শাহাদাতের মাসে আয় ৩ লাখ টাকা

অভাব-অনাটন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তার জীবন জুড়ে। টাকার অভাবে পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছেন বারবার। পরীক্ষার ফি, বই-পুস্তক কেনার জন্য রংমিস্ত্রির সহকারী, রাজমিস্ত্রির সহকারী, চায়ের দোকানের বয়, হলুদণ্ডমরিচের কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। থেকেছেন মানুষের বাড়িতে লজিং মাস্টার। টিউশনি করেছেন প্রায় পুরো জীবন। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলেও একটি ভিডিও তাকে পাল্টে দিয়েছে। এসএসসি পাস হয়েও ফ্রিল্যান্সিং করে মাসে তার আয় তিন লাখ টাকার ওপরে। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘গ্রাফিক আইটিবিডি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যেখান থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন প্রায় দুই হাজার যুবককে। তার টিমে কাজ করছেন চল্লিশজন সদস্য। তাদের বেতন বাবদ মাসে গড়ে খরচ দুই লাখ টাকার মতো। প্রত্যন্ত গ্রাম নাঙ্গলকোট থানার সাহেদাপুরে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল এই যুবকের নাম মো. শাহাদাত হোসাইন। কঠিন থেকে থেকে কঠিনতর পথ পাড়ি দিয়ে শাহাদাতের ফ্রিল্যান্সার হয়ে ওঠার গল্প শুনে এসেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
পরিবার
মাত্র দশ বছর বয়সে শাহাদাত মা-হারা হন। পরিবারে এখন বাবা আর তিনি। বড় ভাই কুয়েত থাকেন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানার সাহেদাপুর গ্রামে তাদের বাড়ি। প্রত্যন্ত সাহেদাপুর গ্রামে বসেই তিনি ফ্রিল্যান্সিং করে ডলার আয় করছেন।
জীবন জুড়ে শুধুই অভাব
পবিত্র কোরআনের হেফজ শেখার জন্য মাত্র বারো বছর বয়সে বাবা তাকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। বেতন দিতে না পারায় খাবার তালিকা থেকে তার নাম কাটা যায়। মাদরাসায় মাত্র দুবেলা খাবার দেওয়া হতো। দুপুরের খাবার বন্ধ হয়ে গেলে না খেয়েই থাকতেন তিনি। রাতের খাবার দেওয়াও মানা ছিল। তবুও বাবুর্চি লুকিয়ে খাবার দিতেন।
শাহাদাত বলেন, ‘সকালে কখনোই সেভাবে নাশতা করা হতো না। চানাচুর, মুড়ি থাকলে খেতাম। না হলে না খেয়েই থাকতাম। বিশেষ করে সকালবেলা যখন বন্ধুরা একসঙ্গে মিলে নাশতা করতে যেত তখন নিজেকে আড়াল করে নিতাম। ক্লাসের কোনো এক কোণে বসে বসে পড়তাম।’ পঁচিশ পাড়া মুখস্থ হওয়ার পর এই মাদরাসা ছেড়ে চলে যান শাহাদাত। খাবার বন্ধ, কীভাবে থাকবেন তিনি সেখানে? এরপর অন্য এক মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ২০১৪ সালে বাকি পাঁচ পাড়া মুখস্থ করেন। তখন তার বয়স তেরো বছর। এ সময়ও অভাব তার পিছু ছাড়েনি। তার বাবা ততদিনে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি হারিয়ে বেকার। বড় ভাইও বাড়িতে।
জীবিকার তাগিদে
টিউশনি করেছেন প্রায় সারা জীবন। থেকেছেন লজিং মাস্টার। থাকাণ্ডখাওয়ায় সুবিধা ছিল লজিং মাস্টার থাকায়। পাশাপাশি টিউশনিও করতেন। এতে পড়াশোনার খরচ চলত বটে। তবে পরীক্ষার ফি, বই-পুস্তক কেনা সম্ভব ছিল না। পরীক্ষার ফি, বই-পুস্তক কেনার জন্য তিনি রংমিস্ত্রির সহকারী, রাজমিস্ত্রির সহকারী, চায়ের দোকানের বয়, হলুদণ্ডমরিচের কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। নিজ গ্রাম নয়, অন্য কোথাও গিয়ে এসব করতেন তিনি। গ্রামের লোকজন যেন না জানে।
কেউ না কেউ আছেন
সপ্তম শ্রেণিতে আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন তিনি। তখন আবদুল মুমিন নামে একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সব খুলে বলেন আবদুল মুমিনকে। এরপর থেকে প্রতি মাসে ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন মুমিন। ২০১৫ সালের দিকে এই সাহায্য খুব বড় উপকারে এসেছিল। কোরআন পড়ে শুধু দোয়া করতে বলতেন তিনি। আমি মুমিন সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞ। বলেন শাহাদাত হোসাইন। এ ছাড়া ইয়াসিন নামের একজন তাকে লজিং ও টিউশনির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তার কাছেও শাহাদাতের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। জিপিএ ৪.০০ পেয়ে তিনি দাখিল (এসএসসি ) পাস করেন। যদিও জেএসসিতে তার জিপিএ ছিল ৪.৯৬। বর্তমানে লাকসামে একটি মাদরাসায় আলিম পড়ছেন তিনি।
অনেক কষ্টে শিখেছেন ফ্রিল্যান্সিং
