খন্দকার রামীম হাসান পায়েল

  ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলা ভাষার বীরত্বপূর্ণ অতীত বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

স্রোতস্বিনী নদী যেমন সমুদ্রের টানে অদম্য গতিতে ছুটে চলে, রক্ত-মাংসে গড়া এই অধম জাতির সঙ্গে তার মাতৃভাষার সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই। পাহাড়ের পাথর কিংবা কৃত্রিম বাঁধ যেমন নদীর গতিকে সাময়িক আটকে রাখতে পারে, কিন্তু তার গন্তব্য ভোলাতে পারে না; ঠিক তেমনি যুগে যুগে ভিনদেশি ভাষার আগ্রাসন বা রাজদণ্ড বাঙালির কণ্ঠ রোধ করতে চাইলেও, মায়ের ভাষার প্রতি সেই নাড়ির টান ছিঁড়তে পারেনি। সমুদ্রের নোনা জল আর মানুষের তৃষ্ণা শীতলকারী নদীর মিষ্টি জল যে মোহনায় একাকার হয়, ১৯৫২-এর রাজপথে সেই মোহনা রচিত হয়েছিল আমাদের ভাইদের তপ্ত রক্তে। এই জাতির অন্তরে স্বীয় মাতৃভাষার প্রতি অবাধ কৃতজ্ঞতা ও অমর ভালোবাসার প্রতীক- আত্মত্যাগের অমৃত জলে পরিণত হওয়া সেই মোহনা। ভাষার প্রশ্নে তদানীন্তন পাকিস্তানি সরকারের উর্দু প্রীতি এবং রাষ্ট্রভাষা করার প্রকাশ্য ঘোষণার দ্বারা জোরপূর্বক উর্দুকে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে চাপিয়ে দেওয়ার যে অপচেষ্টা, তার সূত্রপাত ভারত-পাকিস্তান ভাগের পরপরই শুরু হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর সেই দাম্ভিক ঘোষণা- ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’- বাঙালির অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত। পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা তখন মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্ত প্রভু, আমলা এবং সেনাবাহিনীর হাতে কুক্ষিগত ছিল। এরা অধিকাংশই ছিলেন উর্দুভাষী বা উর্দু সংস্কৃতির অনুসারী। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার মানে ছিল- রাষ্ট্রের দাপ্তরিক কাজ, আইন-আদালত এবং প্রশাসনিক যোগাযোগে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। জিন্নাহ এবং তার অনুসারীরা মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্রভাষা থাকলে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হবে। তারা ‘এক ধর্ম, এক রাষ্ট্র, এক ভাষা’- এই তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। উর্দুকে তারা পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করিয়ে জোরপূর্বক একটি কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ তৈরি করার মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় এক কলুষিত অধ্যায় রচনা করতে চেয়েছিলেন।

২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২- সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের পাশে) ছাত্ররা জড়ো হতে থাকে। গাজিউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ১০ জন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মিছিল বের করে। পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে ছাত্ররা আইনসভার দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে সেদিন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বুকের তাজা রক্তে কৃষ্ণচূড়ার রঙ হার মানল, রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। ১৯৫৩ সালে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় কর্মপরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় শহীদ দিবস পালিত হয়। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দু উভয়কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাঙালির মাতৃভাষা দিবস কীভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিণত হলো এর পেছনেও রয়েছে চমৎকার ইতিহাস। বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম, ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বহুসংস্কৃতির জন্য খ্যাত কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে বসবাসকালীন বহু ভাষাভাষী মানুষের সান্নিধ্যে এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিটি ভাষার রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তার মতে ছোট হোক বড় হোক, বিশ্বের সকল জাতির নিজস্ব মাতৃভাষাকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সম্মান দেখানো যায়, এ বিষয়ে সবার নজর দেওয়া দরকার; অন্যথায় বিশ্বের বিভিন্ন জাতি তাদের নিজস্ব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাষাগুলো দ্রুতই হারিয়ে ফেলবে। মাতৃভাষাগুলো যেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে না যায়, বিশ্বব্যাপী যেন মাতৃভাষার গুরুত্ব পায়- এই লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা শহিদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন। রফিক তার সহযোদ্ধা আবদুস সালামকে নিয়ে ‘এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রচেষ্টা শুরু করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়।

