প্রবীর বিকাশ সরকার

  ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জাপানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়যাত্রা

মানবসমাজে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভেদাভেদ এবং সীমানা থাকলেও ভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই, নেই ভেদভেদও। বরং এই তিনটি মানবিক অনুষঙ্গ মানুষের পারস্পরিক ভাব, চিন্তা, মতামত বন্ধুত্বের সেতু ও আন্তর্জাতিক বহুমুখী সম্পর্কের প্রতিনিধি। একুশ শতকের ইন্টারনেট, ডিজিটাল সিস্টেম, এআই চ্যাটজিপিটি ইত্যাদি এই দিগন্তকে আরো প্রসারিত ও বিস্তৃত করার অভাবনীয় সুযোগ ও সুবিধা সহজলভ্য করে অতিদ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে বাংলা ভাষার প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশে। সেইসঙ্গে জানতে পারা যাচ্ছে কোন্ কোন্ দেশের সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কবে থেকে সেতুবন্ধনের কাজটি করে আসছে। যে-সকল দেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ব্যাপক কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে তার মধ্যে এশিয়ায় বাঙালি জাতির পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র জাপানই শীর্ষস্থানে বিদ্যমান। বাংলাদেশের মহান ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই সুযোগকে আরো সুদূরপ্রসারী করবে বলাই বাহুল্য। একইসঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে বাংলা ভাষা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং শতবর্ষপূর্বে জাপানে বাংলা ভাষাচর্চার ইতিহাস দুই জাতির শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব রাখবে আগামী দিনে তা সহজেই অনুমেয়।

আমরা অনেকেই অবগত নই যে, দুই বাংলার চেয়ে জাপানে বিগত শতবর্ষের অধিক যে সকল জাপানি নাগরিক বাংলা ভাষাচর্চা এবং সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও অনুবাদ করে আসছেন তাদের অধিকাংশেরই সূচনা এবং অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কবিগুরু শান্তিনিকেতনে জাপানি জুউদোও বা জুজুৎসু চালু করেছিলেন। তার অনুরোধে ১৯০৫ সালে বন্ধুবর ওকাকুরা তেনশিন জুউদোও ক্রীড়া প্রশিক্ষক সানো জিননোসুকেকে শান্তিনিকেতনে পাঠান। তিনি সেখানে জুউদোও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাংলা ভাষাও রপ্ত করেছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। সম্ভবত, তিনিই প্রথম জাপানি নাগরিক যিনি বাংলা ভাষা শিখেছিলেন, এবং ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথের সুবৃহৎ উপন্যাস গোরা উপন্যাসটি মূল বাংলা থেকে জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে।

১৯০৮ সালে জাপানের বৌদ্ধপণ্ডিত কিমুরা রিউকান বা কিমুরা নিচিকি পালি ভাষা শেখার জন্য চট্টগ্রামের এক বৌদ্ধ মন্দিরে যান। ১৯১১ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ও সংস্কৃত ভাষায় ভর্তি হন। এই সময় থেকেই জোড়াসাঁকোতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন। ১৯১৮-২৬ সাল পর্যন্ত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি প্রভূত দক্ষতা অর্জন করেছিলেন বাংলা ভাষায়। জাপানে রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দোভাষীর কাজ করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলা ভাষা নিয়ে ব্যাপক অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। মূলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৪ সাল থেকে যুদ্ধপূর্ব সময়ে তার কিছু বিচ্ছিন্ন কবিতা, গীতাঞ্জলিসহ বিখ্যাত অনেক গ্রন্থ ইংরেজি থেকে জাপানিতে অনুবাদ হয়ে যায়। বস্তুত, এরই ধারাবাহিকতা আবার শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের জন্মশত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে, ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় লাগিয়ে ঘটা করে উদযাপনের মধ্য দিয়ে। এই উপলক্ষে প্রচুর রবীন্দ্র রচনা জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়। বহুভাষাবিদ অধ্যাপক ওয়াতানাবে শোওকোও মূল বাংলা থেকে গীতাঞ্জলি জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথের জাপান যাত্রী গ্রন্থটি স্বনামধন্য অনুবাদক ও অধ্যাপক ইনাজু কিজোও এবং রবীন্দ্রনাথের আত্মীয় জাপানপ্রবাসী উচ্চশিক্ষার্থী সন্দীপ ঠাকুর জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন যৌথভাবে। এই উৎসব উপলক্ষে একটি রবীন্দ্র আন্দোলনই গড়ে ওঠে জাপানে। বাংলা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমও চালু করেছিল টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন।

