সাইফুল ইসলাম কবির, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)

  ১০ ঘণ্টা আগে

সুন্দরবনে নদীতে পলিথিন দূষণ প্রতিদিন ঢুকছে ৫০ টন বর্জ্য

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন এখন ভয়াবহ পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণের কবলে। বনসংলগ্ন ৮০টিরও বেশি গ্রাম এবং উপকূলীয় এলাকার নদী-খাল দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য সুন্দরবনের ৫৪টি নদীতে প্রবেশ করছে। এতে নদীর নাব্য কমে যাচ্ছে, হুমকির মুখে পড়ছে মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। একইসঙ্গে শুশুক, কচ্ছপ, বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। খাদ্য শৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করায় জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরবনের জলজ ও স্থলজ পরিবেশের জন্য বর্তমানে অন্যতম বড় হুমকি। বনের নদী ও খালে জমে থাকা পলিথিন-প্লাস্টিক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে। নদীর তলদেশে তৈরি হচ্ছে পুরু প্লাস্টিকের আস্তরণ, যা নাব্য সংকট আরো তীব্র করছে। এর ফলে মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নৌচলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের প্রধান নদীগুলোর অন্তত ১৭ প্রজাতির মাছ ও ৩ প্রজাতির শেলফিশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। দেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ মাছের শরীরে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পাওয়া যাচ্ছে। এসব মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হওয়ায় প্লাস্টিক কণা সরাসরি মানবদেহে প্রবেশ করছে। এতে পাচনতন্ত্র, লিভার ও কিডনির ক্ষতির পাশাপাশি ক্যানসার, হরমোনজনিত জটিলতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪৬০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে সরকার যা স্থানীয় জনগণের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখে। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ সুন্দরবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনের ৫৪টি নদীতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক জমা হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছে। সুন্দরবনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী পর্যটক, বনজীবী ও উপকূলীয় জনপদ থেকে যত্রতত্র ফেলা পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, প্লাস্টিকের কাপ-থালা এবং অন্যান্য বর্জ্য জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করছে। এসব বর্জ্য অনেক সময় প্রাণীরা খাদ্য ভেবে খেয়ে ফেলছে। বিশেষ করে শুশুক ও ডলফিন জেলিফিশ মনে করে পলিথিন গিলে ফেলছে, কচ্ছপের শরীরে প্লাস্টিক জড়িয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে এবং বানরসহ অন্যান্য প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নয়, বনসংলগ্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকাজুড়ে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ না করলে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে না। একইসঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে জনসচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন তারা।

জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সুন্দরবনকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর এর ভয়াবহ প্রভাব আরো বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। উপকূলে পলিথিন ও প্লাস্টিক আধুনিক জীবনের বহুল ব্যবহৃত উপাদান হলেও পরিবেশের জন্য তা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। পলিথিনের বহুল ব্যবহার ও অব্যবস্থাপনার ফলে মাটি, পানি এবং বায়ু দূষণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা যায় বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ প্লাস্টিক অপরিবর্তিত থাকে অর্থাৎ পুনর্ব্যবহার হয় না এবং পরিশেষে তা সমুদ্রে পতিত হয়। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৬৮৫ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে যাচ্ছে। যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং নদী-নালার ধারণক্ষমতা কমে যায়। অধিকন্তু একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উপস্থিতি প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহারকে দুরূহ করে তুলছে। পরিবেশের পাশাপাশি পলিথিন মানুষের স্বাস্থ্যের উপরও দীর্ঘমেয়াদি এবং ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। পলিথিন প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক খাবার বা পানির সংস্পর্শে আসলে ধীরে ধীরে খাদ্যে মিশে যায়। এই রাসায়নিকগুলো মানবদেহে ক্যানসার, হরমোনগত অসামঞ্জস্য এবং প্রজনন সমস্যার কারণ হতে পারে। পলিথিন পোড়ালে বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়। এগুলো শ্বাসনালির প্রদাহ, অ্যাজমা এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। পলিথিন ধীরে ধীরে ছোট ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, যা খাদ্য ও পানির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রের ক্ষতি, রক্তে প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। নদী-নালা বা সমুদ্রের পলিথিন বর্জ্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদকে বিষাক্ত করে তুলছে। এই দূষিত জলজ প্রাণী যখন মানুষ গ্রহণ করে, তখন তা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক খেলনা, প্যাকেটজাত খাদ্য বা পানির বোতল থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থ শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। প্লাস্টিকের বস্তুটি মাটি ও পানিকে দূষিত করার ক্ষেত্রে খুবই ক্ষতিকর।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় পলিথিন দূষণ রোধে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। পলিথিন উৎপাদনের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা করেছে। ১ অক্টোবর থেকে সুপার শপগুলোতে এবং ১ নভেম্বর থেকে কাঁচাবাজারসহ সারা দেশে পলিথিন শপিংব্যাগের ব্যবহারের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। গত ৩ নভেম্বর ২০২৪ হতে এ পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন উৎপাদন বিক্রয়, সরবরাহ ও বাজারজাত করার দায়ে ১৯৮টি মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করে ৪১৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট পঁচিশ লাখ সত্তর হাজার টাকা জরিমানা আদায়সহ আনুমানিক ৫০ হাজার ৫৫২ কেজি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন জব্দ করা হয়েছে এবং ৪টি পলিথিন উৎপাদনকারী কারখানার সেবা তথা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে পলিথিন ও পলিপ্রপাইলিন শপিংব্যাগবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাজার মনিটরিং-এর জন্য উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি নিয়মিত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ঢাকা মহানগরের বাজারে বাজারে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন, ক্লিনআপ পোগ্রামসহ বিকল্প বিতরণ করা হয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে অর্থাৎ অবৈধ পলিথিন শপিংব্যাগ যারা উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রয় এবং মজুদদারকে মোবাইল কোর্টের আওতায় এনে নিয়মিত জরিমানা ধার্য ও আদায় করা হচ্ছে এবং অবৈধ পলিথিন সামগ্রী জব্দ, কারখানাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকজাত পণ্য ব্যবহার বন্ধে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক তিন বছর মেয়াদি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক সমুদ্র সৈকত, সৈকতসংলগ্ন হোটেল মোটেলে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের বিভিন্ন আইটেম পর্যায়ক্রমে বন্ধের বিষয়ে কার্যক্রম চলমান। আশা করা যায় যে, দেশে প্রথমবারের মতো ইপিআর-এর আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি ব্রান্ডের মালিকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়নসহ সার্বিক বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করবেন।

পলিথিন দূষণ বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যৌথ কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সাউথ এশিয়া কো-অপারেটিভ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের চলমান প্লাস্টিক ফ্রি রিভার্স অ্যান্ড সিজ ফর সাউথ এশিয়া প্রজেক্ট (প্লিজ) এর আওতায় একাধিক পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থাকে প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাসকরণে ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাসহ রিসাইকেল করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল প্লাস্টিক অ্যাকশন পার্টনারশিপের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা ও জিআইজেডের সঙ্গে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত ১৫ বছরে তিন গুণের বেশি বেড়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর প্লাস্টিকের রয়েছে মারাত্মক প্রভাব। যার মূল্য পরিশোধ করতে আমাদের ভুগতে হতে পারে শত-সহস্র বছর। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৩৮০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয় যার অর্ধেক একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক।

গবেষকরা বলছে, প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করার ফলে অ্যালার্জি, পাচনতন্ত্রের সমস্যা, ক্যানসার, অ্যাজমা, অটিজম, হরমোনজনিত সমস্যা, গর্ভপাত ইত্যাদি নানান রোগের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। প্লাস্টিকের মধ্যে থাকে বিসফেনল নামের টক্সিক উপাদান, যা গরম খাবারের সঙ্গে মিশে নিয়মিত শরীরে ঢুকলে মহিলাদের ইস্ট্রোজেন হরমোনের কাজের স্বাভাবিকতা বিঘ্নিত হয়। এর ফলে শরীরের ক্লান্তি, মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া প্লাস্টিক নরম করতে ব্যবহৃত থ্যালেট ঝুঁকি বাড়ায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের। অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে, বছরে ৯ আউন্স ওজনের ১ লাখ ২০ হাজার প্লাস্টিক কণা অনবরত খাচ্ছে মানুষ। এসব প্লাস্টিক কণার উৎস পানি, চিংড়ি-কাঁকড়া-কাছিম জাতীয় মাছ ও লবণ।