মাতৃভাষার জন্য লড়াই বাঙালির গৌরবমণ্ডিত ইতিহাস, কিন্তু আজ বায়ান্নর সেই রক্তস্রোত কি আমাদের ধমনীতে আসলেই প্রবহমান? নাকি আমরা কেবল বছরে একদিন প্রভাত ফেরিতে ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি পরে সেই আবেগের মহড়া দিই? বাস্তবতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আজ বড় নিদারুণ এক সত্যের মুখোমুখি আমরা। যে ভাষার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই ভাষাকেই আজ আমরা তথাকথিত ‘আধুনিকতা’র নামে প্রতিনিয়ত অপমান করে চলেছি। আজ বাংলার প্রতি নবতরুণদের টান শুধু পরীক্ষার খাতায় কৃতকার্য হওয়া অবধি সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা এটাই- ড্রয়িংরুমে বা আড্ডায় বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলাকে এই সমাজ আজ ‘ক্ষেত’ বা ‘আনস্মার্ট’ মনে করে। ইংরেজির ভুল উচ্চারণে কথা বলাকেও যেখানে আভিজাত্য ভাবা হয়, সেখানে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে গেলে আমাদের জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসে। রোমান হরফে বাংলা লেখার (যেমন: amar sonar bangla) যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তাকে ভাষাবিদ রবার্ট ফিলিপসনের ভাষায় বলা যায় ‘ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ’। আমাদের নতুন প্রজন্ম বাংলা বর্ণমালা চেনে, কিন্তু বাংলা বানান জানে না। আধুনিকতা তাদের ইংরেজি গ্রামারের গুরুত্ব শেখালেও মাতৃভাষার মূল্যটা অন্তরে ধারণ করা শেখাতে পারেনি। অকৃতজ্ঞতার এই ঠুনকো মায়াজালে যুক্ত হয় আঞ্চলিকতার প্রতি ব্যঙ্গাত্মক ও অবজ্ঞার মনোভাব। এটা দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের চারপাশে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ যদি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, অনেকেই সেটাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে, ‘অশুদ্ধ’ বা ‘গেঁয়ো’ বলে। শিক্ষিত মহলের কিছু কিছু কোণে আঞ্চলিক ভাষাকে ‘অশিক্ষিত’ বা ‘অমার্জিত’ ভাষায় আখ্যায়িত করে কলুষিত করার অপচেষ্টা করা হয়। তারা উপলব্ধি করে না- ভাষার এই বৈচিত্য শুধু শব্দের পার্থক্য নয়; এটি বহন করে প্রতিটি অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। এই আঞ্চলিক বুলিগুলোই বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। সমাজবিজ্ঞানী ফ্রানজ ফ্যানন তাঁর ‘Black Skin, White Masks’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যখন কোনো জাতি নিজের ভাষার চেয়ে ঔপনিবেশিক ভাষাকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করে, তখন তারা মূলত মানসিক দাসত্বের শিকার হয়।

আন্তর্জাতিক ভাষা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যেসব ভাষা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে উচ্চমানের গবেষণার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। কিন্তু তারা গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজের প্রতি অনীহা দেখিয়ে বিভিন্ন দিবস পালন, সেমিনার, পদক প্রদান, প্রশিক্ষণ, স্মরণিকা ও নিউজলেটারের মতো রুটিন কাজ করছে। বাংলাদেশের ৪১টি ভাষার মধ্যে ১৪টি ভাষা বিপন্ন অবস্থায় আছে, সেগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না গেলে চিরতরে মুছে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি প্রমিত বাংলার সঠিক চর্চা ও সংরক্ষণ না হয়, তবে উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বাংলা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে এবং ভবিষ্যতে এটি কেবল একটি ‘কথ্য ভাষা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। তাই আজ প্রশ্ন জাগে, আমরা কি কেবল দিবসসর্বস্ব জাতি হয়েই থাকব? মনে রাখা প্রয়োজন, শিকড়হীন গাছ যেমন ঝড়ে টিকে থাকতে পারে না, তেমনি নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে কোনো জাতি বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, একুশ হোক আমাদের প্রাত্যহিক যাপনের অহংকার- যেন আমাদের ভাষার নদীটি তার নিজস্ব গতিতে ও বৈচিত্র্যে চিরকাল প্রবহমান থাকে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়