১৯৬৬ সালে গঠিত হয় বাংলা ভাষা পাঠচক্র সংস্থা। এক ঝাঁক জাপানি তরুণ প্রজন্মের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমীর আবির্ভাব ঘটে। তাতে বাংলা শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন বাংলা ভাষায় পিএইচডিপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি; কলকাতার অধিবাসী জাপান প্রবাসী বহুভাষাবিদ কল্যাণ দাশগুপ্ত, চট্টগ্রামের অধিবাসী বেতার সাংবাদিক ইসকান্দার আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ। কল্যাণী নামে একটি অনিয়মিত পত্রিকাও প্রকাশিত হয় জাপানি ভাষায়, তাতে জনপ্রিয় বাংলা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস মূল বাংলা থেকে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। কল্যাণী এখন বিলুপ্ত। এই নবোদ্যোগের শুরুতে বাংলা ভাষা শিখে অধ্যাপক কাজুও আজুমা অনুবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থটি। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের বাংলা চণ্ডালিকা, মুক্তধারা ও নটীর পূজা পাঠ করে গবেষণামূলক প্রবন্ধও লেখেন।

সত্তর দশক থেকে বাংলা ভাষার একটা অভূতপূর্ব জোয়ার আসে জাপানে। আমূল পরিবর্তন ঘটে। অনেক জাপানি বাংলা ভাষা শেখার জন্য বাংলাদেশ, কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে যান। এবার শুধু রবীন্দ্রসাহিত্য নয়, বাংলা ভাষাচর্চাকে উপলক্ষ করে বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ইতিহাস-নৃতত্ত্ব-সাহিত্য-শিল্পকলা-সঙ্গীত-অর্থনীতি-রাজনীতি ইত্যাদি শিক্ষা ও গবেষণার প্রবণতা দেখা দেয়। বাংলা ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করেন যথাক্রমে অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি, অধ্যাপক ড. মিজোকামি তোমিও ও অধ্যাপক আওইয়াগি সেইজোও। অধ্যাপক কাজুও আজুমা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে তিন বছর অধ্যাপনা করার পর জাপানে ফিরে এসে গঠন করেন ১৯৭১ সালে ভারত-জাপান রবীন্দ্র সংস্থা। রবীন্দ্রনাথের প্রবীণ ভক্তদের নিয়ে তিনি একাধিক পরিকল্পনা হাতে নেন। তার মধ্যে মূল বাংলা ভাষা থেকে বাংলা সাহিত্যের জাপানি অনুবাদ প্রকল্প। শিশুসাহিত্যিক ও অনুবাদক ইয়ামামুরো শিজুকা, কবি উপন্যাসিক সমালোচক নোমা হিরোশি, অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুও এবং অধ্যাপক কাজুও আজুমার যৌথ সম্পাদনায় ১২ খণ্ডে সাত হাজার পৃষ্ঠাসম্বলিত নির্বাচিত রবীন্দ্ররচনাবলী জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়ে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়। দ্বাদশ খণ্ডটি গবেষণাধর্মী। এই রচনাবলীর তিন পঞ্চমাংশ রচনা মূল বাংলা থেকে অনূদিত। এই বিশাল মাপের ঐতিহাসিক কাজটি সম্ভব হয়েছে অধ্যাপক কাজুও আজুমার অশেষ ধৈর্য, আগ্রহ এবং রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষার প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে।