নিজের কম্পিউটার ছিল না। কিন্ডারগার্টেনে চাকরি করতেন। সেখানের এক হুজুরের কম্পিউটার ছিল। স্কুল, টিউশনি করে রাতে গিয়ে কাজের চর্চা করতেন সেখানে। একসময় হুজুর তাও বন্ধ করে দেয়। এরপর এক অ্যান্টির মাধ্যমে ত্রিশ হাজার টাকা লোন নেন শাহাদাত। মাসে কিস্তি তিন হাজার। কিন্ডারগার্টেনে পড়িয়ে তিনি তিন হাজার টাকা পেতেন। যার পুরোটা দিয়ে কিস্তি দিতেন। টিউশনির এক হাজার টাকায় চলতে হতো পুরো মাস। ভাইয়ের কাছে ত্রিশ হাজার টাকা চেয়েছিলেন কম্পিউটার কেনার জন্য। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি বিশ্বাস করতে চাননি যে ইন্টারনেট থেকে আয় করা যায়। উল্টো তার নম্বর ব্লক করে দেন। দাখিল (এসএসসি) পাসের পর কিছুদিন এলাকায় কম্পিউটারের একটি দোকান দিয়েছিলেন শাহাদাত। কিন্তু একদমই সে ব্যবসা জমাতে পারেননি তিনি।
ভাইয়ের তো গতি হলো কিন্তু তার
মায়ের দশ শতক জমি বিক্রি করে তার বড় ভাই বিদেশে পাড়ি জমান। কথা ছিল পরে শাহাদাতকেও নিয়ে যাবেন। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য এক কোম্পানি প্রায় ৪০০ জনের ইন্টারভিউ নেয়। শাহাদাত সেখানে প্রথম হন।
এক ভিডিও পাল্টে দিল সবকিছু
শাহাদাত বলেন, আমার কাছে মনে হলো, ইন্টারনেটে এমন কিছু করা যায় কি না, যা করে দেশে বসেই ভালো আয় হবে। তখন তিনি ইন্টারনেটে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কথা জানতে পারেন। ইউটিউবে একের পর এক ভিডিও দেখেন। একসময় গ্রাফিক ডিজাইনের ভিডিও তার পছন্দ হয়। শাহাদাত বলেন, ‘একটা ভিডিওতে দেখাচ্ছিল কীভাবে গ্রাফিক ডিজাইন করা হয়। আমার কাছে মনে হলো, এভাবে না। ওভাবে করলে আরো সুন্দর হবে।’ সে রাতেই তিনি বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করে দেন। এর মধ্যে প্রায় সবই হয়ে গিয়েছিল। শুধু ভিসা পাওয়া বাকি। এমন সময় এই সিদ্ধান্ত কীসের জোরে নিয়েছিলেন তিনি জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল আমি এ সেক্টরে ভালো কিছু করতে পারব। আর এই সেক্টরে সার্টিফিকেট কোনো কাজে আসে না। মেধা আর স্কিল কাজে আসে। আমার মনে হয়েছিল আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করলে এখান থেকে আয় করা সম্ভব। তাই আমি বিদেশে না গিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হ্যাঁ কিছুটা রিস্ক তো অবশ্যই ছিল। তবে নিজের প্রতি অনেক বেশি কনফিডেন্স ছিল।
ভুল হয়নি শাহাদাতের
বর্তমানে মার্কেটপ্লেস ফাইভার এবং আমেরিকান দুটি এজেন্সির সঙ্গে ফুলটাইম ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। মাসে তার গড় আয় তিন লাখ টাকার ওপরে। গত ৭ মাসে শুধু ফাইভার থেকে তিনি আয় করেছেন ১৭,০০০ হাজার ডলার। গত চার বছরে শুধু ফাইভারে তার আয় ৪০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গ্রাফিকস ডিজাইন সেক্টরের টি-শার্ট এবং লোগো ডিজাইন নিয়েই এখন তার যত ব্যস্ততা। প্রত্যন্ত গ্রাম সাহেদাপুর বসে করা তার ডিজাইনগুলো বিশ্বের বড় বায়ারদের মন জয় করে নিয়েছে।
সফল ফ্রিল্যান্সারের তিন গুণ
শাহাদাতের মতে, একজন সফল ফ্রিল্যান্সারের ৩টি গুণ থাকা চাই। এক, ধৈর্য। দুই, পরিশ্রম। তিন, সৃজনশীলতা।
টার্গেট থাকা চাই
দুবেলা পেঠ ভরে খাবার জোটেনি। না খেয়ে কেটেছে কত দিন, রাত। তার ইয়ত্তা নেই। এমনও হয়েছে। রাতের খাবার রেখে দিয়েছেন। সকালে দেখলেন গন্ধ আসছে। একটা কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দিয়েই সে খাবার পেটে চালান করেছেন। ছোটকালে মা হারিয়ে হয়েছেন মাতৃন্সেহ থেকে বঞ্চিত। এত দুঃখ, কষ্ট, অভাব-অনটনের মধ্যে থেকেও আজকের অবস্থানে কীভাবে এলেন? অনেক আগেই তো হাল ছেড়ে দিতে পারতেন। শাহাদাত বলেন, ‘জীবনে কিছু করতে হলে কষ্টের পাশাপাশি লাইফের একটি টার্গেট থাকাটাও জরুরি। আমি কখনোই হারতে চাইনি। সব সময় টার্গেট ছিল একজন ভালো মানুষের পাশাপাশি ভালো একটি পজিশনে নিজেকে নিয়ে যাব।
মানুষের জন্য দরদি মন
নিজের সফল ফ্রিল্যান্সার হয়ে ওঠার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না তার। তিনি জানেন নতুনরা এই লাইনে এসে কী ধরনের সমস্যায় পড়েন। তার স্বপ্ন, এক দিন বাংলাদেশে ‘গ্রাফিক আইটিবিডি’ অনেক বড় প্রতিষ্ঠান হবে। যেখান থেকে যে কেউ সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ফ্রিল্যান্সিং-সংক্রান্ত যেকোনো স্কিল শিখতে পারবে।
"









































