ফারহানা মীম

  ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মাতৃভাষা বাংলার গুরুত্ব কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের পরিচয়, সংস্কৃতি এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের সমাজে প্রতিদিনের কাজে বাংলার ব্যবহার ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অফিস-আদালত, উচ্চশিক্ষা, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইংরেজির আধিপত্য স্পষ্ট। ফলে নিজের ভাষা হলেও বাংলা অনেক সময় দ্বিতীয় সারিতে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছি। অথচ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও আমরা দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাংলাকে যথাযথ গুরুত্ব দিই না। সরকারি নথি, সাইনবোর্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি- সব জায়গায় বাংলা ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইংরেজিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এটি কেবল ভাষার অবমূল্যায়ন নয়, বরং আমাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে।

তবে বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি জানা প্রয়োজন। কিন্তু মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আমাদের উচিত দুই ভাষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি, আর জাতীয় ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাংলা- এই নীতি অনুসরণ করাই যুক্তিযুক্ত।

বাংলার ব্যবহার সীমিত হওয়ার পেছনে রয়েছে বহু কারণ। শাসনকালীন নীতিমালা থাকলেও তা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ হয়নি। অস্পষ্ট ভাষানীতি, একদেশদর্শী প্রমিতকরণ, পরিভাষা ও নতুন শব্দ তৈরিতে অতিরিক্ত সংস্কৃত নির্ভরতা, সংহিতা বা বানান পরিবর্তনকে বাস্তবতার সঙ্গে না-খাপ খাওয়ানো- এসব বাংলাকে কাজের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রধান বাধা। কার্যকর ব্যাকরণ না থাকা, মূল প্রবণতা অনুসারে অভিধান, থিসারাস বা উচ্চারণ নির্দেশিকা না থাকা- এসব সমস্যাও দৈনন্দিন ব্যবহারে বাধা তৈরি করছে।

এছাড়া, সংস্কৃত আধিপত্য কমিয়ে ভাষাকে সহজ করার প্রক্রিয়ায় কিছু মানুষ অনাবশ্যকভাবে আরবি, ফারসি বা উর্দু শব্দ ব্যবহার বাড়িয়ে তুলতে চাইতে পারেন। এ ধরনের প্রয়াস মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই প্রয়োজন একটি অসাম্প্রদায়িক, ব্যবহারবান্ধব এবং সুশৃঙ্খল আদর্শ ভাষারূপ, যা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ‘শিক্ষা’ শব্দের প্রমিত উচ্চারণ ‘শিক্ষা’ হওয়া উচিত। যদিও অধিকাংশ মানুষ সচেতন না হলেও ‘শিখসা’ বা ‘শিকছা’ উচ্চারণ করে, এই জনভাষারূপকে গ্রহণ করা দরকার। আবার দৈনন্দিন ব্যবহৃত ‘করে যাচ্ছি’, ‘দেখছি’-র মতো সহজ রূপকে অযাচিতভাবে বাদ দিয়ে ‘করি যাইতেছি’, ‘দেখিতেছি’-র মতো অনভ্যস্ত বৈচিত্র্যকে আনুষ্ঠানিক থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন।

শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রশাসনও বাংলার কার্যকর ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদান পদ্ধতি, পাঠ্যক্রমের সীমাবদ্ধতা, এবং ইংরেজি মাধ্যমের আধিপত্য শিক্ষার্থীদের বাংলা দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। অফিস কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক- উভয়েরই ব্যবহৃত বাংলা পৃথক। ভাষাগত বিভাজন দূর করার একমাত্র উপায় হলো সাধারণ ব্যবহারের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো একটি জনভাষারূপ প্রতিষ্ঠা।

বাংলার বানান ও ব্যাকরণও অসংগতিপূর্ণ। প্রমিত বানান নির্দেশনা কঠিন এবং অসঙ্গতিপূর্ণ। উচ্চারণ, বর্ণক্রম ও ব্যাকরণের ভিন্নতা বাংলার ব্যবহারকে কঠিন করে তোলে। অভিধান, থিসারাস বা সমার্থক শব্দকোষের অভাব শিক্ষার্থী ও পাঠকের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।

বাংলাকে কার্যকর ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের প্রয়োজন:

* প্রশাসন, আদালত ও করপোরেট খাতসহ সব ক্ষেত্রে কার্যকর বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করা

বাংলা ভাষাকে কার্যকর করতে হলে সরকারী প্রতিষ্ঠান, আদালত, করপোরেট অফিস, ব্যাংক, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং অন্যান্য জনসাধারণের সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এর অর্থ শুধু অফিসের নথি বাংলায় লেখা নয়, বরং প্রতিটি ফর্ম, নোটিশ, সাইনবোর্ড এবং কমিউনিকেশন-ইমেইলসহ সব প্রশাসনিক কাজ বাংলায় পরিচালনা করা। উদাহরণস্বরূপ, একজন নাগরিক যদি ব্যাংকে খাতা খুলতে বা আদালতে আবেদন করতে চায়, সে যেন সহজ বাংলায় সব নির্দেশনা এবং ফর্ম বুঝতে পারে। এভাবে বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করলে শুধু ভাষা শক্ত হবে না, জনগণও সরকারি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করবে।

* সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত শব্দ ও উচ্চারণকে ভিত্তি করে একটি সুশৃঙ্খল, জনভাষারূপ তৈরি করা

বাংলা ভাষার অনেক উচ্চারণ এবং শব্দের ভিন্নতা রয়েছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত মানুষের ব্যবহারে পার্থক্য থাকে। একটি কার্যকর জনভাষারূপ তৈরি করতে হবে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার সঙ্গে খাপ খায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ ‘দেখছি’ বলে, কেউ ‘দেখিতেছি’ বলে- এমন বৈচিত্র্যের মধ্যে এমন একটি মধ্যপন্থা নির্ধারণ করা দরকার যা সহজে সবাই ব্যবহার করতে পারে। এটি একদিকে ভাষার শৃঙ্খল রাখবে, অন্যদিকে বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করবে না। ফলে অফিস, স্কুল, আদালত এবং গণমাধ্যমে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে একরকম বাংলায় যোগাযোগ করতে পারবে।

* অতিরিক্ত সংস্কৃতনির্ভর শব্দের পরিবর্তে সহজ ও প্রয়োগযোগ্য বাংলা শব্দ গ্রহণ করা

বাংলা ভাষা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃত ও বিদেশি শব্দের প্রভাবে জটিল হয়ে গেছে। প্রশাসন ও শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু মানুষ প্রায়শই জটিল সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করে, যা সাধারণ জনগণ বোঝে না। উদাহরণস্বরূপ, ‘প্রবিধান’ শব্দের পরিবর্তে ‘নিয়ম’ ব্যবহার করা যেতে পারে, ‘অগ্রায়ণ’ এর পরিবর্তে ‘সামনে পাঠানো’ বা ‘ফরওয়ার্ডিং’ ব্যবহার করা যেতে পারে। সহজ ও প্রায়োগিক শব্দ ব্যবহার করলে ভাষা আরো গ্রহণযোগ্য হবে, মানুষ সহজেই তার দৈনন্দিন কাজে বাংলাকে প্রয়োগ করতে পারবে।

* প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কার্যকর ভাষা শিক্ষাদান নিশ্চিত করা

শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর থেকে বাংলার উপর যথাযথ মনোযোগ না দিলে ভবিষ্যতের প্রজন্ম কার্যকরভাবে ভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। শিশুদের শ্রবণ, কথন, পঠন ও লেখার দক্ষতা বিকাশে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার সীমিত হওয়া অনেক শিক্ষার্থীকে দুর্বল করে তোলে। ফলে বাংলা শিক্ষাদানকে শিক্ষাপদ্ধতির প্রতিটি স্তরে শক্তিশালী করা জরুরি। শিক্ষকেরা যেন সহজ, ব্যবহারিক এবং প্রাণবন্ত বাংলায় পড়াতে পারে, সেটাই মূল লক্ষ্য।

* ব্যাকরণ ও বানান সংক্রান্ত অসংগতি দূর করে সহজে ব্যবহারযোগ্য নিয়মাবলী প্রণয়ন করা

বাংলার বানান ও ব্যাকরণ প্রায়শই অসংগতিপূর্ণ। বিভিন্ন লেখক এবং প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম ব্যবহার করে। উচ্চারণ, বর্ণক্রম এবং ব্যাকরণের ভিন্নতার কারণে ভাষার ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ে। একটি সহজ, সুশৃঙ্খল এবং প্রায়োগিক নিয়ম তৈরি করতে হবে, যা ছাত্র, শিক্ষক এবং সাধারণ জনগণ সহজে অনুসরণ করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, বানান শব্দের উৎস, উচ্চারণ এবং ব্যবহার সমন্বয় করে এমন নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে, যা প্রাত্যহিক জীবনে কার্যকর। এছাড়া, অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় বানান এবং ব্যাকরণ মান নিশ্চিত করা বাংলা ভাষার কার্যকর ব্যবহারকে আরো শক্ত করবে।

আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে, মাতৃভাষা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। যদি আমরা বাংলা ব্যবহার করি- প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক যোগাযোগে স্বচ্ছন্দভাবে- তাহলে এটি শুধু ভাষা রক্ষা করবে না, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং জাতীয় পরিচয়ও শক্তিশালী করবে। মাতৃভাষা ব্যবহার না করলে আমরা আমাদের ইতিহাস এবং সংগ্রামের মূল্য ভুলে যাচ্ছি।

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রজন্মের দায়িত্ব হলো বাংলা ভাষাকে কার্যকর, স্বচ্ছন্দ্যপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। পাঠ্যপুস্তক, অফিসের নথি, আদালত এবং করপোরেট কমিউনিকেশনে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল ভাষার প্রতি দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং জাতীয় দায়িত্বও বটে। বাংলাকে দৈনন্দিন জীবনের কাজের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব- শুধু প্রয়োজন সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং একাগ্র প্রচেষ্টা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়