধারের জন্য দুর্বল দেশগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে সেসব দেশে তাদের সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করেছে। গণতন্ত্র রক্ষার নামে গণতন্ত্র হরণ করেছে। তাদের ক্ষমতার দাপটের কাছে অসহায় ছিল বিশ্ব মোড়ল সমাজ। সাক্ষী গোপালের ভূমিকা পালন করেছে জাতিসংঘ। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে অভিবাসীদের ভয়াবহ দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। একজন নিষ্পাপ শিশু আইলান কুর্দির করুণমৃত্যু নাড়া দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। নির্মমভাবে সাগরের বেলাভূমিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে মানবতা। সবাই ব্যথিত হৃদয়ে প্রত্যক্ষ করেছে আইলান কুর্দির নিথর লাশ। কে জানে আরো কত বাবার আইলান যুদ্ধের ঝড়োহাওয়ায় হারিয়ে গেছে চিরতরে না ফেরার দেশে। মানবতার এমন করুণমৃত্যুতেও কথিত বিশ্ব মোড়লদের হৃদয় টলেনি।

এমন নির্দয় ঘটনায় বিবেকবান মানুষ স্তম্ভিত হলেও জাগ্রত হয়নি তথাকথিত বিশ্ববিবেক। বিশ্ববাসী দেখেছে দেহের বিনিময়ে ত্রাণ নিতে হয়েছে সিরীয় নারীদের। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল সিরিয়ার লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার একটি মূল্যায়ন করে। তাতে বলা হয়, সেখানে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়ে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভয়েসেস ফ্রম সিরিয়া ২০১৮ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে কর্মকর্তারা খাবারের বিনিময়ে ‘যৌনসেবা’ নিতে অল্প সময়ের জন্য নারীদের বিয়ে করছেন। ত্রাণ পেতে অনেক নারীকে ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাত কাটাতে হচ্ছে। করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে পৃথিবী এক নরকে পরিণত হয়েছিল। মানুষ এহেন কোনো কুকর্ম নেই করেনি, এহেন কোনো বাজে পরিস্থিতি ছিল না যার উদ্ভব মানুষ ঘটায়নি। তার পরের ইতিহাস করোনার আগমনের ইতিহাস। করোনার আগমনের পর মানুষ চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতে শুরু করে, বাড়তে থাকে লাশের মিছিল। এক প্রকার অসহায় আত্মসমর্পণ করে মানুষ করোনাভাইরাসের কাছে। এমন অসহায় অবস্থায় যখন তার সবচেয়ে মানবিক হওয়ার কথা ছিল। যখন সুযোগ ছিল সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে নরকে পরিণত হওয়া পৃথিবীকে স্বর্গে পরিণত করার সেসময় মানবজাতি কি তা করতে পেরেছে? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সেই সময়েও মানবজাতি সর্বোচ্চ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। করোনাকালীনও আমরা দেখেছি পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো করোনাকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে, পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়েছে ঘৃণা।

এমনকি করোনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এক ভয়াবহ মাত্রা ধারণ করেছে। করোনা বিস্তারের কারণ হিসেবে এক ধর্ম অন্য ধর্মকে দোষারোপ, এক গোত্র অন্য গোত্রকে দোষারোপের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। সুযোগ নিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়েদা। জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা কোভিড-১৯ নিয়ে ছয় পৃষ্ঠার একটি নির্দেশনা ও বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়, ‘করোনা গোটা দুনিয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন, যন্ত্রণাদায়ক ছায়া ফেললেও মুসলিম বিশ্বে ভাইরাসটি প্রবেশ করার কারণ হলো মুসলিম দেশগুলোতে পাপ, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় বেড়ে গেছে। তারা বলেছে, সঠিক ধর্মবিশ্বাসকে ছড়িয়ে দিতে, মানুষকে আল্লাহর পথে জিহাদের আহ্বান জানাতে এবং দমন ও দমনকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে করোনা সংকটকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। করোনাকালেও থেমে থাকেনি নারী ও শিশু নির্যাতন। ৯ বছরের শিশু, প্রতিবন্ধী বালিকা কিশোরী, গৃহবধূ এমনকি ৭০ বছর বয়সি বৃদ্ধা কেউ রক্ষা পায়নি এই ধর্ষকের করাল থাবা থেকে। শুধু ঘরের বাইরে নয়, ঘরের ভেতর পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে করোনাকে কেন্দ্র করে। জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএফপিএ এবং এভেনার হেলথ, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশে গত তিন মাসের লকডাউনে পারিবারিক সহিংসতা ২০ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি করোনা আক্রান্ত রোগীকে কেন্দ্র করে মানুষ চরম অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে।

যে সময়ে মানুষের সহমর্মিতা সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সমাজছাড়া করা হয়েছে, ঘরছাড়া করা হয়েছে, সন্তান তার পিতামাতাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছে, পিতামাতা তার সন্তানকে ত্যাগ করেছে। কেউ করোনা আক্রান্ত হলে তাকে সাহায্যের হাত বাড়ানোর বদলে তার জাত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বিশ্লেষণ করে কুৎসিত এক সাম্প্রদায়িক নোংরামিতে মেতে উঠেছে মানুষ। তার চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে এই করোনা পরীক্ষার রিপোর্টকে কেন্দ্র করে যে কুৎসিত নোংরামি ও চূড়ান্ত অমানবিকতা আমরা দেখেছি তা মানব ইতিহাসে বিরল! এহেন কোনো কুকর্ম নেই যে এই করোনার সময় ঘটেনি। মানুষের অস্তিত্ব সংকট ও তার মনে বিন্দুমাত্র মানবিকতাবোধ জাগাতে পারেনি। যে সমাজে মানবিকতাবোধ নির্বাসনে যায়, সেই সমাজে সভ্যতা বিপন্ন হয়ে ওঠে। সেই সমাজ হয়ে ওঠে বসবাসের অযোগ্য এক অসভ্য বর্বর সমাজ। কিন্তু আসল কথা হচ্ছেÑ সমাজে প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভালো এবং মন্দের দ্বন্দ্ব থাকবে। আর এটাই স্বাভাবিক। সকল খারাপ বা মন্দকে পরিহার করে ভালো বা সৎ কর্মকে বেছে নেওয়া, ভালো পথ অনুসরণ করা মনুষ্যত্বের অন্যতম কাজ। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু এই মানুষই আবার কর্মের কারণে বর্তমান সময়ে সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব বলে পরিগণিত। যে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ থাকে না, তাকে মানুষ বলা যায় না। মানুষ বলতে মানুষের ভেতর মানবীয় গুণ থাকতে হয়। মানবিক আচরণ থাকতে হয়। শুধু মনুষ্যকূলে জন্ম নিলেই মানুষ হওয়া যায় না।

মূল কথা হচ্ছে, মানুষ হতে হলে মানবিক গুণ, নৈতিকতা, সহিষ্ণুতা থাকতে হয়। চিন্তাচেতনার বিকাশ, বিবেকবোধ, কান্ডজ্ঞান আর বিচার-বুদ্ধির ক্ষমতার কারণে মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মানুষ মনুষ্যত্বের অধিকারী হবে সেটাই স্বাভাবিক। মানবতা বা মনুষ্যত্ববোধ না থাকলে মানুষ কখনই মানুষ নয়। কিন্তু বর্তমানে প্রাত্যহিক লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, উগ্রতা, স্বার্থপরতা, ক্রোধ প্রভৃতি কারণে মানুষের মনুষ্যত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। এক কথায় মনুষ্যত্ব আজ নির্বাসনে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"