রবীন্দ্রনাথের যে সকল উল্লেখযোগ্য রচনা মূল বাংলা থেকে জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন তারা হলেন, যথাক্রমে: ওয়াতানাবে শোওকোও, কাজুও আজমা, ড. নারা ৎসুয়োশি, ড. উসুদা মাসায়ুকি, ওওনিশি মাসায়ুকি, নাগাই তামোৎসু, মিজোকামি তোমিও, ইয়ানাগিসাওয়া কাজুয়ে, ওয়াতানাবে কাজুহিরো, কাসুগাই শিনইয়া, আওইয়াগি সেইজোও, কোওজি সাদাইয়ে, হানাওয়া কাজুমারো, নাকাদা ইয়ায়ে, নোমা আতাকো, সুজুকি কিকুকো, নিওয়া কিওকো, নিশিওকা নাওকি, কাম্বে তোমোকো, আজুমা কেইকো, উচিয়ামা মারিকো, মোরিমোতো তাৎসুও, মিয়ামোতো য়ুরিকো প্রমুখ।

রবীন্দ্র রচনাবলীর দ্বাদশ খণ্ডে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলা ভাষাভিত্তিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে: অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি, অধ্যাপিকা ড. নিওয়া কিওকো তিনি রবীন্দ্রনাথ ও জাপান সম্পর্ক নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত, অধ্যাপক উসুদা মাসায়ুকি এবং অধ্যাপক কাজুও আজুমা। এতে বাংলায় প্রবন্ধ লিখেছেন যথাক্রমে: শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায, ভবতোষ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ গুপ্ত, অজিতকুমার ঘোষ, অশ্রুকুমার সিকদার, সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হায়াৎ মামুদ, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, রামবহাল তেওয়ারী, আরতি মুখোপাধ্যায়, প্রকাশকুমার নন্দী ও স্বপনপ্রসন্ন রায়। এগুলোর জাপানি অনুবাদ করেন যথাক্রমে: হানাওয়া কাজুমারো, ওয়াতানাবে কাজুহিরো, ড. নারা ৎসুয়োশি, নিশিওকা নাওকি, আজুমা কেইকো এবং ড. নিওয়া নিওকো।

এছাড়া উসুদা মাসায়ুকি, নিশিওকা নাওকি ও কাজুও আজুমা যৌথভাবে সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্র চিত্রকলা: রবীন্দ্র সাহিত্যের পটভূমি গ্রন্থটি জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন।

রবীন্দ্রনাথের বাইরে বাংলা ভাষার প্রধান কবি, সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিকদের রচনাও বাংলা থেকে জাপানিতে অনূদিত হয়েছে বেশকিছু যেমন:

নিওয়া কিওকো: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচিত গল্প সংগ্রহের অনুবাদসহ ডাইনীর বাঁশি, আখড়াইয়ের দিঘি, ঘাসের ফুল, নারী ও নাগিনী, খড়গ, মালাচন্দন, রায়বাড়ি, জলসাঘর ও কবি প্রভৃতি। সুকুমার রায়ের মধ্যরাতের ভয়ঙ্কর, অবাক জলপান, আশ্চর্য ছবি ও লোলিল পাহারা। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা সমগ্র থেকে সাতটি কবিতা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা সমগ্র থেকে চারটি কবিতা। কাজী নজরুল ইসলামের ৩৬টি কবিতা। মহাশ্বেতা দেবী ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র গল্প সংকলন। এছাড়া শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী ও আল মাহমুদের ২০ এর অধিক কবিতার অনুবাদ নিয়ে বাংগুরাদেশু শি ছেনশুউ বা বাংলাদেশের নির্বাচিত কবিতা নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

মাসাইউকি উসুদা: জীবনানন্দ দাশের ৬১টি কবিতা নিয়ে রূপসী বাংলা। বিচ্ছিন্ন কবিতা হায় চিল, নির্জন সাক্ষর, কমলালেবু, আট বছর আগের একদিন। বুদ্ধদেব বসুর ঘুমের গান। ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা।

নাগাই তামোৎসু: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী। বিচ্ছিন্ন কবিতা জীবনানন্দের বনলতা সেন, নির্মলেন্দু গুণের মানুষ, লজ্জা, রোদ উঠলেই সোনা, প্রথম অতিথি; প্রেমেন্দ্র মিত্রের নীল দিন; বুদ্ধদেব বসুর কোনো মৃত্যুর প্রতি, সমরেশ বসুর অবাধ্য, পসারিণী ও সমর সেনের বিস্মৃতি ও বিরহ।

