সাদমান সময়, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)
বিরল রোগে অকাল বৃদ্ধ

অকাল জরার ইংরেজি পরিভাষা প্রোজিরিয়া। যার অর্থ পূর্বে বা অপরিপক্ব। যার অর্থ বৃদ্ধ বয়স। রোগটি খুবই বিরল এবং খুব কমসংখ্যক শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মায়। অকাল জরাগ্রস্ত রোগী সাধারণত ১৩ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এমনই এক বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মো. শাহাদাত হোসেন। তিনি উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মাইজগাঁও গ্রামের মো. হানিফ ও নাছিমা আক্তারের তিন সন্তানের মধ্যে সে সবার ছোট।
শৈশবের এই সোনালি সময়ে খেলাধুলায় মাতিয়ে থাকার কথা অথচ দুই শতকের জমির ওপর ঝুপড়ি ঘরে আর উঠানে বন্দি জীবন কাটে শাহাদাতের। বয়স মাত্র ১০ বছর হলেও দেখতে অবিকল বায়োবৃদ্ধ। তাই অন্য শিশুরা তার সঙ্গে মিশতে চায়না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই তার বাবা-মায়ের।
জন্মের চার মাস পর থেকে প্রোজিরিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মো. শাহাদাত হোসেন। বর্তমানে শাহাদাত মির্জাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
জানা গেছে, মো. শাহাদাতের জন্মের চার মাস পর থেকে হঠাৎ করে শরীরে বিরল রোগে আক্রান্ত হয়। তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ১ মাস ১৪ দিন চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসা নিলেও কোনো উন্নতি হয়নি। চিকিৎসক বলেছেন এ রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই। ১ মাস ১৪ দিন থাকার পর তারা গ্রামে চলে আসেন। দুই বছর পর তার শরীরে দেখা দেয় হার্নিয়া রোগ। এরপর অপারেশন করা হয়। তবে এখনো মাঝে মাঝে ব্যথা করে।
শাহাদাতের বাবা মো. হানিফ বলেন, ‘দুটি মেয়ের পর আমার একটি ছেলে সন্তান হয়। অনেক খুশি হই। কিন্তু কিছুদিন পর আমার একমাত্র ছেলের শরীরের রোগ দেখা দেয়। যখন তার এই রোগ দেখা দিয়েছে, তখন তাকে নিয়ে চমেক হাসপতালে ১ মাস ১৩ দিন ছিলাম। ডাক্তারের চিকিৎসা ফ্রি পেয়েছি কিন্তু ঔষধ তো আর ফ্রি পাইনি। জায়গা-সম্পত্তি নেই যে বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করাব। আমার ছেলেটা যদি একটু সুস্থ হয় তাহলে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারত। তখন আমি মরে গেলেও শান্তি পেতাম। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মিরসরাইয়ের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কাছে আকুল আবেদন করব যেন, আমার ছেলেটার সুস্থতার জন্য যেন একটু সহযোগিতা করেন।’
মো. হানিফ আরো বলেন, ‘সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমি। রিকশা চালিয়ে সংসার এবং ছেলের চিকিৎসা খরচ চলছে। দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ইনকাম হয়। তার মধ্যে ২৫০ টাকা মালিককে দিয়ে দিতে হয়। নিজের কোনো জায়গা-সম্পত্তি নেই। স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে নিয়ে সওজের জায়গার ওপর কোনো রকমে দিন কাটছে। জানি না কত দিন থাকতে পারব এই জায়গার উপর। শুনতেছি রাস্তা নাকি আরো বড় হবে, রাস্তা বড় হলে তো আমাদের এখানে থাকা সম্ভব না।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে ছোট্ট একটি ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন হানিফ। ঘরের সামনে ছোট্ট উঠানে দুরন্তপনায় মেতেছে শাহাদাত। সাইকেল চালাচ্ছেন, বিভিন্ন কথা বলছেন। সব আচরণ শিশুসুলভ হলেও শরীর দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স ৬০। বাবার চেয়ে ছেলের বয়স বেশি বোঝা যাচ্ছে।
অসুস্থ মো. শাহাদাত বলেন, ‘আমার স্কুলের স্যারেরা আমাকে অনেক আদর করে। কিন্তু আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে খারাপ কথা বলে। আমার সঙ্গে খেলতে চায় না। আমি খেলতে গেলে তারা আমাকে দলে নেয় না। আমি সুস্থ হয়ে আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে চাই এবং পড়ালেখা করতে চাই। পড়ালেখা করে আমি বড় হয়ে এসি বাস চালাব।’
শাহাদাতের মা নাছিমা আক্তার বলেন, আমার ২ মেয়ে ১ ছেলে। ছেলেটা জন্মের কিছুদিন পর তার শরীরে বিরল রোগ দেখা যায়। এলাকার মানুষজন থেকে টাকা-পয়সা তুলে চিকিৎসা করেছিলাম কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। চিকিৎসক বলেছে এ রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই, তাকে সুস্থ করে তুলতে হলে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। ছেলেকে বিদেশ নিয়ে চিকিৎসা করানোর সাধ্য আমাদের নেই। আমাদের জায়গা সম্পত্তি বলতে কিছু নেই, সড়কের জায়গার ওপর ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সেখানে ঘর বেঁধে রয়েছে। শুনতেছি রাস্তা আরো বড় হবে, তখন তো আমাদের এ জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তখন আমার অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে কোথায় থাকব এই বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে শাহাদাতকে দেখলে অন্য ছেলেরা ভয় পায়, তখন আমার ছেলে আমাকে বলে, আম্মু আমাকে দেখে সবাই ভয় পায় কেন? তখন আমি বলি বাবারে আল্লাহ তোমাকে বানাইছে সে আল্লাহর কাছে তোমাকে সুন্দর লাগতেছে, আমার কাছেও তোমাকে সুন্দর লাগতেছে। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন করব যেন, আমার ছেলেটাকে সুস্থ করার জন্য সহযোগিতা করেন।
মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মিনহাজ উদ্দিন বলেন, শিশুটির ছবি দেখে মনে হচ্ছে সে প্রোজিরিয়া রোগে আক্রান্ত। এটা জেনেটিক কারণে হয় এবং এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুব কম। শিশু বয়সে গায়ের চামড়া কুঁচকে যাওয়া, বৃদ্ধের মতো দেখতে, এসব এ রোগের লক্ষণ। একে দ্রুত ঢাকা পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল কবির ফিরোজ বলেন, হানিফের জায়গা সম্পত্তি বলতে কিছু নেই, তারা খুবই গরিব। তার ছেলে শাহাদাতকে পরিষদ থেকে একটি প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও তাকে সহযোগিতা করেছি। ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও জানান তিনি। সাহায্য পাঠাতে চাইলে বিকাশ ও নগদ নম্বর ০১৮৭৮৪৯০৪০৯ (হানিফ বাবা)। ব্যাংক হিসাব ০২৬৩১২২০০০০৩২১৮ (নাছিমা বেগম মা), ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বড়তাকিয়া শাখা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম।
"







































