মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

  ৯ ঘণ্টা আগে

জীবন-জীবিকা

প্লাস্টিকের দাপটে বাঁশ-বেত শিল্পীর পেশা হুমকিতে

একসময়ের আবহমান গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ছিল বাঁশ শিল্প। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠে কুটির শিল্প। ঘর ও গৃহস্থালীর কাজে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার দিনের পর দিন বেড়ে চলায় বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিনে দিনে কমছে। তারপরেও অনেকেই এখনো এই পেশাটিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তারা বলছেন, এটা তাদের বাপ-দাদার পৈতৃক পেশা। আবার অনেকে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায়ও চলে যাচ্ছেন। তাদের পেশা এখন টিকে থাকার হুমকিতে রয়েছে।

এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাঁশের পরিবর্তে প্লাস্টিকের তৈরি ডালা, কুলা, চালুন, ধান ও চাল রাখার জন্য প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার হচ্ছে বেশি। ফলে গ্রামের মানুষের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তৈরি ধানের গোলা, ডালি, কুলা, মাছের খলই ও মাছ ধরার পলো, টুশি, বাঁশের তৈরি পাখা ইত্যাদির জায়গা দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিক। হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি মাছ ধরার বিভিন্ন যন্ত্র ও বিয়ে বাড়ির চাইলোন, বিয়ে বাড়িতে ফোঁড়ন ডোবানোর চালা ও হাত পাখার কদর। তবে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহারের ফলে এ পেশাটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। গ্রাম বাংলার বাঁশের তৈরি ঢুলি ও ঢাকি কুলার চাহিদা কমে গেলেও সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায় ও নওগাঁহাট, নাটোরের চাচকৈরহাটসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে এসব জিনিসপত্র এখনো পাওয়া যায়।

পৌরসভার অন্যান্য এলাকার ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তৈরি ধানের ঢুলি, মাছ ধরার পলো, খলাই, ঢাকি, কুলা, বিয়ে বাড়ির চাইলন, খাঁচা, দাঁড়িপাল্লা, ডারকি, ঢুশিসহ মাছ ধরার বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি করা হয়।

সরেজমিন এ প্রসঙ্গে কথা হয় ক্লান্ত ফেরিওয়ালা সুধির চন্দ্রের (৫৮) সঙ্গে। তিনি বলেন, এ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে ৪০টি বছর পার করে দিয়েছি। এখনো রোজ সকালে বাঁশের তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি করে কাঁধে ঝুলিয়ে গ্রামে গ্রামে হাঁকডাক দিয়ে ফেরি করে বেড়ায়। বর্তমানে বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো এ কাজে তেমন একটা ভালো লাভ হয় না। অন্য কাজ করতে পারি না তাই এ কাজই আঁকড়ে ধরে আছি। আগে গ্রামের প্রতিটি পরিবারেই বাড়ির পতিত জমিতে বাঁশের ঝাড় ছিল। তাতে নিজের চাহিদা মিটিয়ে বছরে অনেক টাকার বাঁশ বিক্রি করত। তখন বাঁশের দাম ছিল কম। বর্তমানে এলাকায় বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে অনেক। তাই বাঁশের মূল্য ও শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব জিনিস বিক্রি করে লাভ কম হওয়ায় এই শিল্পে অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছে। একসময় প্রতিটি বাড়িতে বাঁশের তৈরি এসব জিনিসের ব্যবহার ছিল। হাটবাজারে বিক্রিও হতো প্রচুর। বর্তমানে হাটবাজারগুলোতে বাঁশ শিল্পের তৈরি পণ্য ধ্বংসের পথে। বর্তমানে প্লাস্টিকের তৈরি সস্তা দরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এসব পণ্যের স্থান দখল করে নিয়েছে। ফলে প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এই শিল্পটি। ক্রেতার অভাব আর এ শিল্পের মূল উপকরণ বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে কারিগররা বাধ্য হচ্ছেন তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে। ফলে এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল অনেকেই বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারপরও অনেকেই নিরুপায় হয়ে খেয়ে না খেয়ে পূর্বপুরুষের এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাঁশ শিল্প বাঙালি জাতির সংস্কৃতির একটি অংশ। তাই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন আবহমান গ্রাম বাংলার হাজার বছরের বাঁশ শিল্পের এ ঐতিহ্যকে টিকে রাখতে বাঁশ উৎপাদনে জনগণকে উৎসাহিত করতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়