ইয়ামাদা তোশিইউকি: বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টন।

ওয়াতানাবে কাজুহিরো: বুদ্ধদেব বসুর আড্ডা।

ইয়ামাদা হিরোকো: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বীতংস।

সুজুকি কিকুকো: যোগীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের রামপ্রসাদ; দীনেশচন্দ্র সেনের ময়মনসিংহ গীতিকা; দেওয়ান মদীনা মনসুর, সুরুৎজান বিবি, সুন্দরী কমলা এবং বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান; হুমায়ুন আজাদের ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, আব্বুকে মনে পড়ে। কবি মুকুন্দরাম দাস বিষয়ে প্রবন্ধ। উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে বার্ষিক কাগজ সোকা বা উজানযাত্রী প্রকাশ করেন, যেটা শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যবিষয়ক কাগজ জাপানি ভাষায় প্রকাশিত হয়।

মায়েমুরা মেগুমি: আসাদ চৌধুরীর গ্রামবাংলার গল্প ও শঙ্খ ঘোষের ছড়া সব কিছুতেই খেলনা নয়।

উচিয়ামা মারিকো: সত্যজিৎ রায়ের দশটি গল্পের অনুবাদকৃত গ্রন্থ। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর টুনটুনির বই।

ওওনিশি মাসায়ুকি: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পালকীর গান; জীবনানন্দের হাওয়ার রাত, মহাশ্বেতা দেবীর নুন। শামসুর রাহমান, আবুল হাসান ও শহীদ কাদরীর কবিতা।

আজুমা কেইকো: স্বর্ণকুমারী দেবীসহ একাধিক বাঙালি মহিলার জীবন, কর্ম বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ।

মিজোকামি তোমিও: শরৎচন্দ্র চট্টেপাধ্যায়ের গল্প অনুবাদ করেছেন বলে জানা যায়।

ওকুদা ইউকা: রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সম্প্রতি গানের সিডি প্রকাশ করেছেন। বাংলায় একাধিক লেখা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে।

নিশিওকা নাওকি: বাংলাতেও তিনি লিখেছেন ভারতীয় লোকসাহিত্য গ্রন্থ অরণ্যের রাজবাড়ি নামে।

কাম্বে তোমোকো: রবীন্দ্রনাথের শিশু ভোলানাথ, বুড়ো বটের ঝুরি, নদী।

সাম্প্রতিককালে জাপানি ভাষার একজন লেখিকা ওয়াতানাবে নাওমি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যিনি গবেষণা করছেন, বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে বাংলা শিখে দশটির অধিক শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেছেন বাংলায়। নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার। অন্যদিকে, একজন বয়স্ক স্কুল শিক্ষক ইতোও শিনজি অসুস্থ অবস্থায় গীতাঞ্জলি পাঠ করে অভিভূত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষার প্রতি প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠে বাংলা শেখেন এবং বাংলা থেকে গীতাঞ্জলি জাপানিতে তার মতো করে অনুবাদ করেন, ক্রমে ক্রমে রোগমুক্ত হন। পরবর্তীতে অনুবাদ করেন শ্যামা, লেখন।

হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, গবেষক ড. তোগাওয়া মাসাহিদে দীর্ঘদিন ধরে দুই বাংলার ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম, বাউল দর্শন এবং স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে সরেজমিন বিস্তৃত গবেষণা করছেন, লিখে চলেছেন একটার পর একটা গ্রন্থ। বাংলাদেশ তার অত্যন্ত প্রিয়। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সেমিনারে প্রবন্ধ পাঠ করে থাকেন।

