মো. নূর ইসলাম, বিরামপুর (দিনাজপুর)
সংগ্রামী
চার মাস বয়সে এতিম, গ্রামের শত শিশুর ‘মা’ ও আলোর দিশারি

‘জন্ম হোক যথা-তথা, কর্ম হোক ভালো’ প্রবাদটির বাস্তব প্রতিচ্ছবি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার চরকাই গ্রামের আফসানা পারভীন। জন্মের মাত্র চার মাস পর পিতাকে এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে মাতাকেও হারিয়ে এতিমখানায় বেড়ে উঠা এই নারী আজ নিজ গ্রামের শত শত শিশুর শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
আফসানা পারভীনের জন্ম ১৯৮৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বিরামপুর উপজেলার চরকাই গ্রামে। তার বাবা আহসান জলিল ও মা ফাতেমা বেগম দুজনেই মৃত্যুবরণ করেন যখন তিনি একেবারেই শিশু। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে তিন ভাইবোনকে আশ্রয় নিতে হয় রাজশাহীর এসওএস শিশুপল্লীতে।
সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন। সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং মাদারবক্স গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আফসানা পারভীন উপলব্ধি করেন, শিক্ষাই সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু তার নিজ গ্রাম চরকাইয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শিশুদের কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। ফলে অনেক শিশুই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। এই বাস্তবতা বদলাতে ২০১০ সালে গ্রামের কয়েকজন শিক্ষিত নারী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি। নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে জমি কিনে সহকর্মী মুর্শিদা আক্তার ও হানিফা খাতুনের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমদিকে একটি টিনশেড ঘরে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টি এলাকাবাসীর আস্থা অর্জন করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ২০১৪ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের আওতায় আসে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন এবং শত শত শিক্ষার্থী সেখানে লেখাপড়া করছে।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও বৃত্তি পরীক্ষায় প্রতি বছরই তারা কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছে। এ বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কেউ বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে, কেউ সেনাবাহিনীতে, আবার কেউ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত।
আফসানা পারভীন বলেন, আমার শৈশব ছিল অনেক কষ্টের। তাই শিশুদের কষ্ট আমি বুঝি। তাদের মুখে হাসি দেখতে পারলেই আমার জীবনের সব কষ্ট ভুলে যাই। আমার শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে যখন ছুটিতে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে, তখন মনে হয় আমার জীবনের সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, আফসানা পারভীনের জীবনসংগ্রাম এবং শিক্ষাবিস্তারে তার অবদান বর্তমান সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। একজন এতিম শিশুর এমন সাফল্য প্রমাণ করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং মানবসেবার মানসিকতা থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. অফিফা খাতুন বলেন, আফসানা পারভীনের জীবন আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। ছোটবেলায় এত কষ্ট সহ্য করেও তিনি শুধু নিজের জন্য ভালো কিছু করেননি; গ্রামের শিশুদের শিক্ষার জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এই অবদান চরকাইবাসী কখনো ভুলবে না।
বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. ইস্মোতারা বেগম বলেন, আগে আমাদের গ্রামের ছোট ছোট শিশুদের দূরের বিদ্যালয়ে যেতে হতো। দূরত্বের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে অনীহা দেখাত। আফসানা আপার উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন গ্রামের শিশুরা সহজেই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেন।
বিরামপুর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মোশাররত জাহান বলেন, আফসানা পারভীন আমাদের সমাজের নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনের শুরুতে চরম প্রতিকূলতা ও অভিভাবকহীনতার মুখোমুখি হয়েও তিনি যেভাবে নিজের ভাগ্য বদলেছেন এবং শত শত শিশুর শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। একজন এতিম শিশু থেকে আজ তিনি একটি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হয়ে সমাজকে আলোকিত করছেন। তার সংগ্রামী জীবন ও সাফল্য আমাদের উপজেলার পাশাপাশি সারা দেশের নারীদের যেকোনো বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তার এই মহতী উদ্যোগ ও সমাজসেবামূলক কাজকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
"






