আমাদের দেশে শহরাঞ্চলের বৃহৎসংখ্যক জনগোষ্ঠীই প্রতিনিয়ত অব্যবহৃত পলিথিন, শ্যাম্পু, পেস্ট, সসজাতীয় পণ্যের মিনিপ্যাক, স্ট্র, কটন বাড, বোতলের ক্যাপ, খাদ্যপণ্য মোড়ক ইত্যাদি যত্রতত্র ফেলে থাকে। এছাড়া খাদ্য ও প্রসাধনপণ্যের নানা ধরনের মিনিপ্যাক ব্যবহারের আধিক্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শহরের তুলনায় গ্রাম এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া যায় বেশি। এনভায়রনমেন্ট সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর জরিপ বলছে, বাংলাদেশে বছরে ওয়ান টাইম প্লাস্টিক থেকে সৃষ্ট বর্জ্যের পরিমাণ ৮৬ হাজার ৭০৭ টন, যার ৬৩ শতাংশই আসে খাদ্যপণ্য মোড়ক থেকে। নালা বা নর্দমার মাধ্যমে এগুলো পৌঁছে যায় খাল-বিল, নদী কিংবা সমুদ্রে। অথচ প্লাস্টিক নির্ভরশীলতার ফলে বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহার বন্ধে দেখা যাচ্ছে অনীহা। ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ার ফলে কারখানাগুলোতেও রয়েছে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে অনাগ্রহ। বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (২০০২ সালের সংশোধিত)-এর মাধ্যমে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে তা কার্যকর হয়ে উঠেনি। মাঝে মধ্যে বানর পলিথিন খেয়ে ফেলছে। শুশুক-ডলফিন চোখে ভালো দেখে না। তারাও পলিথিন পেলে জেলিফিশ মনে করে খেয়ে ফেলে। গায়ে পলিথিন জড়িয়ে মারা যাচ্ছে কচ্ছপ। অন্যান্য জলজ প্রাণীও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ খেয়ে ফেলছে। গাছের শ্বাসমূলের উপর পলিথিন ও প্লাস্টিকসামগ্রী পড়ে ক্ষতি হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে বনের স্থল ও জলজ প্রাণী এবং গাছপালার হুমকি বাড়ছে। বনসংলগ্ন ৮০টি গ্রাম থেকে ৫৪টি নদী-খাল হয়ে জোয়ারের সময় একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের থালা ও কাপ বনের মধ্যে চলে যাচ্ছে। ফলে প্লাস্টিক বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সুন্দরবনের প্রাণিকূলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকা এখন প্লাস্টিকে সয়লাব। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের তিনটি প্রধান নদীর অন্তত ১৭ প্রজাতির মাছ ও ৩ প্রজাতির শেলফিশ মাইক্রো-প্লাস্টিকে সংক্রমিত। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৩ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক খাচ্ছে একজন মানুষ। দেশের ৭৩ শতাংশ মাছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার অস্তিত রয়েছে।

শুধু সুন্দরবনে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করলে হবে না, সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায়ও প্লাস্টিক বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক দূষণ ও শিল্প দূষণে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। গ্রিনহাউস গ্যাসের একটি কারণ প্লাস্টিক। এটি তৈরিতে প্রায় ৩৮ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৮ ধরনের কেমিক্যাল অত্যন্ত ক্ষতিকর।

প্লাস্টিক দূষণ বিশ্বব্যাপী এক জটিল সমস্যা; যা পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট হুমকি। মানবসৃষ্ট প্লাস্টিক দূষণ পৃথিবীতে নানা রকম ইকোসিস্টেমের জন্য এক ভয়ংকর বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

পলিথিনের বিকল্প সোনালী ব্যাগের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বায়োডিগ্রেডেবল মোড়কের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বয়ে পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পলিথিনসহ সব প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১০ বছর মেয়াদি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার শহরের প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা নদী দূষণের হট স্পটগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। অচিরেই সেগুলো অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়