reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ৮ ঘণ্টা আগে

মানবসেবার প্রত্যয়ে ভবিষ্যৎ চিকিৎসক ডাক্তার সিফাতুল্লাহ

চিকিৎসকরা আমাদের জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তারা সাহস, দক্ষতা ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাদের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগ ও সেবার মনোভাব অসংখ্য মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালায়। একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু রোগ নিরাময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সুস্থ সমাজ গঠন, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানবতার সেবায় নিজেকে নিবেদিত রাখাও তার অন্যতম প্রধান কর্তব্য। মানুষের জীবন রক্ষা, কষ্ট লাঘব এবং মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার এই মহান দায়িত্ব চিকিৎসকদের সমাজে অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। এমনই একজন অদম্য স্বপ্নযোদ্ধা, মানবসেবার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা ভবিষ্যৎ চিকিৎসক সিফাতুল্লাহ। তার স্বপ্ন, সংগ্রাম, চিকিৎসক হওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মানবসেবার প্রতি অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেছেন ফাহিমা আক্তার

মেডিকেলে ভর্তির স্বপ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আপনার যাত্রার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় কোনটি এবং কেন?

মেডিকেলে ভর্তির স্বপ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার যাত্রার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল প্রফেশনাল পরীক্ষাগুলোর সময়। কয়েকবার পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় আমাকে পুনরায় প্রস্তুতি নিতে হয়েছে এবং এক বছরের সেশন লসও হয়েছে। সেই সময় মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা- সবকিছু একসাথে মোকাবিলা করতে হয়েছে।

তবে এই কঠিন সময়ই আমাকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছে। আমি শিখেছি যে ব্যর্থতা শেষ নয়; ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং ধারাবাহিক পরিশ্রম থাকলে আবারও উঠে দাঁড়ানো যায়। আজ আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী এবং একজন ভালো চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে আরো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন এই যাত্রায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন আমার মেডিকেল জীবনের পুরো যাত্রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কঠিন সময়ে তাদের মানসিক সাহস, উৎসাহ এবং বিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। যখন পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা বা ব্যর্থতার কারণে হতাশ বোধ করেছি, তখন পরিবারের ভালোবাসা এবং বন্ধুদের অনুপ্রেরণা আমাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে শুধু নিজের পরিশ্রম নয়, পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখে। তাদের সমর্থনই আমাকে প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে আমার লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে চলার শক্তি জুগিয়েছে।

একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার চাপ, মানসিক ক্লান্তি ও ব্যক্তিগত জীবন এই তিনটির মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন?

একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা, মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়। আমি সময়কে পরিকল্পিতভাবে ভাগ করার চেষ্টা করি, যাতে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের জন্যও কিছু সময় রাখতে পারি। অতিরিক্ত চাপ অনুভব করলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাই এবং প্রয়োজনে নিজের অনুভূতিগুলো তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই।

আমি বিশ্বাস করি, একজন ভালো চিকিৎসক হতে হলে শুধু একাডেমিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও সুস্থ থাকা জরুরি। তাই নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি। এই ভারসাম্যই আমাকে দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগী, ইতিবাচক এবং লক্ষ্যপূরণে অনুপ্রাণিত রাখে।

এমন কোনো মুহূর্ত কি এসেছে, যখন মনে হয়েছে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়? সেই সময় নিজেকে কীভাবে সামলে নিয়েছিলেন?

হ্যাঁ, এমন মুহূর্ত আমার জীবনেও এসেছে। বিশেষ করে প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া এবং বারবার নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় অনেকবার মনে হয়েছে, হয়তো আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম এবং নিজের সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন জেগেছিল।

কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। পরিবারের সমর্থন, বন্ধুদের উৎসাহ এবং নিজের লক্ষ্যকে মনে রেখে আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেছি। আমি বিশ্বাস করেছি যে ব্যর্থতা সফলতার শেষ নয়, বরং শেখার একটি ধাপ। ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং নিয়মিত পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই কঠিন সময় অতিক্রম করেছি। আজ সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে আরও দৃঢ়, পরিণত এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেছে।

একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর ত্যাগ ও সংগ্রাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কী জানা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

আমার মনে হয়, সাধারণ মানুষের জানা উচিত যে একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর পথ শুধু বই পড়ার নয়- এটি দীর্ঘ ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম এবং মানসিক দৃঢ়তার একটি যাত্রা। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, অসংখ্য ঘণ্টা পড়াশোনা, ক্লাস, ওয়ার্ড, ডিউটি এবং পরীক্ষার চাপের মধ্যেও আমাদের শেখার প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য নয়, ভবিষ্যতে মানুষের জীবন রক্ষা করার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। তাই এই যাত্রায় অনেক ব্যক্তিগত আনন্দ, অবসর এবং পারিবারিক সময় ত্যাগ করতে হয়। আমি মনে করি, সমাজ যদি এই পরিশ্রম ও ত্যাগকে আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করে, তাহলে চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি এবং সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে একজন ভবিষ্যৎ চিকিৎসক হিসেবে আপনার ভূমিকা কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

আমি মনে করি, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন ভবিষ্যৎ চিকিৎসক হিসেবে আমার প্রথম দায়িত্ব হবে প্রতিটি রোগীকে তার আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নয়, মানবিকতা ও সমান মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসা করা।

দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে আমি সৎ, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করব। প্রয়োজন হলে তাদের কম খরচে কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প সম্পর্কে পরামর্শ দেব, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও উপলব্ধ সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে জানাব এবং সুযোগ পেলে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব।

আমি বিশ্বাস করি, একজন ভালো চিকিৎসকের পরিচয় শুধু তার চিকিৎসা দক্ষতায় নয়, বরং তার মানবিকতা, সততা এবং সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায় প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

আমার মতে, বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সমস্যা-ভিত্তিক (Problem-Based Learning) ও দক্ষতানির্ভর (Competency-Based) শিক্ষা আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, আধুনিক সিমুলেশন ল্যাব, গবেষণার সুযোগ এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে।

এছাড়া ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণকে আরো হাতে-কলমে ও রোগীকেন্দ্রিক করা, নিয়মিত দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা এবং যোগাযোগ দক্ষতা, চিকিৎসা-নৈতিকতা ও গবেষণার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমি বিশ্বাস করি, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা আরো আধুনিক, দক্ষ এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যারা ভবিষ্যতে মেডিকেলে পড়তে চায়, তাদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কী?

যারা ভবিষ্যতে মেডিকেলে পড়তে চায়, তাদের জন্য আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো- শুধু ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নয়, মানুষের সেবা করার মানসিকতা নিয়েই এই পথে আসুন। মেডিকেলের পথ দীর্ঘ, কঠিন এবং চ্যালেঞ্জে ভরা। তাই ধৈর্য, অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসÍএই চারটি গুণ সবসময় সঙ্গে রাখতে হবে।

পড়াশোনার পাশাপাশি মানবিকতা, সততা, সহমর্মিতা এবং রোগীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন, একজন ভালো চিকিৎসকের পরিচয় শুধু তার জ্ঞান দিয়ে নয়, তার ব্যবহার, নৈতিকতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।

স্বপ্নকে লক্ষ্য বানিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে যান। একদিন আপনার পরিশ্রমই আপনাকে একজন দক্ষ, মানবিক এবং সম্মানিত চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়