অধ্যাপক কাজুও আজুমা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সঙ্গে জাপানের উষ্ণতর ভাববিনিময়ের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার মধ্যে বিশ্বভারতীতে প্রতিষ্ঠিত নিপ্পন ভবন, কলকাতার সল্টলেকে ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র: রবীন্দ্র-ওকাকুরা ভবন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। জাপানে বাংলাভাষা ও সাহিত্য এবং রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দেবার জন্য তার নিরলস বিপুল বিপুল শ্রম ও উৎসর্গমর্মিতা বিস্ময় জাগায়! অনুবাদ, গবেষণা, শিক্ষকতার বাইরে টোকিওতে ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে দুটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময় সম্মেলন সাফল্যের সঙ্গে সম্পাদন করেন। রবীন্দ্রনাথের বাংলা গীতাঞ্জলির ছন্দ নিয়ে তার রয়েছে ব্যাপক গভীর গবেষণা। বাংলা সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসের দৃষ্টিতে রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ শীর্ষক গবেষণামূলক অভিসন্দর্ভ তার অতুলনীয় মেধার পরিচয় বহন করছে। শুধু তাই নয়, বাংলা বর্ণপরিচয় শেখার জন্য তিনি একটি অনন্যসাধারণ সচিত্র শিশুপাঠ্য কাজুও আজুমা বেঙ্গলি নামে পুস্তকও রচনা করেন ১৯৯৮ সালে। তাছাড়া অতিসম্প্রতি তার বাড়িতে পরিত্যক্ত কাগজপত্রের মধ্যে একটি দুর্লভ দলিলের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক ৪২ পৃষ্ঠার একটি ডিমাই সাইজ প্রকাশনা যার নাম হচ্ছে: হিগাশি পাকিসুতান নি ওকেরু বেনগারু গো তো বেনগুরু বুনগাকু নো কেন্কিউ তথা পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের গবেষণা। গ্রন্থটি থেকে জানা যাচ্ছে যে, ১৯৬৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে [বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যের এক সপ্তাহ] শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেটা উপস্থাপনা করেছিলেন তৎকালীন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ধ্বনিতত্ত্ববিদ মুহাম্মদ আবদুল হাই। তিনি তার দীর্ঘ উপস্থাপনাবক্তব্যে [বাংলা ভাষার গবেষণা এবং অধ্যাপনা] বিষয় তুলে ধরেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আলোচনা করেন [প্রাচীন বাংলা সাহিত্য] সম্পর্কে, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক আলোচনা করেন [মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য] এবং অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান আলোচনা করেন [সমকালীন বাংলা সাহিত্য] সম্পর্কে।

এই চারজনের ৪টি প্রবন্ধ জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেন যথাক্রমে আওইয়াগি সেইজোও এবং কাজুও আজুমা ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসের ২০ তারিখে। গ্রন্থটির তৃতীয় প্রচ্ছদে উল্লেখিত তথ্যাদি থেকে জানা যায় এটা প্রকাশ করেন দুজনেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সংস্থার পক্ষ থেকে, মনে হচ্ছে অধ্যাপক আজুমারাই এই সংস্থাটি গঠন করেছিলেন। উপরোক্ত বাঙালি চারজন অধ্যাপকের সঙ্গে তখন তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, বাংলা ভাষার প্রতি অধ্যাপক আজুমার দরদ কতখানি গভীর ছিল। এমন নজির খুব বেশি একটা বহির্বিশ্বে নেই।

সাম্প্রতিককালে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে বাংলা ভাষা ক্রমশ গুরুত্ববহ হয়ে উঠছে জাপানে। বর্তমানে টোকিও বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষা কোর্স রয়েছে। তাছাড়া, টোকিও ওয়াসেদা হোশিয়েন, নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়, সেইশিন জোশি বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াকায়ামা বিশ্ববিদ্যালয়, নাগোয়া শোওউন গাকুয়েন, য়োকোহামা আইসিসি লেঙ্গুয়েজ স্কুল, এনএইচকে ওয়ার্ল্ড প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা শেখানো হয় বলে জানা যায়। অনলাইন বাংলা কোর্সও চালু হয়েছে একাধিক। বাংলা ও জাপানি ভাষার তুলনামূলক গবেষণা করেছেন গবেষক তোনগুউ মাসারু ১৯৯২ সালে, নারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের অধীনে। বাংলা ভাষা শেখার জন্য প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ জাপানি পাঠ্যপুস্তক। যারা লিখেছেন তারা হলেন, অধ্যাপক ড. নারা ৎসুয়োশি, অধ্যাপক ড. মিজোকামি তোমিও, অধ্যাপিকা ড. নিওয়া কিওকো, মাচিদা কাজুহিকো, তোবে মিউকি, ব্যবসায়ী তাকেউচি রিয়ো, মুন্সী কে আজাদ ও মুন্সী আর. আজাদ প্রমুখ।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়