মোঃ রফিকুল ইসলাম, মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা)
ধানের সংকট না কাটতেই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, দিশেহারা হাওরের জেলেরা

হাওরে দেশীয় প্রজাতির মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো এক মাসের জন্য মাছধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এ সময় হাওরে দেশীয় জাতের মা মাছের নিরাপদ প্রজনন বৃদ্ধি ও পোনামাছ বড় হওয়ার সুযোগ করে দিতেই মৎস্য অধিদপ্তর (২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত) এ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে পড়েছে জেলার ৫০ হাজার জেলে পরিবার। পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে দিন কাটাবেন, সেই চিন্তায় দিশাহারা অনেকে। মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৫৪ হাজার ৬৯৫ জন। তার মধ্যে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৩৯৩ জন। জেলায় ৬৪টি হাওরে বছরে মাছ উৎপাদন হয় ২৭ হাজার টন। এবার মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ৪০ শতাংশ মাছের উৎপাদন বাড়বে বলে ধারণা করছে মৎস্য অফিস। দেশের মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও হাওরাঞ্চলের জেলেরা এখন জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চিতয় রয়েছেন।
সাগরের মতো হাওরেও প্রতিবছর এক মাস মাছ ধনা নিষিদ্ধ থাকবে। এজন্য গত ২৫ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানায়, নিষেধাজ্ঞাকালীন জেলা-উপজেলার নদ-নদী, বিল ও হাওরের উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ শিকার। সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান চালানো হবে।
এদিকে খালিয়াজুরী উপজেলার জলাভূমির আয়তন প্রায় ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর হলেও বর্ষা মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায়। প্রায় ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টরে। বিস্তীর্ণ জলারাশির এ হাওরাঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
খালিয়াজুরী উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান,নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১০ হাজার ২১১ জন। এছাড়া মৌসুমি জেলেসহ অন্তর ১৫ হাজার মানুষ মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন,মাছের নিরাপদ প্রজনন ও প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে এ নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এবার সরকারিভাবে জেলেদের জন্য কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকলেও নতুন করে তাদের একটি তালিকা প্রস্ত্তত করা হচ্ছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান জানান,নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৮ হাজার ৩৯৭ জন। জলাভূমি রয়েছে ৮ হাজার হেক্টর। হাওরে এবারই প্রথম মাছ ধরা বন্ধ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলেদের কোনো প্রণোদনা আসেনি। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, মৎস্য সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধস। তাই হাওরাঞ্চলের সব জেলেকে আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে বিভিন্ন হাওর এলাকায় প্রচার ও অভিযান শুরু করেছে মৎস্য বিভাগ।
জানা গেছে, জেলা সদরসহ ছয় উপজেলায় ৪৯ হাজার ৪৯ হাজার ৩৯৩টি জেলে পরিবার রয়েছে। হাওরপারের জেলেদের অভিযোগ মাছের প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে এক মাস কর্মহীন থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ্ন তারা। অনেক জেলে পরিবার দৈনিক মাছ বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাদের সংসারে নেমে আসে খাদ্য সংকট।
মোহনগঞ্জ উপজেলার খুরশিমূল গ্রামের জেলে সুমন দাস জানান, এক মাসের জন্য মাছ ধরা বন্ধ করা ভালো উদ্যোগ। তবে পাশাপাশি বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে।
সিয়াধার গ্রামের মাসুম মিয়া জানান, ধানের পর মাছ ধরাও বন্ধ। আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। সন্তানদের নিয়ে কোনো রকম চলছি। সরকার এসময় একটু সহায়তা করলে চিন্তায় পড়তে হতো না।
নেত্রকোনা সদর ও মদন উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মৎস্য অফিসার মো. কামরুল হাসান জানান, হাওর অধ্যুষিত অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আশা করা হচ্ছে এতে দেশীয় মাছ রক্ষা পাবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ জানান, এবারই প্রথম সাগরের মতো হাওরেও দেশীয় মাছ রক্ষার জন্য নেত্রকোনা সদরসহ ছয় উপজেলায় জেলেদের সচেতনতা ও প্রচার অব্যাহত রয়েছে। দেশীয় মাছ রক্ষার জন্য সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বছর মাছ ধরা বন্ধ থাকায় হাওরে ৪০ শতাংশ দেশীয় জাতের মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। জেলে পরিবারকে প্রণোদনা দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ বছর হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের কোনো প্রণোদনা দেওয়া হবে না। তবে আগামীতে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা প্রণোদনার আওতায় আসবে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, হাওরে এক মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই, কিন্তু এই এক মাস জেলেরা কী খাবে? উপকূলের মতো হাওরের জেলেদেরও আর্থিক সহায়তা প্রদানের দাবি জানান তিনি।
পিডিএস/এমএইউ









































